দেশের একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে ময়মনসিংহে। জেলার প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র গ্যাস সঙ্কট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে শত শত চালককে। এতে পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, আর দুর্ভোগে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সরেজমিনে ময়মনসিংহ নগরী, সদর, ত্রিশাল ও ভালুকাসহ জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যানবাহনের চাপ। কোথাও শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি, আবার কোথাও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশন বন্ধ রাখতে হয়েছে। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক চালক দুপুর কিংবা বিকেল পর্যন্ত গ্যাস পাননি।
গ্যাস সঙ্কটের কারণে অনেক চালক গাড়ি নিয়ে সড়কে নামতেই পারছেন না। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক স্থানে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও যানবাহন মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ময়মনসিংহ অঞ্চলের গাড়িচালক আশিক বলেন, ‘এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরছি। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও আবার এত দীর্ঘ লাইন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে গাড়ি চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।’
সিএনজিচালক সোহাগ বলেন, ‘ভোর ৪টা থেকে কয়েকটি স্টেশনে ঘুরছি। এখন দুপুর ২টা, এখনো গ্যাস পাইনি। আজ যদি গ্যাস না পাই, তাহলে সারাদিন গাড়ি চালাতে পারব না। সংসার চলবে কিভাবে বুঝতে পারছি না।’
ভালুকার চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গ্যাস পাবো, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিনের আয়ের ওপর পরিবার চলে। দিনের অর্ধেক সময় যদি লাইনে কাটে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন।’
ময়মনসিংহ সদরের চালক আলম মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস নিতে পারিনি। গাড়িতে থাকা সামান্য গ্যাসও শেষ। গতকাল সারাদিনে মাত্র ২৫০ টাকা আয় করেছি। আজও যদি গ্যাস না পাই, তাহলে পুরো দিনের আয় নষ্ট হবে।’
জেলার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা জানান, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তারা স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছেন না। অনেক স্টেশন সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক চালক গ্যাস না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
একজন স্টেশনকর্মী বলেন, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় আমরা গ্রাহকদের সেবা দিতে পারছি না। ভোর থেকেই শত শত গাড়ি অপেক্ষা করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেককেই খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিক বলেন, দেশের একটি এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। জাতীয় গ্রিড থেকেই পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক সঙ্কটের কারণ এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোয় সামান্য সমস্যাও জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) প্রকৌশলী সত্যজিৎ ঘোষের সাথে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আরো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সঙ্কট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন চালক, স্টেশন মালিক ও ভুক্তভোগীরা।



