বাবার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল মেসির বিশ্বজয়ের যাত্রা

১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার রোজআরিওর লাস হেরাস এলাকায় জন্ম হোর্হের। জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন ধাতব কারখানায় কাজ করে। প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে কাজে বের হতেন হোর্হে। ফিরতেন রাতের খাবারের সময়, প্রায় রাত ৯টার দিকে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
হোর্হে মেসি ও লিওনেল মেসি
হোর্হে মেসি ও লিওনেল মেসি |সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসির নাম এখন অনন্য এক অধ্যায়ের নাম। তর্কসাপেক্ষে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার তিনি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য ক্লাব ট্রফি আর একের পর এক ব্যক্তিগত রেকর্ড- সব মিলিয়ে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনেক উপরে।

কিন্তু এই মেসি হয়ে ওঠার গল্পের শুরুটা ছিল আর্জেন্টিনার রোজারিওর এক সাধারণ পরিবারে। সেই গল্পে ছিল অভাব, দীর্ঘ পরিশ্রম, সন্তানের চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা, দেশ ছাড়ার ঝুঁকি এবং একজন বাবার অদম্য বিশ্বাস। সেই বাবার নাম হোর্হে মেসি।

গতকাল শনিবার ৬৮ বছর বয়সে দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা গেছেন হোর্হে। তার মৃত্যুর পর মেসির জীবনে বাবার ভূমিকা নতুন করে সামনে এসেছে। বিশ্ব যে মানুষটিকে মেসির বাবা হিসেবে চিনেছে, তিনি শুধু বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন ছেলের প্রথম কোচ, সবচেয়ে বড় সমর্থক, কঠোর সমালোচক, পরামর্শদাতা ও দীর্ঘ সময়ের এজেন্ট।

১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার রোজআরিওর লাস হেরাস এলাকায় জন্ম হোর্হের। জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন ধাতব কারখানায় কাজ করে। প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে কাজে বের হতেন হোর্হে। ফিরতেন রাতের খাবারের সময়, প্রায় রাত ৯টার দিকে।

সন্তানদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ ছিল খুব কম। পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে দিনের বেশিভাগ সময়ই তাকে কাজ করতে হতো তাকে। চার সন্তান ও স্ত্রীর সাথে যখন দেখা হতো, সেই অল্প সময়টুকুই তারা উপভোগ করতেন।

তবে সময়ের স্বল্পতা ছেলের প্রতি হোর্হের নজর কমাতে পারেনি। মেসির বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখনই তার মধ্যে অন্যরকম প্রতিভা দেখতে পেয়েছিলেন বাবা। ছোট্ট লিওনেলকে নিজেই ফুটবলের প্রাথমিক শিক্ষা দিতেন তিনি। ড্রিবলিং করার সময় বলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দেখে হোর্হে বুঝেছিলেন, ছেলেটি আলাদা।

গ্রান্দোলিতে মেসির ফুটবলের শুরুর দিনগুলো ছিল সংগ্রামের। একবার ছেলের ম্যাচ দেখার টিকিট কেনার মতো অর্থও হোর্হের হাতে ছিল না। সেই সময়ের পর মেসিকে নিয়ে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সাত বছর বয়স থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত সেখানে খেলেন মেসি।

এই সময়েই সামনে আসে আরো বড় সমস্যা। মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৯০০ ডলার। সাধারণ পরিবারের জন্য এই অর্থ ছিল বিশাল বোঝা। হোর্হে তখন রোসারিওর কারখানায় কাজ করতেন। নিজের আয় দিয়ে দীর্ঘদিন এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

হোর্হে চিকিৎসার খরচের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে থাকেন। পরে তিনি জানিয়েছিলেন, ওই সময় তিনি একটি ফাউন্ডেশনের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। সম্মিলিতভাবে তারা প্রায় দুই বছরের চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এরপর সেই সহায়তাও চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নিউয়েলস ওল্ড বয়েজও মেসির চিকিৎসার পুরো খরচ দীর্ঘমেয়াদে বহন করতে রাজি হয়নি। রিভার প্লেটও শেষ পর্যন্ত তাকে দলে নেয়নি। ছেলের প্রতিভা ছিল, কিন্তু সেই প্রতিভাকে এগিয়ে নেয়ার মতো অর্থ ছিল না পরিবারের হাতে।

এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে বার্সেলোনা। খবর আসে, কাতালান ক্লাবটি মেসির প্রতি আগ্রহী। হোর্হে তখন এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা শুধু তার ছেলের জীবন নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সী মেসিকে নিয়ে তিনি রোজারিও ছেড়ে স্পেনের কাতালোনিয়ায় চলে যান।

সিদ্ধান্তটি ছিল বড় ঝুঁকির। পরিচিত শহর, পরিবার, কাজ ও নিরাপদ জীবন পেছনে ফেলে অচেনা দেশে ছেলেকে নিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু হোর্হের সামনে তখন একটি বিষয়ই ছিল, ছেলের চিকিৎসা এবং ফুটবল ক্যারিয়ার।

বার্সেলোনায় মেসির প্রথম সময়টিও সহজ ছিল না। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, চিকিৎসার খরচ ও ক্লাব তাকে শেষ পর্যন্ত নেবে কি না- সবকিছু মিলিয়ে পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক সময় মেসির মাকে রোহারিওতে ফিরে যেতে হয়। ছোট্ট লিওর পাশে তখন থেকে যান হোর্হে।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বার্সেলোনার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ মেসির প্রতিভায় আস্থা রাখেন। মধ্যাহ্নভোজের সময় একটি ন্যাপকিনেই মেসির সাথে চুক্তি সারেন। সেই ছোট্ট কাগজটি পরে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত দলিলে পরিণত হয়।

মেসি যখন বার্সেলোনার যুব দলে দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করেন, তখন তার বাবার ভূমিকাও বদলাতে থাকে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই হোর্হে হয়ে ওঠেন ছেলের এজেন্ট। ক্লাবের সাথে চুক্তি, বাণিজ্যিক চুক্তি, বিভিন্ন আলোচনা ও মেসির ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তিনি সামলাতে শুরু করেন।

তবে বাবা ও ছেলের সম্পর্ক কখনো ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে আটকে থাকেনি। ফুটবলই ছিল তাদের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভাষা। মেসি ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি ম্যাচের পর বাবার মতামত জানতে চাইতেন। ম্যাচ কেমন হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে- এসব নিয়ে বাবার সাথে কথা বলতেন।

মেসি একবার বলেছিলেন, ক্যারিয়ারজুড়েই তার বাবা পাশে ছিলেন। ম্যাচ শেষ করে তাকে বার্তা পাঠাতেন অথবা কথা বলতেন। ছোটবেলা থেকে নিজের অনেক বিষয়ে বাবার অনুমোদন চাইতেন। বাবার নিয়মিত সমালোচনা তাকে আরো ভালো হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন।

মায়ের ভূমিকা অবশ্য ছিল অন্যরকম। মেসির ভাষায়, মা খারাপ খেললেও তাকে সেরা মনে করতেন। বাবা ছিলেন বাস্তববাদী। ভুল হলে ভুল বলতেন, উন্নতির জায়গা দেখিয়ে দিতেন। আর সেই কঠোরতা মেসির ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে একসময় স্পেনের হয়েও খেলার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বার্সেলোনার যুব দলে তার পারফরম্যান্স দেখে স্প্যানিশ ফুটবল কর্মকর্তারা তাকে জাতীয় দলে পাওয়ার আগ্রহ দেখান। কিন্তু হোর্হে জানতেন, তার ছেলে আর্জেন্টিনার হয়েই খেলতে চায়।

তাই মেসির সেরা মুহূর্তগুলোর ভিডিও তৈরি করে আর্জেন্টিনার যুব দলের কোচ হুগো তোকাল্লির কাছে পাঠান হোর্হে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাথেও যোগাযোগ রাখেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০০৪ সালের ২৯ জুন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির।

এক অর্থে, হোর্হে শুধু একজন ফুটবলারকে বড় করেননি। তিনি তার ছেলের স্বপ্নের পথটিও তৈরি করে দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে গোল করার পর মেসি নিজের জার্সি তুলে ধরেন।

