‘অতীতে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি, এখন দেশ পুনর্গঠনের লড়াই করতে হবে’-এ মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। এখন গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েরই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং সংসদকে কার্যকরভাবে পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়োজনে দেয়া নাগরিক সংবর্ধনায় রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। নগরের একটি অনুষ্ঠানে দেয়া সংবর্ধনায় তার সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমও উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গণতন্ত্র পেয়েছি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’ রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের মানুষ দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে এবং বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে। বারবার সেই সংগ্রাম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এবার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা অবহেলা করে নষ্ট করা যাবে না। দেশ পুনর্গঠন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দল-মত নির্বিশেষে দেশের অভিন্ন স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনৈতিক দল ও মতের ভিন্নতা থাকবে। তবে দেশের স্বার্থে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব, সেসব বিষয়ে সবাইকে একমত হতে হবে।

বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে সিলেট
সিলেটের সাথে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, সিলেট তার অত্যন্ত প্রিয় একটি জায়গা। সুযোগ পেলেই তিনি সিলেটে আসেন। এ অঞ্চলের মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি সিলেটবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, সিলেটের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া বহু গুণী মানুষের জন্ম এ অঞ্চলে। সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, চা-বাগান ও প্রবাসী জনগোষ্ঠী সিলেটের স্বাতন্ত্র্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।
সিলেটের মানুষের সাথে নিজের সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সিলেটের মানুষের সাথে আমি সবসময় ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। ইনশাআল্লাহ, সিলেটের মানুষ বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেবে।’
পর্যটন ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, পাহাড়, নদী, ঝরনা, চা-বাগান, বন ও হাওর-সব মিলিয়ে সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন অঞ্চল। পরিকল্পিতভাবে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন খাতে আরো বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব।
সিলেটের প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী সমাজ শুধু সিলেটের অর্থনীতিতে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাদের বিনিয়োগ পর্যটন, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, চা, মৎস্য, গ্যাস, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, সিলেটের হাওর ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে মৎস্য চাষের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগও আছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির প্রসাথে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সাথে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কাজ করছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ খাত আগামী দিনে আরো এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিলেটের উন্নয়ন প্রসাথে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা সিলেটের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। বড় কিছু উন্নয়ন প্রকল্পও এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান
দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে বসবাস করে আসছে। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্য। তা অক্ষুণ্ন রাখতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নিজের পায়ে নিজেরা দাঁড়াতে না পারি, নিজেদের অধিকার নিজেদের আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের সবকিছু করে দিয়ে যাবে না।’
নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ এমপি এবং রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।
এর আগে সিলেটের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে সিলেটের উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ সময় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংবর্ধনা শেষে সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সম্মানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শাহজালাল ও শাহ পরাণের মাজার জিয়ারত
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম সিলেট সফর। মঙ্গলবার সকালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি।
বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ, সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশনের পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিম, সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরীসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পরে বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রপতি সিলেট সার্কিট হাউজে যান। সেখানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।
সার্কিট হাউজে স্বল্প বিরতির পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের দরগাগেট এলাকায় হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে দেশ ও জনগণের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনায় মোনাজাত করেন তিনি।
পরে তিনি সিলেটের খাদিমনগরে হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং সেখানে যোহরের নামাজ আদায় করেন।



