বরফের পাহাড়ের ওপর শামি কাপুর যখন চেঁচিয়ে গেয়ে উঠলেন, ‘ইয়া হু... চাহে কোই মুঝে জংলি কহে’, তখন তার কণ্ঠ হয়ে সেই যৌবনের উচ্ছ্বাসকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন যিনি, তার নাম, মুহম্মদ রফি।
এই রফিই, যিনি অগুনতি কাওয়ালি গেয়েছেন, তিনি আবার হিন্দি ছবিতে গেয়ে ওঠেন ভক্তিমূলক গান, ‘মন তড়পত হরি দর্শন কো আজ।’
পর্দায় কিংবদন্তী অভিনেতা গুরু দত্ত যখন ভারতের বাস্তবতা ও শাসনব্যবস্থার প্রতি নিরাশা ব্যক্ত করেন, তখন মুহম্মদ রফিই তার কণ্ঠ হয়ে গেয়ে ওঠেন, ‘জিনহে নাজ হো হিন্দ পর উও কাহাঁ হ্যায়।’
একটা সময় ছিল যখন হিন্দি সিনেমার হিট গান মানেই ছিল মুহম্মদ রফি। তার মৃত্যুর এত বছর পরেও মানুষ তার কণ্ঠ এবং গান গাওয়ার বিচিত্র সব গল্প নিয়ে আলোচনা করেন।
এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় শামি কাপুর সম্পর্কে লোকমুখে প্রচলিত গল্পে। বলা হয় যে, যেমন মুকেশ ছিলেন রাজ কাপুরের কণ্ঠ, তেমনি মুহম্মদ রফি ছিলেন শামি কাপুরের কণ্ঠ।
সুজাতা দেবের বই ‘মুহম্মদ রফি—আ গোল্ডেন ভয়েস’-এ শামি কাপুরের একটি স্মৃতিচারণ উল্লিখিত আছে।
শামি কাপুর উল্লেখ করেছেন, ‘তখন আমাদের ‘তারিফ কারু কেয়া উসকি’ গানটি রেকর্ড করার কথা ছিল। আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম গানটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই লাইনটি বারবার রিপিট করা হোক। কিন্তু সুরকার ওপি নায়ারের আমার এই প্রস্তাবটি পছন্দ হয়নি। আমার হতাশা দেখে রফি ওপি নায়ারকে বললেন, ‘পাপা জি’ (এই নামেই ওপি নায়ারকে ডাকতেন মুহম্মদ রফি), আপনি তো সুরকার। আমি গায়ক, কিন্তু পর্দায় তো শামি কাপুরকে অভিনয় করতে হবে। ওকে করতে দিন। যদি ওর পছন্দ না হয়, আমরা আবার (রেকর্ড) করব। এই ঘটনার পরে রফি সাহেব ঠিক যেমনটা আমি কল্পনা করেছিলাম, সেভাবেই গেয়েছিলেন।’
শামি কাপুর বলেন, ‘ওপি নায়ার যখন গানটা দেখলেন, তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করলেন। রফি সাহেব তার দুষ্টুমিভরা অথচ কোমল স্বরে বললেন, ‘কী, হয়ে গেল তো?’ রফি সাহেব নিমিষেই সবার মন জয় করে নিতেন। মুহম্মদ রফিকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ।’

মান্না দে ও মুহম্মদ রফির মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব
বাংলা ও হিন্দিতে বহু রাগাশ্রয়ী, সিনেমার ও আধুনিক গান গেয়ে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রয়েছেন মান্না দে। তিনি মুহম্মদ রফির সাথে বহু গান গেয়েছিলেন।
তার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল মুহম্মদ রফির। ২০০৭ সালে একটি অনুষ্ঠানে মান্না দে মুহম্মদ রফির গাওয়া ‘মন তড়পত হরি দর্শন কো আজ’ গাওয়ার আগে শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘একবার নৌশাদ সাহেব (সুরকার নৌশাদ) আমার কাছে এসে বললেন, জানেন মান্না দা, আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে, মান্না দে ও রফি সাহেবের মধ্যে কে বেশি ভাল গান করেন। আমি চোখের পলকেই রফি সাহেবের নাম উল্লেখ করি। আমি ওনার থেকে অনেক কিছু শিখেছি। উনি আমার থেকে বয়সে ছোট কিন্তু তার চলে যাওয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি।’
