২৯ নভেম্বর ২০২০

করোনা পরিস্থিতি ও শিক্ষাভাবনা

করোনা পরিস্থিতি ও শিক্ষাভাবনা - ছবি : নয়া দিগন্ত

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে আর্থ-সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে এর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার মতো অবস্থা আমাদের নয়। উন্নত দেশগুলোর মতো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে প্রণোদনা দিয়ে ঘরে বসে থাকতে বলতে পারব না। তাই মহামারীর উন্নতি না হলেও আমাদের জনজীবন স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষই পেটের তাগিদে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে এবং এখন সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও তাতে ইন্ধন দিচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে, করোনা জয় করতে না পারলেও আমরা করোনাভীতি জয় করেছি।

এখন কলকারাখানা, অফিস-আদালতের পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে বলে মনে হয়। একদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন বলছেন, করোনার ভ্যাকসিন দরকারই হবে না, তার আগেই এই মহামারী বিদায় নেবে; তখন অন্যরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিস্থিতি এখনো আসেনি।

করোনা মহামারী সংক্রমণের বাস্তবতা কী? গত সোমবারও দেশে করোনায় মারা গেছেন ৪২ জন। মোট মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছুঁয়েছে। সাড়ে ১৩ হাজারের মতো টেস্ট করে শনাক্ত হয়েছেন আড়াই হাজার জন। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫তম। সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশ পেছনে ফেলে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ পাকিস্তানকে। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মারা যাচ্ছেন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন। এসব পরিসংখ্যান দেশে মহামারী পরিস্থিতির উন্নতির কোনো ইঙ্গিত দেয় না; তা আমাদের বিজ্ঞ স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা-ই বলুন না কেন। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, উন্নতি তো হয়ইনি, বরং যেভাবে করোনাভীতি জয় করে আমরা মাঠে-ময়দানে অবাধে বিচরণ করছি, তাতে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা: এবিএম আবদুল্লাহ একটি দৈনিককে বলেছেন, দেশের মানুষ করোনাকে পাত্তা দিচ্ছে না। এটি আত্মঘাতী হচ্ছে। সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। ফুটপাথ, রেস্টুরেন্ট, পার্ক সব জায়গায় অনেক লোক এক সাথে চলাফেরা করছে। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো প্রবণতা নেই। এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি আসলে বেড়ে যাচ্ছে; তিনি বলেন, গত কয়েক দিনের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অবস্থা একই রকম আছে। আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার থেকে তিন হাজারের মধ্যে ওঠানামা করছে। মৃত্যুর হারও কমেনি। সংক্রমণের ঝুঁঁকি কয়েক দিনের মধ্যে বোঝা যাবে। তাই আমাদেরকে নিয়ম মেনে এখনো হাত ধুতে হবে। কাজ করার পাশাপাশি সচেতনভাবে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। তা না হলে বিপদ বাড়তে পারে।’

মহামারীর ভয়াবহতা সম্পর্কিত বাস্তবতার অবশ্য ধার ধারেন না আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি এ মাসের মাঝামাঝি বলেছেন, ‘আমাদের ভ্যাকসিনের দরকারই হবে না। তার আগেই করোনা বিদায় নেবে।’ তার ভাষায়, ‘এরই মধ্যে কমে গেছে করোনায় সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার।’ মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই দেশের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে শুরু করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, করোনা পরিস্থিতির যদি অবনতি হয় তার দায় সরকার বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ওপরই বর্তাবে। শুধু স্বাস্থ্যমন্ত্রী একাই নন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, করোনা মোকাবেলায় শুরুর দিকে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়েছিল, তার অনেকগুলো থেকেই সরকার এখন সরে আসছে। কিছু উদ্যোগ বাতিল করে নেয়া হচ্ছে নতুন প্রকল্প। বিশেষায়িত করোনা হাসপাতাল স্থাপন, সব হাসপাতালে হ্যান্ডওয়াশ কর্নার স্থাপন, বন্দরগুলোতে মেডিক্যাল সেন্টার স্থাপনের মতো বেশ কিছু কাজ সরকার বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। এ ছাড়া পিসিআর মেশিন কেনা, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন সেন্টার এবং আইসিইউ বেড স্থাপনের কাজ গুটিয়ে আনা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ করোনার বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান গত শুক্রবার জেনেভায় সাংবাদিকদের বলেছেন, এই মহামারী বিদায় করতে বিশ্ববাসীর আরো দুই বছর লাগতে পারে। তিনি বলেন, সবাই একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করলেই কেবল তা দূর করতে দুই বছর লাগতে পারে। অর্থাৎ তিনি আভাস দিচ্ছেন যে, বিশ্ববাসীর সম্মিলিত চেষ্টায় ঘাটতি থাকলে করোনা মহামারীর অস্তিত্ব দুই বছরের পরও প্রলম্বিত হতে পারে।

