বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃক নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্পের আওতায় জাইকার অর্থায়নে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সাইমন পর্যন্ত উপকূলীয় সড়ক নির্মাণের জন্য সৈকতের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) এক বিবৃতিতে বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি, উপকূলীয় উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক বালুর স্তর শুধু সৈকতের সৌন্দর্যের অংশ নয়; এগুলো ঢেউ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থা উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। ফলে সড়ক নির্মাণের জন্য বালিয়াড়ি ভরাট, সমতল বা অপসারণ করা হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক উপকূলীয় সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা দুর্বল হতে পারে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা ও পর্যটকদের সুবিধা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নেয়া একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রকল্পটির পরিকল্পনাগত যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সৈকতের সংবেদনশীল বালিয়াড়ি অঞ্চল এড়িয়ে বিকল্প স্থানে সড়ক নির্মাণের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্তর যৌক্তিকতা এবং বিকল্প স্থান ও নকশা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
মোসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পরিবেশগত আইন, বিধিবিধান ও অনুমোদন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। সংশ্লিষ্ট সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদফতরের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন ও মূল্যায়ন ছাড়া এ ধরনের সংবেদনশীল এলাকায় নির্মাণকাজ পরিচালিত হলে তা আইনগত ও পরিবেশগত বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিআইপি মনে করে, কক্সবাজারের উন্নয়নকে কোনো বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে বিবেচনা না করে পরিবহন, পর্যটন, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাই কক্সবাজারের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি। উন্নয়নের নামে এসব প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে অবকাঠামো নির্মাণ টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় বিআইপি চলমান নির্মাণকাজ অবিলম্বে স্থগিত করে প্রকল্পটির পরিবেশগত, জলবায়ুগত, দুর্যোগ ঝুঁকি ও পরিকল্পনাগত প্রভাবের স্বাধীন ও সমন্বিত পুনর্মূল্যায়নের দাবি করছে। একই সাথে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা, বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে বিকল্প স্থান ও নকশা বিবেচনা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিআইপিসহ সকল অংশীজনের সাথে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছে। পুনর্মূল্যায়নে প্রকল্পটি পরিবেশ ও উপকূলীয় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে প্রকল্পটি বাতিল করে টেকসই ও পরিবেশসম্মত বিকল্প গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি দেশের বিভিন্ন অংশে পরিবেশ বিনষ্ট করে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের যে প্রচেষ্টা চলছে, বিআইপি তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স মনে করে, কক্সবাজারের বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় পরিবেশ কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। তাই একে সংরক্ষণ করেই পরিকল্পিত, পরিবেশসম্মত ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।