২০১৩ সালে কলকাতায় মান্না দে মৃত্যুবরণ করেন।
মান্না দে এবং মুহম্মদ রফি একবার একটি মঞ্চে অনুষ্ঠানে একসাথে গান গেয়েছিলেন। মান্না দে মঞ্চে বলেছিলেন, ‘বন্ধুরা, এই যুগেই হাজার হাজার মান্না দে আসবে, কিন্তু মুহম্মদ রফি আর কেউ হবে না।’
আবার মুহম্মদ রফি একাধিকবার নিজেকে মান্না দের সবচেয়ে বড় ফ্যানও বলছেন।

‘রফি মিয়া, আপনি কী সুন্দর গেয়েছেন’
মান্না দে একটি খুব পুরোনো সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক রাজীব শুক্লার এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘রফি সাহেব ছিলেন এক নম্বর। আমার চেয়েও ভালো। আমি শুধু রফির সাথেই নিজের তুলনা করি। তিনি যেভাবে গাইতেন, তেমনটা খুব কম লোকই পারত।’
তিনি বলেন, ‘রফি না থাকলে হয়তো আমি তার জায়গায় থাকতে পারতাম। আমরা দু’জন এমন গায়ক ছিলাম যারা সব ধরনের গান গাইতে পারতাম।’
মুহম্মদ রফি এমন এক যুগে গান গাইতেন যখন মুকেশ এবং কিশোর কুমারও চলচ্চিত্র জগতে দাপট দেখাচ্ছিলেন। তবে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক।
মুকেশের ছেলে নিতিন মুকেশ বলেন, ‘সবার মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমি অবাক হয়ে যেতাম যখন মুকেশ জি ফোন তুলে রফি সাহেবকে বলতেন, রফি মিয়া, আপনি এই গানটা কী সুন্দর গেয়েছেন। ইশ, আমিও যদি আপনার মতো গাইতে পারতাম।’
আবার মাঝে মাঝে রফি সাহেব ফোন করে বলতেন, ‘মুকেশ, তুমি কী সুন্দর গেয়েছ।’

রফি বলেছিলেন, ‘আমার কণ্ঠে আপনার মাধুর্য ভরে দিন’
আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও, মুহম্মদ রফির নিজেকে আরো উন্নত করার যে তাগিদ ছিল, সেই কথা সংগীতশিল্পী খৈয়াম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহুবার বলেছেন।
খৈয়াম একবার বলেছিলেন, ‘রফি আমাকে বারবার নিমন্ত্রণ দিয়ে ডাকতেন। আমি ভাবতাম উনি আসলে চাইছেন টা কী!’ তারপর রফি সাহেবের কাছ থেকে একটি অনুরোধ পেলাম, ‘দয়া করে আমার কণ্ঠে আপনার মাধুর্য ভরে দিন।’ তখন তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। আসলে ব্যাপারটা ছিল, তখন রফি বেশ চড়া কণ্ঠে গান গাইতেন।’
খৈয়াম বলেন, ‘আমি তার সামনে কিছু শর্ত রেখেছিলাম। যেমন, সে যে একজন মহান গায়ক, তা ভুলে যেতে হবে। রেওয়াজের সময় তার আশেপাশে কেউ থাকবে না। এই সময়ে সে ফোনেও কারও সাথে কথা বলবে না। রফি সাহেব আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মান্য করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ, যখন তিনি ‘গজব কিয়া তেরে ওয়াদে পর আয়েতবার কিয়া’ গজলটি গাইলেন, রফি সেই অতি কাঙ্ক্ষিত মাধুর্য নিজের কণ্ঠেই খুঁজে পেলেন।’