এই যখন মহামারী পরিস্থিতি, তখন বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হবে কি না সে বিষয়ে আমরা বিতর্ক করছি। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা আছে; তেমনই স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হবে কি না সেই শঙ্কাও আছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম এক ব্যক্তির মৃত্যু হলে ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর দুই দফায় তা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সে জন্যই পয়লা সেপ্টেম্বর স্কুল-কলেজ-মাদরাসা খুলবে ধরে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আকরাম হোসেন জানিয়েছেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা খুব কম। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আরো বাড়ানো হতে পারে বলে আভাস দেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে নানা মত থাকলেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ন্যূনতম ঝুঁকি নিতে চায় না সরকার। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এমনি অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, চলমান পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে আগামী সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিতে ফেলা হবে না। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এখন কথা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের অটো-প্রমোশন দেয়া হবে, নাকি পরীক্ষা নেয়া হবে? মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল-কলেজ খোলার মতো অবস্থা এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এইচএসসি ও জেএসসি এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এদিকে, কওমি মাদরাসার উচ্চস্তরের পরীক্ষা (দাওরায়ে হাদিস) নেয়ার বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার অনুমোদন দেয়ার পেছনে কী যুক্তি ছিল, আমরা জানি না। তবে এটি সরকারের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়।

যাই হোক, পত্রপত্রিকার খবরে আমরা জানি, স্কুল-কলেজ খোলার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ৫০টি নির্দেশনা প্রস্তুত করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রেখে বিদ্যালয়ে পাঠদান পরিচালনায় করণীয় বিষয়ক বিভিন্ন নির্দেশনা তৈরি করেছে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি।

নির্দেশনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাস্ক, হাত পরিষ্কার এবং থার্মোমিটার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা আছে। স্কুল খোলার পর প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবাইকে এসব মেনে চলতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, করোনার কারণে এ বছর পিইসি বা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা না নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমাদের মনে হয়, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার যত ক্ষতিই হয়ে থাকুক, পরীক্ষা না নেয়া হলে সেই ক্ষতির ষোলোকলা পূর্ণ হবে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হবে এবং এ পর্যন্ত যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে সচেষ্ট হবে। আমরা যা করতে পারি, সেটি হলো সিলেবাস কমিয়ে দিতে পারি কিংবা পরীক্ষা দুই মাস পিছিয়ে দিতে পারি। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা বন্ধ করা হলেও মাধ্যমিক, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষা বন্ধ করা কোনোভাবেই উচিত হবে না।

করোনাভাইরাস তথা কোভিড-১৯ মহামারী রোধের প্রতিটি পর্যায়ে সরকারের অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনার চিত্র ছিল স্পষ্ট। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন কোনো হেলাফেলার বিষয় নয়। সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবেচিন্তে। দেশের সেরা শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এসব বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা দরকার।

স্কুল-কলেজ খুলে দিয়ে শিক্ষার্থীদের করোনা ঝুঁকিতে ফেলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি পরীক্ষা না নিয়ে অটো-প্রমোশন দেয়াও তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করি।


আরো সংবাদ