সীতাকুণ্ডে জাহাজের গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ, দুই সহোদরসহ মৃত বেড়ে ৮

মাত্র কয়েক দিন আগেও কারখানায় কাজ করতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মনছুর ও নাছির। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন তারা।

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা

Location :

Sitakunda
কাটিং করা এলএনজিবাহী জাহাজ, (ডানে) নিহতের স্বজনদের আহাজারি
কাটিং করা এলএনজিবাহী জাহাজ, (ডানে) নিহতের স্বজনদের আহাজারি |নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি এলএনজিবাহী পুরাতন জাহাজ কাটিংকালে বিষাক্ত গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই সহোদরসহ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ৩০ শ্রমিক। তবে নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী স্টেশন রোড সমুদ্র উপকূলে মো: লোকমানের মালিকানাধীন ফেরদৌস গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, সকাল ৮টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটলেও ইয়ার্ডের কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকাজে বাইর থেকে কাউকে ঢুকতে দেয়নি এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালায়। যার কারণে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি লোকমানের মালিকানাধীন ফেরদৌস গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি পুরাতন এলএনজিবাহী জাহাজ কাটিং করার জন্য আনা হয়। সেটি কাটিং করতে যান ইয়ার্ডে কর্মরত প্রায় ৩৫ জন শ্রমিক।

স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজগর জানান, শ্রমিকরা তখন জাহাজের ভেতরে ঢুকে কাটিং করার শুরুতে গ্যাসের ট্যাঙ্ক থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে সেটির বিস্ফোরণ ঘটে। কাটিংকালে কোনো সেফটির ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিকরা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

তিনি আরো জানান, খবর পেয়ে এলাকাবাসী অন্য শ্রমিকদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয় বলে জানান চমেক হাসপাতালের কর্তব্যরত ডা: ইশতিয়াক আহম্মেদ।

মারা যাওয়া আট শ্রমিকের মধ্যে সাতজনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন— সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (২৬), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪১) ও নাসির উদ্দিন (৩৭), হাবিবুর রহমান, মো: রানা (২৫) ও মো: সানি। তারা সবাই ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা। দুর্ঘটনায় আরো অন্তত ৩০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফের দাবি, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ ছিল। কিন্তু সকাল ১০টার সময় স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাঙ্ক লিকেজ হয়। খবর পেয়ে স্থানীয় বহিরাগত কিছু লোক তা দেখতে আসে। এ সময় জমে থাকা গ্যাসে কয়েকজনের মৃত্যু ও কয়েকজন আহত হন।

স্থানীয় জেলে সর্দার চাঁদ জলদাস জানান, কারখানাটির ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, সাগরে ইলিশ ধরতে যাওয়া জেলেরা কারখানাটির পাশের খালে প্রবেশ করতে পারেননি। তাদের অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে ঘাটে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম মাহমুদ বলেন, হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে মানুষের চিৎকার শুরু হয়। তারা কারখানা এলাকায় গেলে দেখতে পান, অসুস্থ কিছু লোককে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। এরপর জাহাজের ভেতরে কয়েকজন মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা কারখানার ভেতরে ঢোকেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিহত দুই সহোদর মনছুর ও নাছিরের ভগ্নিপতি মহিউদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, মাত্র কয়েক দিন আগেও কারখানায় কাজ করতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মনছুর ও নাছির। এমনকি চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন তারা।

নিহত খোকনের চাচা ও কারখানাটির সাবেক শ্রমিক আঙ্গুর আলী জানান, সকালে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে পান। বিস্ফোরণের পর শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন। গ্যাসের কারণে প্রথম দিকে ভেতরে ঢোকাও সম্ভব হচ্ছিল না।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: ফখরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতদের পরিবারকে বিএসবিএ-এর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হবে।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন জানান, বিস্ফোরণ ও বিষক্রিয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।