লাহোর থেকে বম্বে, জীবনযুদ্ধে অপরাজিত সৈনিক মুহম্মদ রফি
অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবে অমৃতসরের কাছে ১৯২৪ সালে মুহম্মদ রফির জন্ম, দুই বছর বয়সে তার বাবা হাজি আলি মুহম্মদ লাহোরে চলে যান। হাজি আলি মুহম্মদ ছিলেন এক বিখ্যাত রাঁধুনি।
১২ বছর বয়সে তিনিও লাহোরে চলে গেলেন তার বাবার কাছে। এরপর তিনি আর স্কুলে যাননি। তার দাদার সাথে তিনি নাপিতের কাজ শুরু করেন।
গানবাজনা পছন্দ করতেন না হাজি আলি মুহম্মদ। তাই ছোটবেলায় মুহম্মদ রফি তার বাবার ভয়ে লুকিয়ে গান গাইতেন।
একটি বহুল প্রচলিত গল্প আছে যে, একতারা নিয়ে একজন ফকির লাহোরে আসতেন। তার গান শুনে রফি তার পেছন পেছন প্রায়শই হজরত দাতা গঞ্জ বকশের মাজারে যেতেন।
একবার, অল ইন্ডিয়া রেডিওর একজন কর্মকর্তা জীবন লাল মাট্টো লাহোরের নূর মহল্লা দিয়ে যাওয়ার সময় একটি সুমধুর কণ্ঠ শুনতে পান। সেই কণ্ঠ অনুসরণ করে তিনি একটি দোকানে যান, যেখানে মুহম্মদ রফি একজনের চুল কাটছিলেন। তার গানে মুগ্ধ হয়ে সেই কর্মকর্তা তাকে রেডিওতে কাজ করার সুযোগ দেন।
একবার, লাহোরে তৎকালীন বিখ্যাত গায়ক কে এল সেহগালের একটি অনুষ্ঠানের সময় আলো নিভে যায়। সময় কাটানোর জন্য এবং দর্শকদের ব্যস্ত রাখতে তরুণ রফি মঞ্চে আসেন। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংগীত পরিচালক শ্যাম সুন্দর এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি রফিকে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে চলে যান।
মুহম্মদ রফি বুঝতে পেরেছিলেন, তার ভবিষ্যৎ বোম্বেতেই। তিনি সেখানে গেলে সংগীত পরিচালক শ্যাম সুন্দর, রফিকে পাঞ্জাবি চলচ্চিত্র ‘গুল বালোচ’-এ গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন।
রফি ১৯৪৪ সালের চলচ্চিত্র ‘পহলে আপ’ এবং তারপর ‘গাঁও কি গোরি’-তে গান গাওয়ার সুযোগ পান। ‘পহলে আপ’ ছবিতে তিনি কোরাসে গেয়েছিলেন। গানটির জন্য গায়কদের সৈন্যদের মতো কুচকাওয়াজ করে সেই তালে গাইতে হয়েছিল।
রেকর্ডিংয়ের পর নওশাদ লক্ষ্য করেন যে রফির পা থেকে রক্ত পড়ছে। জিজ্ঞাসা করা হলে মুহম্মদ রফি বলেন যে, তার জুতো খুব আঁটসাঁট ছিল। যেহেতু গানটি তখনও চলছিল, তাই তিনি কিছু বলেননি।
একসাথে কাজ করতে করতে মুহম্মদ রফি ও নওশাদ যে শুধু একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তাই নয়, রফি তার মেয়েদের বিবাহে নওশাদকে দিয়েই নিকাহ পড়িয়েছিলেন।

ধর্ম বনাম সংগীতের দোলাচলে যখন হারিয়ে যাচ্ছিলেন রফি
মুহম্মদ রফির কেরিয়ার যখন তুঙ্গে, ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে মুহম্মদ রফি হজ সেরে ফিরেছিলেন। সেখানে কেউ একজন তাকে বলেছিল যে তার ধর্মে সংগীতের কোনো স্থান নেই। এরপর রফি কিছু সময়ের জন্য গান গাওয়া বন্ধ করে দেন।
এছাড়াও দিলীপ কুমার এবং শাম্মি কাপুরের মতো কিংবদন্তি অভিনেতাদের যে বৃত্তে রাফি গান গাইতেন, তার প্রভাব কমে নতুন যুগের কলাকুশলী, অভিনেতা ও সুরকাররা বলিউডে জায়গা করে নিচ্ছিলেন।
