ফুটবলে লাল কার্ড যেভাবে এলো

আল মাহমুদ

হলুদ কার্ড তো পান্তা ভাত। যদি কোনো রকমে উচিয়ে ধরা কার্ডটি রক্তে রাঙা লাল হয়, তারপর চলে রেফারির সাথে নিজেকে নির্দোশ প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা।

ফুটবলে খেলোয়াড়রা কাকে বেশি ভয় পান? প্রতিপক্ষ নাকি রেফারি! খেলোয়াড় ভেদে এই উত্তর ভিন্ন হতে পারে। তবে ফাউলের পর রেফারির দাম্ভিকতার সাথে তেড়ে আসা, কোন কার্ড তুলে ধরবেন তা নিয়ে ভাবনা, যে কোনো রথী-মহারথী খেলোড়ারের হার্টবিট সেকেন্ডে ২০০ ক্রস করিয়ে দিতে পারে।

হলুদ কার্ড তো পান্তা ভাত। যদি কোনো রকমে উচিয়ে ধরা কার্ডটি রক্তে রাঙা লাল হয়, তারপর চলে রেফারির সাথে নিজেকে নির্দোশ প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা।

২০১১ সালে আর্জেন্টিনার পঞ্চম বিভাগ লিগে ক্লেপোল বনাম ভিক্টোরিয়ানো অ্যারেনাস ম্যাচে ৩৬টি লাল কার্ড দেখানো হয়, যা যেকোনো একক ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ড পাওয়ার গিনেস ওয়াল্ড রেকর্ড। যেখানে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে লাল কার্ড দেখা গিয়েছিল ২৮টি। তবে একক খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ লাল কার্ড হজম করার রেকর্ড কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার জেরার্ডো বেদোয়ার দখলে। তিনি তার পুরো ক্যারিয়ারে মোট ৪৬ বার মাঠ ছাড়ার এই ‘রেড সিগন্যাল’ পেয়েছেন।

রেড কার্ড নিয়ে অনেক কীর্তি ফুটবল বিশ্বে রয়েছে। একক খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ লাল কার্ড দেখা জেরার্ডো রেদোয়া খেলোয়াড় জীবন শেষে কোচ হন। কোচ হিসেবে নিজের প্রথম ম্যাচেই সাইডলাইন থেকে রেফারিকে গালি দিয়ে ২১ মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখেন। আবার বিশ্বের অন্যতম স্ট্রাইকার, যিনি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই লাল কার্ড পেয়েছিলেন। নাম তার লিওনেল মেসি।

এই লাল কার্ডের বিষয়টি ফুটবলে আসলো কবে থেকে? এর ইতিহাস কী?

দেড় শ’ বছরের ফুটবলের ইতিহাসে লাল কার্ড সঙ্গী হয়েছে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। শুধু লাল নয়, পাশাপাশি সতর্কতামূলক হলুদ কার্ডের যাত্রাও এই বিশ্বকাপ থেকেই। তবে মজার বিষয় সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পাঁচটি হলুদ দেখানো হলেও পুরো টুর্নমেন্টে জুড়ে কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি।

কেন মেক্সিকো বিশ্বকাপে কার্ডের যাত্রা শুরু হলো, তা জানতে যেতে হবে তারও আট বছর আগে ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে। সেই টুর্নামেন্টে চিলি ও ইতালির মধ্যে একটি ম্যাচ হয়। যা চিলি ২-০ গোলে জেতে। সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসে ‘ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত। ম্যাচটিকে মোহামেডান ও আবাহনীর মধ্যকার রাইভালরির মতো তুলনা করা যায়। যেখানে দু’দেশের সম্মান ও ঐতিহ্য জড়িত ছিল।

৬০ সালে চিলিতে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াভহ ভূমিকম্প হয়। অবস্থা এমন চিলি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত চিলি বিশ্বকাপ আয়োজন করে। কিন্তু ইতালি সেই সময় চিলির অর্থনীতি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথাবার্তা বলতে থাকে। তাতে চিলির আত্মসম্মানে ঘা লাগে। তাই ম্যাচটি যত না একটি খেলা ছিল, তার থেকেও বেশি ছিল চিলির মান-সম্মান রক্ষার লড়াই। ম্যাচ শুরুর কয়েক সেকেন্ড থেকে লাথি, ঘুষি, থুতু মারাসহ সব ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল সেই ম্যাচে।

তখন রেফারি খেলা পরিচালনা করলেও খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল না। তারা মুখে সতর্ক করতে পারতেন বা মাঠ ছেড়ে চলে যেতে বলতেন। এখানে সমস্যা হলো দর্শকরা বুঝতে পারতো না কেন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বের হয়ে যেতে হচ্ছে। এতে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতো। তা ছাড়া ভিন্ন ভাষাভাষীর খেলোয়াড়দের সাথে এই কারণে ভুল বোঝাবুঝি চলতো।

সেই ম্যাচে ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টন মুখে খেলোয়াড়কে সতর্ক করছিলেন। খেলা সুষ্টুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি একপর্যায়ে ইতালির এক খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু রেফারির নির্দেশ বুঝতে না পেরে বা ইচ্ছে করে তিনি মাঠ ছেড়ে যাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে মাঠে পুলিশ ঢুকে তাকে বের করে।

তখন প্রশ্ন ওঠে- রেফারিরা ম্যাচ পরিচালনার সাথে সাথে খেলোয়াড়দের কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। পাশাপাশি দর্শকদের বিভ্রান্তি থেকে বের করবে। তা নিয়ে সমাধানে আসতে আসতে এসে গেল ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের কোয়াটার ফাইনাল ম্যাচে বেপরোয়াভাবে খেলার কারণে জার্মান রেফারি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাদের ভাষার ভিন্নতার কারণে জটিলতা দেখা দেয়। এ কারণে রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এ পরিস্থিতে সামাল দিতে তখন মাঠে আবার নামতে হয় কেন অ্যাস্টনকে।

সেইদিন ম্যাচ শেষে গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিলেন অ্যাস্টন। রাস্তার হেডলাইট থেকে তার মাথায় চলে আসে মাঠের সমস্যার সমাধান। এরপর ফিফার সাথে আলোচনা করে সতর্ক করার জন্য হলুদ কার্ড ও মাঠ ছেড়ে যেতে বলার জন্য লাল কার্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। প্রথমে এই পদ্ধতি নিয়ে ফিফার একটু সংশয় ছিল। কিন্তু পরীক্ষামূলক ম্যাচগুলোতে এই পদ্ধতি সব সমস্যার সমাধান করে দেয়।

এরপর মেক্সিকো বিশ্বকাপে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় লাল ও হলুদ কার্ডের চলন। হলুদ দেখালে সতর্ক হও, আর লাল দেখালে মাঠ ছেড়ে বের হও। এই নিয়মের প্রথম বিশ্বকাপে কেউ লাল কার্ডের দেখা না পেলেও ১৯৭৪ এর বিশ্বকাপে চিলির খেলোয়াড় কার্লোস কাসজেলি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।

সময়ে সময়ে লাল কার্ড ব্যবহারে বিভিন্ন নিয়ম আরোপ করে ফিফা। কিন্তু যেকোনো খেলায় খেলোয়াড়ের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ফুটবলে লাল কার্ডের বিকল্প আজও বের হয়নি।