বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক অভিষেকের নায়ক ভোজিনিয়া

নীল পোশাকে এবং লাল, সাদা ও নীল পতাকা হাতে নিয়ে তারা পুরো সময় ধরে গান গেয়েছে ও নেচেছে, প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাদের দলকে সাহস যুগিয়েছে। খেলা শেষ হওয়ার আগেই নিরপেক্ষ দর্শকরাও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেপ ভার্দের গল্প হয়ে উঠেছিল সবার গল্প!

নয়া দিগন্ত অনলাইন
স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশি বেজে উঠল, ক্যামেরাগুলো কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দিকে ঘুরে গেল...
স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশি বেজে উঠল, ক্যামেরাগুলো কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দিকে ঘুরে গেল... |বিবিসি

আটলান্টা স্টেডিয়ামে যখন শেষ বাঁশি বেজে উঠল, ক্যামেরাগুলো কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার দিকে ঘুরে গেল!

বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট স্পেনের সাথে তার দলের গোলশূন্য ড্রয়ের পর, তিনি যা অর্জন করেছেন তার বিশালতা যখন ধীরে ধীরে উপলব্ধ হতে শুরু করল, তখন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষকের গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।

ততক্ষণে গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়েছে! এবং হাজার হাজার কেপ ভার্দে সমর্থক, যারা ৯০ মিনিট ধরে অবিরাম চিৎকার করে নিজের দলকে সমর্থন যুগিয়েছেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নেচেগেয়ে ম্যাচের ফল উপভোগ করতে শুরু করেছেন।

মাঠে, খেলোয়াড়রা পরম আনন্দে একে অপরের দিকে ছুটে গেলেন। এমনকি নিরপেক্ষ দর্শকরাও এ উদযাপনে মেতে উঠেছিলেন।

ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া তার জীবনের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে একটি বীরত্বপূর্ণ ক্লিন শিট অর্জন করেন এবং তার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ফলাফলটি এনে দিয়েছেন।

ম্যাচসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাওয়ার পর ভোজিনিয়া বলেন, ‘আমি কেঁদেছিলাম, কারণ আমি আমার দাদা-দাদির সাথে বড় হয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত তারা এখানে ছিলেন না। তারা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। তারা আমার সবকিছু ছিলেন, আমার জীবনের সবকিছু। আর আমি কেঁদেছিলাম আমার মায়ের জন্যও। ভিসার কারণে তিনি এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে টাকা দিতে হয়, সেটা সময়মতো আমরা গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম তিনি এখানে থাকুন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সেরা অস্ত্র হলো ঐক্য। আজ যে খেলোয়াড়ই আসুক, বা যে খেলোয়াড়ের বয়স ১০ বা ১৫ বছর হোক, আমরা আমাদের পরিবারের সাথে যেভাবে আচরণ করি, সেভাবেই আচরণ করব। কারণ সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

‘সবাই ভেবেছিল যে আমরা এখানে শুধু বিশ্বকাপ উপভোগ করতে এসেছি। কিন্তু না, আমরা জানি যে আমাদের এমন দল আছে, যাদের আমরা সবসময় সম্মান করব, কারণ এটা আমাদের প্রথমবার। কিন্তু আমরা এখানে প্রতিযোগিতা করতে এসেছি। এবং আমরা আমাদের দেশের জন্য লড়াই করতে এসেছি।’

‘এটা ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন ছিল’

ভোজিনিয়ার জন্য এ মুহূর্তটি ছিল সারাজীবনের সাধনা।

জোসিমার দিয়াস নামে জন্ম নেয়া কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তাড়া করে গেছেন।

অবশেষে যখন সেই স্বপ্ন পূরণ হলো, তার সাথে ইতিহাসও জড়িয়ে গেল। তিনি ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে কোনো দেশের হয়ে বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে অংশ নেয়া সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড গড়েন, যা রোববার কুরাসাওয়ের এলোয় রুমের গড়া রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বকাপে অভিষেকের সময় কেবল মিসরের এসাম এল হাদারিই তার চেয়ে বেশি বয়সী ছিলেন।

অধ্যবসায় দিয়ে সংজ্ঞায়িত একটি ক্যারিয়ারের এটি একটি দারুণ মাইলফলক।

ভোজিনিয়া বলেন, ‘আমি ২০১২ সালে, ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করি। আমার মতো একজনের জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।’

‘আমি জাতীয় দল ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু এ স্বপ্নের জন্য আমি খেলা চালিয়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘এ পারফরম্যান্স সবার জন্যই। আমি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছি, কিন্তু এ পুরস্কারটি আমার সব সতীর্থদের জন্য, কারণ তাদের ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। এবং আমি দলের জন্য ও মানুষের জন্য কাজ করে যাব।’

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ছয় শ’ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কেপ ভার্দে একটি সুন্দর কিন্তু বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে তরুণ ফুটবলারদের জন্য সুযোগ সীমিত।