তখন শুরু হয়েছিল রাজেশ খান্না এবং অমিতাভ বচ্চনের যুগ। আরডি বর্মনের মতো নতুন প্রজন্মের সুরকাররা কিশোর কুমারের মতো নতুন প্রজন্মের গায়ক ও নতুন ধরনের সংগীত নিয়ে কাজ করছিলেন।
অনেকেই তখন বলছিলেন, রফির যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে অনেক সুরকারই মুহম্মদ রফিকে সাহায্য করেছিলেন। তখন ঋষি কাপুর বলিউডে নতুন। সুরকার মদন মোহন প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলেন যে তিনি ঋষি কাপুরের কণ্ঠে মুহম্মদ রফিকে দিয়েই গান গাওয়াবেন।
যে গায়ক রাজ কাপুরের কণ্ঠে এত গান গেয়েছেন, তাকে কি পুত্র ঋষি কাপুরের কণ্ঠে মানুষ মেনে নেবে? এই প্রশ্ন তখন ইন্ডাস্ট্রিতে ঘুরত। অবশ্য মুহম্মদ রফি এই ধারণা ভেঙে দিয়ে তাদের ভুল প্রমাণিত করেছিলেন।
সেই ছবি ‘লায়লা-মজনু’ ১৯৭৬ সালে মুক্তি পেলে গানগুলি হিট হয়। কিন্তু ততদিনে মদন মোহন মারা গিয়েছেন।
১৯৭৭ সালে ‘কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা’ এতটাই হিট হয় যে বর্তমানেও এই গানটি সমান জনপ্রিয়। এই গানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান।
১৯৮০ সালে তিনি লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলালের ছবি ‘আশপাশ’-এ শেষবার গান করেন।
তবে এমন নয় যে সফলতার মধ্যগগনে থাক সত্ত্বেও তিনি কোনো বাধার সম্মুখীন হননি। মুহম্মদ রফির ওপর ‘দাস্তান-এ-রফি’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে।
তথ্যচিত্রটিতে সংগীতশিল্পী মদন মোহনের ছেলে সঞ্জীব কোহলি বলেন, ‘কখনো কখনো গানের বৈচিত্র্যই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, রফি সাহেব ষাটের দশকে ‘জংলি’ গেয়েছিলেন। তিনি ‘বার বার দেখো’-র মতো গান গেয়েছেন। কিন্তু মদন মোহন জি রফি সাহেবকে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি এখনো ‘ইয়াহু’ ধরনের গান করেন, আমি তবে এখনই আপনার সাথে আমার রেকর্ডিং বাতিল করে দেবো। আপনার আগে ওইরকম স্টাইল থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। আমার গানটা বেশ গুরুগম্ভীর। আমি এতে অভিনয় কম চাই।’

পরবর্তী প্রজন্মেও মুহম্মদ রফির প্রভাব
সোনু নিগমসহ প্রতিটি যুগের গায়কদের মুহম্মদ রফি প্রভাবিত করেছেন।
সোনু নিগম বলেন, ‘যখন আমি গায়ক হওয়ার জন্য মুম্বাই এসেছিলাম, তখন আমার একমাত্র চেষ্টা ছিল রফি সাহেবের কণ্ঠ অনুকরণ করে তার মতো গান গাওয়া। মুহম্মদ রফি সাহেব আমার কাছে ভগবানের মতো। যদিও আমি তাকে কখনো দেখিনি, তার থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এবং তার গান শুনে আমি গান গেয়ে গেছি। পরে আমি আমার নিজস্ব শৈলী তৈরি করি।’
মুহম্মদ রফির মেয়ে নাসরিন জানিয়েছেন, রফি সাহেব বলতেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যখন আমি সাফল্যের শিখরে থাকব, তখন যেন তিনি আমাকে তুলে নেন।’
তার প্রার্থনা কবুল হয়েছিল। ১৯৮০ সালে যখন তার মৃত্যু হয়, তখন তিনি সাফল্যের শিখরেই ছিলেন।
সূত্র : বিবিসি