তখন দেখা যায় ভেতরের টি-শার্টে লেখা ছিল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’ মাঠে গোল করে বাবাকে দেয়া সেই বার্তা হয়ে আছে মেসি-হোর্হে সম্পর্কের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।

এরপর মেসির ক্যারিয়ার যত বড় হয়েছে, হোর্হের দায়িত্বও তত বেড়েছে। বার্সেলোনার সাথে চুক্তি নবায়ন, বাণিজ্যিক চুক্তি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা ছিল। তিনি চেষ্টা করতেন মেসিকে এসব বিষয় থেকে দূরে রাখতে, যাতে ছেলে শুধু মাঠের খেলায় মন দিতে পারে।

২০২১ সালে বার্সেলোনা থেকে মেসির বিদায়ের সময়ও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হোর্হে। দীর্ঘ আলোচনার পর সমঝোতা না হওয়ায় মেসিকে প্রিয় ক্লাব ছাড়তে হয়। পরে পিএসজিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও হোর্হে আলোচনার অংশ ছিলেন।

এরপর মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রেও বাবার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এজেন্ট হিসেবে কোটি কোটি ডলারের চুক্তি সামলালেও হোর্হের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল বাবা হিসেবে।

রোজারিওর কারখানার কর্মী থেকে মেসির ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হয়ে ওঠা তার জীবন যেন ছেলের সাফল্যের সাথে একই সুতোয় বাঁধা ছিল।

হোর্হে একবার বলেছিলেন, তারা সবসময় চেষ্টা করতেন যেন মেসি শুধু খেলার দিকে মনোযোগ দিতে পারে। বাইরের বিষয়গুলো যেন তার খেলায় প্রভাব না ফেলে, সেটিই ছিল তাদের লক্ষ্য।

সময়ের সাথে মেসি বিশ্বের অন্যতম ধনী ও জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ হয়ে উঠেছেন। তার হাতে এসেছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি’অরসহ অসংখ্য ট্রফি। কিন্তু মেসি যত বড় হয়েছেন, বাবার মতামতের গুরুত্ব তার কাছে ততটুকুই থেকেছে।

হোর্হে ছিলেন সেই মানুষ, যিনি ছেলের প্রথম ফুটবল ম্যাচ থেকে শুরু করে বিশ্বসেরা হওয়ার পথ পর্যন্ত পাশে ছিলেন। কখনো কোচ হিসেবে, কখনো সমালোচক হিসেবে, কখনো এজেন্ট হিসেবে, আবার কখনো শুধুই একজন বাবা হিসেবে।

ভোর ৪টায় ঘর থেকে বের হয়ে রাত ৯টায় বাড়ি ফেরা সেই মানুষটি হয়তো তখন জানতেন না, তার ছেলে একদিন পৃথিবীর কোটি মানুষের প্রিয় ফুটবলার হয়ে উঠবে। তিনি শুধু জানতেন, লিওনেল ফুটবল ভালোবাসে।

আর সেই ভালোবাসার স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে লড়াই করতেই হবে। সেই লড়াইয়ে ছিল অর্থের অভাব, চিকিৎসার ব্যয়, ক্লাবের অনীহা, দেশ ছাড়ার ঝুঁকি, নতুন দেশে অনিশ্চয়তা- সবকিছু। কিন্তু হোর্হে থামেননি।

আজ মেসির হাতে অসংখ্য ট্রফি। ফুটবল ইতিহাসে তার নাম স্থায়ী হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের প্রথম পাতায় রয়েছে রোজারিওর এক পরিশ্রমী বাবার গল্প। যে বাবা নিজের সময়, শ্রম, অর্থ ও জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছিলেন ছেলের স্বপ্নের পেছনে।

হোর্হে মেসি তাই শুধু মেসির বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি একজন ছোট্ট ছেলের স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিলেন- যখন পৃথিবীর বাকি সবাই সেই স্বপ্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত ছিল না।

মেসির বাবা আর নেই। কিন্তু তার প্রতিটি গোল, প্রতিটি অর্জন এবং ক্যারিয়ারের প্রতিটি বড় মুহূর্তের আড়ালে থেকে যাবে সেই মানুষটির ছায়া।