সমালোচকদের ফুটবল দেখার পরামর্শ ফিফা সভাপতির

ফিফা সভাপতি হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজনে অবদান রাখতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত গর্বিত মনে করে ইনফান্তিনো।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো |ফাইল ছবি

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সমালোচকদের তার নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিশ্বকাপ সম্পর্কে ‘ঘৃণা ও মিথ্যা গুজব ছড়ানোর’ পরিবর্তে ‘ফুটবল ম্যাচ দেখার’ পরামর্শ দিয়েছেন।

ইনফান্তিনো তার ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৫টি স্লাইডের একটি পোস্টে মন্তব্য করেন, যখন তারা ‘ঘৃণার বীজ বপনে ব্যস্ত’, তখন ফিফা ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আয়োজন’ পরিবেশন করছিল।

ইনফান্তিনো টুর্নামেন্টের বেশ কয়েকটি বহুল আলোচিত বিতর্ককে উড়িয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সঙ্ঘাত সত্ত্বেও বিশ্বকাপে ইরানের অংশ নেয়াকে একটি সাফল্য হিসেবে প্রশংসা করেছেন তিনি।

তার মন্তব্য ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোইয়ের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বলেছিলেন, বিশ্বকাপে তার দলই ছিল সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত।

টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিপর্বে লজিস্টিক সমস্যার কারণে ইরানের ভিসা পেতে বিলম্ব হয়েছিল। তাদের ‘অপরিহার্য’ সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এবং ভক্তদের জন্য বরাদ্দ টিকিট বাতিল করা হয়। এছাড়া, ইরানকে তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অ্যারিজোনার টুকসন থেকে মেক্সিকোর টিহুয়ানায় সরিয়ে নিতে হয়েছিল।

পরে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং সিয়াটলে তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময়ও তাদের চলাচলে বিধিনিষেধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

এই ধরনের সমস্যা শুধু ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের সমর্থকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে, সোমালিয়ান রেফারি ওমর আরতানকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং একক প্রবেশাধিকারের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের সন্দেহভাজন সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্টতার’ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে ইনফান্তিনো লিখেন, ‘আপনারা ভিসা না পাওয়া অল্প কিছু লোকের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে অনুমোদন পাওয়া লাখ লাখ মানুষের বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। কারণ ফুটবল বিশ্বকে একতাবদ্ধ করে এবং এই গ্রীষ্মে তা দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’

টুর্নামেন্টের নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, ‘কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সহিংসতা ঘটেনি। টুর্নামেন্ট জুড়ে ছিল শুধু আনন্দ, আবেগ, সুখ, ঐক্য এবং সংহতি।’

তবে, বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর খেলোয়াড় ও ব্যাকরুম স্টাফরা স্পেনের খেলোয়াড়দের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় ফিফা আর্জেন্টিনার কর্মকাণ্ডের তদন্ত করছে। এছাড়াও, আমেরিকান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনফ্লুয়েন্সার আইশোস্পিডের প্রতি বর্ণবাদী গালিগালাজ করার অভিযোগের তদন্তও করছে সংস্থাটি। একইসাথে আটলান্টায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালসহ একাধিক ম্যাচে সমর্থকদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামগুলোতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)-এর কর্মকর্তারাও বিতর্কিতভাবে উপস্থিত ছিলেন।

রেফারিংয়ের মান এবং টুর্নামেন্টে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়েও মুখ খুলেছেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ফিফা কর্তৃক মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হয়। এতে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার সুযোগ দেয়া হয় তাকে।

পুরুষদের বিশ্বকাপে দেখানো ১৯১টি লাল কার্ডের মধ্যে বালোগান একমাত্র খেলোয়াড় যিনি নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

উয়েফা এই সিদ্ধান্তকে ‘সীমা লঙ্ঘন’ এবং ‘অভূতপূর্ব, অবোধ্য ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ফিফার নীতি কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার কথা ভাবছে।

তবে ইনফান্তিনো যুক্তি দিয়েছেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। তার দাবি, বিশ্বজুড়ে কয়েকটি বৃহত্তম লিগে এই ধরনের রায় নিয়মিত এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

তিনি আরো বলেন, ‘যে দেশগুলো এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করছে, তারাই আবার সমালোচনা করছে।’

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছে, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের কোনো সম্ভাব্য অভিযোগে তারা ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে তদন্ত করবে না। তাদের মতে, মানবাধিকার সংস্থা ফেয়ারস্কয়ারের করা অভিযোগটি তাদের নীতিশাস্ত্র কমিশনের এখতিয়ারের বাইরে।

ইনফান্তিনোর সমালোচকদের পরামর্শ দেন, সেই টুর্নামেন্টের প্রতি ‘কিছুটা ভালোবাসা এবং ‘সম্মান’ দেখান, যেখানে ‘মানুষ পরিবার হিসেবে, ভক্ত হিসেবে, একত্রিত হয়েছিল’।

ইনফান্তিনো লিখেছেন, ‘যারা আমাদের এই সুন্দর খেলা, আবেগ, উদযাপন, হাসি, কান্না, ছলনা এবং আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যাদের জন্য সুন্দর খেলাটি শিশু, নবজাতক, দাদা-দাদি ও বাবা-মায়েদের একত্রিত হওয়া দেখতে পারেননি—দুঃখিত আপনারা ঘৃণা ও সমালোচনায় এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে এই সবকিছুই আপনাদের চোখ এড়িয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যখন তারা উদযাপন করছিল, আপনি তখন ঘৃণার বীজ বপন করতে ব্যস্ত ছিলেন। আমাদের এই পৃথিবীতে ভালোবাসা প্রয়োজন, ঘৃণা নয়। যারা আমাদের ঘৃণা করতে নিজেদের সময় ও শক্তি ব্যয় করছেন, অনুগ্রহ করে এক মুহূর্ত সময় নিয়ে ভাবুন অথবা একটি ফুটবল ম্যাচ দেখুন। মন দিয়ে মুখগুলো, চোখগুলো, আবেগগুলো পর্যবেক্ষণ করুন।’

ফিফা সভাপতি হিসেবে এই আয়োজনে অবদান রাখতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত গর্বিত মনে করে তিনি।

সূত্র: বিবিসি