মিন্ডেলোতে বেড়ে ওঠার সময়, ভোজিনিয়া শুরু থেকেই প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি আমার দ্বীপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক ছিলাম, কিন্তু আমি ছোট ছিলাম। এমনকি যখন আমি ভালো খেলতাম, তখনো উচ্চতার কারণে আমাকে দলে নেয়া হতো না।’

তার আগের অনেক খেলোয়াড়ের মতো, তিনিও সুযোগের সন্ধানে অবশেষে দেশটির সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালে পাড়ি জমান।

সেই সিদ্ধান্তটি এমন একটি ক্যারিয়ারের সূচনা করেছিল, যা তাকে স্লোভাকিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা ও সাইপ্রাসে নিয়ে যায়। এখন ভোজিনিয়া পর্তুগালের দ্বিতীয় সারির দল চাভেসের হয়ে খেলেন।

এমনকি ভোজিনিয়ার নামের সাথেও ফুটবল ইতিহাসের একটি অংশ জড়িয়ে আছে।

তার বাবা আর্জেন্টিনা ও রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি হোর্হে ভালদানোর নামে তার নাম ‘ভালদানো’ রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেপ ভার্দে কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি হয়নি।

এর পরিবর্তে, তার নাম রাখা হয়েছিল জোসিমার, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে খ্যাতি পাওয়া ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের নামে নামকরণ করে।

কয়েক দশক পরে, আরেকটি বিশ্বকাপের মঞ্চে, ভোজিনিয়া নিজের একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।

‘ভোজিনিয়া ম্যাচকে আলোকিত করেছে’

হাজার হাজার কেপ ভার্দে সমর্থকের উল্লাসে তিনি স্পেনের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন।

বিশ্বকাপের এক ম্যাচে এর চেয়ে বেশি সেভ করা একমাত্র গোলরক্ষক ছিলেন প্যাট জেনিংস, যিনি ১৯৮৬ সালে নিজের ৪১তম জন্মদিনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের হয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১০টি সেভ করেছিলেন।

আটলান্টার গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা প্রতিটি সেভকে কেপ ভার্দের গোলের মতোই স্বাগত জানাচ্ছিল।

মাঠের বাইরেও তিনি ভাইরাল হয়ে উঠছিলেন।

ব্রাজিলে বিশ্বকাপের স্বত্ব থাকা ইউটিউব চ্যানেল কেজটিভি তাদের দর্শকদের তাকে অনুসরণ করতে বলার পর ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৫০ লক্ষেরও বেশি হয়ে যায়।

পরে এ বিষয়ে জানতে পেরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য।’

স্কটল্যান্ডের সাবেক উইঙ্গার প্যাট নেভিন বলেন, গোলরক্ষক অসাধারণ খেলেছেন।

‘তিনি ৪০ বছর বয়সে এটা করেছেন। প্রত্যেকটি ক্যামেরা তার দিকে তাক করা, তার সব খেলোয়াড় তার দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। এ এক অসাধারণ মুহূর্ত।’

কেপ ভার্দে খেলার সিংহভাগ সময় নিজেদের ১৮ গজ বক্সের মধ্যেই কাটিয়েছে- পুরোটা সময় নয়, এবং যখন তারা পাল্টা আক্রমণ করেছে, তারা সাহসী ছিল এবং দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করেছে।

‘এটা করা এবং মনোযোগের এই স্তর বজায় রাখা, আপনি যদি কয়েকজন ব্যক্তি হন, তবে তা করতে পারবেন না, আপনি কেবল একটি দল হলেই তা করতে পারবেন।’

আইটিভিতে লি ডিক্সন যোগ করেছেন, ‘এটা সত্যিই অসাধারণ। এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। এই পয়েন্টটা তাদের প্রাপ্য ছিল এবং স্পেনের তো এক পয়েন্টও পাওয়ার কথা না। তারা হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়ছে, কিন্তু রাতটা কেপ ভার্দের।’

‘তাদের প্রত্যেকের কী অসাধারণ পারফরম্যান্স, সেন্টার হাফ, ফুল-ব্যাক, ওই যে লোকটা (ভোজিনিয়া) কাঁদছে- আমারো প্রায় চোখে পানি এসে যাচ্ছে।’

মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য, যারা বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় ক্ষুদ্রতম, এই ফলাফলটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

গ্যালারিতে তাদের সমর্থকেরাও সেই তীব্রতার সাথে পাল্লা দিচ্ছিল।

নীল পোশাকে এবং লাল, সাদা ও নীল পতাকা হাতে নিয়ে তারা পুরো সময় ধরে গান গেয়েছে ও নেচেছে, প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তাদের দলকে সাহস যুগিয়েছে।

খেলা শেষ হওয়ার আগেই নিরপেক্ষ দর্শকরাও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেপ ভার্দের গল্প হয়ে উঠেছিল সবার গল্প!

শেফিল্ডের চেয়ে বড় নয় এমন একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ফুটবল বিশ্বের কল্পনাকে জয় করে নিয়েছিল।

সূত্র : বিবিসি