বিশ্বকাপ এলেই ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘিরে প্রত্যাশার শেষ নেই। ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দলটির প্রতিটি বিশ্বকাপ অভিযানের সাথে জড়িয়ে থাকে কোটি কোটি সমর্থকের স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের রঙ অনেক দিন ধরেই কিছুটা ফিকে। শেষবার ট্রফি জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ দুই যুগ। এরপর থেকে প্রতিটি আসরে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে, হতাশা নিয়ে।
এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই নতুন অভিযানে নেমেছে সেলেসাওরা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপে শুরু থেকেই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ব্রাজিলকে।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী মরক্কো। রোববার ভোর চারটায় বিখ্যাত মেট লাইফ স্টেডিয়ামে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিরোপাজয়ীরা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের মতো ধারাবাহিকতা আর কোনো দলের নেই। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নেয়া একমাত্র দল তারা। সবচেয়ে বেশি ১১৪টি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ ৭৪টি জয়ও তাদের দখলে।
তবুও ইতিহাসের গৌরব বর্তমানের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না—সেটিই যেন বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে গত দুই দশক। ২০০২ সালের পর গত চারটা বিশ্বকাপে পৌনে সাত কেজির সোনার টুকরোর দেখা পায়নি সেলেসাওরা।
বাছাইপর্বও খুব একটা সহজ ছিল না। ১৮ ম্যাচে মাত্র ৮ জয়, ৪ ড্র ও ৬ হারে কনমেবল অঞ্চলের পঞ্চম দল হিসেবে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করতে হয়েছে ব্রাজিলকে। শেষ বাছাই ম্যাচে বলিভিয়ার কাছে ১-০ গোলে হার ছিল বড় এক অঘটন।
এরপর প্রস্তুতি ম্যাচে জাপান ও ফ্রান্সের বিপক্ষেও হারতে হয়েছে হলুদ জার্সিধারীদের। তবে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে সাম্প্রতিক সময়ে বদলে গেছে দলের চেহারা।
ক্রোয়েশিয়া, পানামা ও মিসরের বিপক্ষে টানা বড় জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে ব্রাজিল। নতুন কোচের অধীনে দলটি আবারো নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে ভুলের সুযোগ নেই। প্রতিটি ম্যাচই হতে পারে ভাগ্য নির্ধারণী। তবে ভাগ্য কিছুটা কথা বলছে ব্রাজিলের হয়ে। প্রথম ম্যাচের আগে অবশ্য বড় ধাক্কা খেয়েছে সেলেসাওরা। দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ নেইমারকে ছাড়াই মাঠে নামতে হবে তাদের।
তবুও বর্তমান স্কোয়াডে তারকার অভাব নেই। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া ও ইগোর থিয়াগোর গতি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
নেইমারের অনুপস্থিতিতে আক্রমণে বাড়তি দায়িত্ব নিতে পারেন মাতেউস কুনিয়া। সৃজনশীল ভূমিকায় থাকবেন লুকাস পাকেতা। মাঝমাঠে অভিজ্ঞ কাসেমিরোর সাথে ব্রুনো গিমারেশের সমন্বয় ব্রাজিলকে দেবে বাড়তি শক্তি।
রক্ষণভাগেও যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ দলটি। মারকিনিয়োস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েসের অভিজ্ঞতার সাথে গোলবারের নিচে থাকবেন নির্ভরযোগ্য আলিসন বেকার। ফলে আক্রমণ ও রক্ষণ— দুই বিভাগেই শক্তিশালী ব্রাজিল।
এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আরেকটি বড় আকর্ষণের নাম কার্লো আনচেলত্তি। দেশের ইতিহাসে প্রথম বিদেশী কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন ইতালিয়ান এই কিংবদন্তি।
ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপা জেতা আনচেলত্তির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফি ব্রাজিলকে এনে দেয়া।
দলের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিসন বেকারও বুঝতে পারছেন যে তা মোটেও সহজ হবে না। মজার ছলেই তিনি বলেছেন, ‘ব্রাজিলের কোচ হওয়া যেন দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেয়েও বেশি চাপের।’
তার এই মন্তব্যই ফুটিয়ে তোলে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের বাস্তবতা—যেখানে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি জাতির আবেগ, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের অংশ।
তাই মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং দুই যুগের অপেক্ষা ঘোচানোর স্বপ্নযাত্রার প্রথম ধাপ। সেই পথচলার শুরুটা জয় দিয়ে করতে পারলে হেক্সা জয়ের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে সেলেসাওদের।
আর ব্যর্থতা হলে শুরুতেই বাড়বে চাপ। এখন দেখার অপেক্ষা, বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারো সাম্বার জাদু ছড়াতে পারে কি না ব্রাজিল। তবে সেলেসাওদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে একটি পরিসংখ্যান।
২৪ বছর ধরে চলা এই খরা ঠিক ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেবারও দুই যুগের খরা কাটিয়ে আমেরিকার মাটিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেলেসাওরা।
এবারো ভেন্যু সেই আমেরিকা। তবে কী আরো একবার শিরোপা জিততে যাচ্ছে ব্রাজিল?



