পাইকগাছায় জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী পিসি রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত

রসায়ন গবেষণায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে মারকিউরাস নাইট্রাইট নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি শুধু গবেষণাগারে বিজ্ঞানচর্চা করেননি, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতেও কাজ করেছেন।

শেখ দীন মাহমুদ, পাইকগাছা (খুলনা)

Location :

Paikgachha
জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা
জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা |নয়া দিগন্ত

খুলনার পাইকগাছায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এদিন তার জন্মভূমি উপজেলার রাড়ুলী গ্রামে জন্মভিটায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

এ সময় বক্তারা বিজ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, গবেষণা ও মানবকল্যাণে পিসি রায়ের অবদানের কথা তুলে ধরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তার জীবনাদর্শ ও কর্ম ছড়িয়ে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রোববার (২ আগস্ট) আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজ হুরে জান্নাত। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো: আবদুল্লাহ হারুন।

ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (এসএফডিএফ) কর্মকর্তা জি এম জাকারিয়া ও প্রভাষক লুৎফা ইসলামের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কানিজ ফাতিমা লিজা।

এছাড়া স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মুহিদুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার (ডি সার্কেল) আমির হামজা, উপজেলা বিএনপির সভাপতি ডা: আবদুল মজিদ, পৌর বিএনপির সভাপতি আসলাম পারভেজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী রুহুল আমিন, ওসি (অপারেশন) জুলফিকার আলী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেখ দিদারুল আলম, সহকারী অধ্যাপক আবদুল মমিন সানা, কাজী সাজ্জাদ আহমেদ মানিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জয়ন্ত কুমার ঘোষ ও প্রধান শিক্ষক গৌতম ঘোষ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন উপমহাদেশের বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। রসায়ন গবেষণায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, শিল্পোদ্যোক্তা, লেখক ও সমাজহিতৈষী। তার জীবন ও কর্ম বাঙালি জাতির জন্য গর্বের।

১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনার তৎকালীন রাড়ুলী-কাটিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান এবং রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা করেন। দেশে ফিরে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি রসায়ন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

রসায়ন গবেষণায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে মারকিউরাস নাইট্রাইট নিয়ে গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি শুধু গবেষণাগারে বিজ্ঞানচর্চা করেননি, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরিতেও কাজ করেছেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখির মাধ্যমে বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেন। তার রচিত ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’ বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার জন্যও কাজ করেন পিসি রায়। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস। দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার এই উদ্যোগ তৎকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞান ও শিল্পকে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর যে চিন্তা তিনি করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পিসি রায়ের জন্মবার্ষিকীর এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ছিল আগ্রহ। জন্মভিটায় আয়োজিত আলোচনা সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা পিসি রায়ের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁর জন্মভূমিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

স্থানীয়দের মতে, পিসি রায়ের জন্মভূমি রাড়ুলী শুধু পাইকগাছা বা খুলনার নয়, পুরো দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। তার স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই এলাকা বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যটন ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সেইসাথে তার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের দ্বিতীয় ও দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ভূবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয় সরকারিকরণের দাবিও জানান স্থানীয়রা।

তারা আরো বলেন, প্রতিবছর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি পিসি রায়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, সেমিনার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা প্রয়োজন। তার নামে বিজ্ঞান জাদুঘর, গবেষণাকেন্দ্র বা বিজ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে নতুন প্রজন্ম বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে উৎসাহিত হবে।

জন্মভূমি রাড়ুলীতে নানা আয়োজনে পিসি রায়ের জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে আবারো সামনে এসেছে এই মহান বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্ম। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, তার স্মৃতিবিজড়িত জন্মভূমি আরো সংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ হবে এবং বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আদর্শ ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।

আলোচনা সভা শেষে গাছের চারা বিতরণ, বিজ্ঞানীর জীবনের ওপর রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করে বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মভিটা পরিদর্শন করেন অতিথিবৃন্দ।