বিশ্বকাপে পরাশক্তিদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে যেসব দল

২০২৬ বিশ্বকাপে পরাশক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বেলজিয়াম, জাপান, নরওয়ে, কলম্বিয়া, সুইডেন, মেক্সিকো, মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়া। শক্তিশালী স্কোয়াড, কার্যকর কৌশল ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে এই ‘ডার্ক হর্স’ দলগুলো যে কোনো সময় ফেভারিটদের ছিটকে দিয়ে বড় চমক দেখাতে পারে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

বিশ্বকাপ শুধুমাত্র সেরাদের প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি সেই প্রতিযোগিতাও যেখানে অপ্রত্যাশিত ফলাফল ঘটে থাকে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এমন কিছু দল আছে যারা ঘনঘন অঘটন তৈরি করে এবং পরাশক্তিদের স্তব্ধ করে দেয়।

ট্রফি জয়ের ফেভারিট তালিকায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা স্পেনের মতো দলগুলোর ভিড়ে শুরুতে এদের নাম তেমন আলোচনায় থাকে না। তবে টুর্নামেন্ট শুরু হতেই বড় দলগুলোকে হারিয়ে সমীকরণ ওলটপালট করে দেয়। ফুটবল পরিভাষায় এ দলগুলোকে ‘ডার্ক হর্স’ বলা হয়ে থাকে।

বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো- তিনটি দেশের যৌথ আয়োজনে লড়ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ম্যাচ ও দলের সংখ্যা বাড়ায় এবার নকআউট পর্বের সমীকরণ দীর্ঘ ও জটিল।

এবারের টুর্নামেন্টে বড় দলগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন কয়েকটি দলের বর্তমান অবস্থা, ইতিহাস, শক্তির জায়গা ও দুর্বলতাসহ নানাদিক নিয়ে চলুন জেনে নিই এখানে...

বেলজিয়াম

বিগত এক দশক ধরে বেলজিয়ামকে প্রতিটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফেবারিট কিংবা অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। কাতার বিপর্যয়ের পর দলটিতে ব্যাপক রদবদল এসেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে বেলজিয়ামের সেই চেনা রূপটি পুরোপুরি বদলে গেছে। ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেলজিয়ামের দায়িত্ব নেয়ার পর দলটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এবং খেলার ধরনে পরিবর্তন এনেছেন। ডেটা-ভিত্তিক বা আধুনিক পরিসংখ্যান-নির্ভর বিশ্লেষণের চেয়ে গার্সিয়া কিছুটা প্রথাসিদ্ধ ফুটবল দর্শনে বিশ্বাসী।

দলে ফুটবলারদের মানসিকতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন।

গার্সিয়ার অধীনে বেলজিয়ামের বর্তমান স্কোয়াডটি মূলত তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এখনো আছেন কেভিন ডি ব্রুইনা। বয়স বাড়লেও তার পাসিং রেঞ্জ এবং দূরদর্শিতা এখনো বিশ্বমানের।

উইংয়ে ম্যানচেস্টার সিটির জেরেমি ডোকুর গতি এবং ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য চিন্তার কারণ।

আক্রমণে আছেন দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলস্কোরার রোমেলু লুকাকু, আর্সেনালের লিয়ান্দ্রো ত্রোসার এবং চার্লস ডি কেটেলারে।

গার্সিয়ার অধীনে বেলজিয়াম সাধারণত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলে, যা ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ৪-৩-৩ ছকে রূপান্তরিত হয়।

কাতার বিশ্বকাপে পূর্ববর্তী কোচের সাথে দূরত্বের কারণে দলে না থাকা গোলকিপার থিবো কোর্তোয়াকে রুডি গার্সিয়া দলে ফিরিয়ে এনেছেন, যা গোলপোস্টের নিচে বড় স্বস্তি।

১৪ বার বিশ্বকাপে অংশ নেয়া বেলজিয়ামের সেরা সাফল্য ২০১৮ সালের তৃতীয় স্থান।

জাপান

সবশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি এবং স্পেনকে গ্রুপ পর্বে হারিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল জাপান। নকআউটে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হারলেও তারা প্রমাণ করেছে, এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম প্রধান শক্তি এখন তারাই।

এশিয়ান কাপে রেকর্ড চারবারের চ্যাম্পিয়ন জাপানের ফুটবল ইতিহাস শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতার প্রতীক। ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে জাপান কেবল অংশগ্রহণকারী দল নয়, ট্যাকটিকাল ডিসিপ্লিনের দিক থেকে তারা যেকোনো ইউরোপীয় বা লাতিন পরাশক্তির সমকক্ষ।

জাপানের বর্তমান স্কোয়াডের প্রায় সব মূল খেলোয়াড়ই ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলছেন।

ব্রাইটনের উইঙ্গার কাওরু মিতোমা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ড্রিবলার, কিন্তু হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে বিশ্বকাপ খেলতে পারছেন না তিনি।

রিয়াল সোসিয়েদাদের তাকেফুসা কুবোর কাঁধে আক্রমণভাগে ক্রিয়েটিভিটি যোগ করার দায়িত্ব থাকবে। আর মাঝমাঠে লিভারপুলের ওয়াতারু এন্দো দলকে ডিফেন্সিভ সুরক্ষা দেন।

দলগত সংহতি এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা জাপানি খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল স্কিলকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই দলের স্কোয়াড গভীরতা চমৎকার; বিশেষ করে মাঝমাঠ ও উইং পজিশনে প্রতিস্থাপন করার মতো একাধিক মানসম্পন্ন ফুটবলার তাদের বেঞ্চে রয়েছেন।

কোচ হাজিমে মোরিয়াসু প্রতিপক্ষ বুঝে নিজেদের ফর্মেশন দ্রুত পরিবর্তন করতে পারেন।

সাধারণত তিনি ৪-২-৩-১ বা ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে দলকে খেলান। বল পজেশন ধরে রাখার চেয়ে মোরিয়াসুর দল পছন্দ করে ‘মিড-ব্লক’ বা ‘লো-ব্লক’ ডিফেন্স করে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলতে।

তবে জাপানের ঐতিহ্যগত দুর্বলতা হলো একজন ওয়ার্ল্ড ক্লাস ‘নম্বর নাইন’ বা জাত ফিনিশারের অভাব।

১৯৯৮ থেকে টানা বিশ্বকাপে খেলছে জাপান। চারবার শেষ ১৬-তে উঠলেও কোয়ার্টার ফাইনালের মুখ দেখা হয়নি তাদের।

নরওয়ে

ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় আক্ষেপ ছিল, বর্তমান যুগের অন্যতম সেরা দুই তারকা আর্লিং হাল্যান্ড এবং মার্টিন ওডেগার্ডের আন্তর্জাতিক কোনো বড় মঞ্চে খেলতে না পারা।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট নরওয়েকে এনে দিয়েছে এক সুবর্ণ সুযোগ। উয়েফা কোয়ালিফায়ার্সের কঠিন বাধা পেরিয়ে উত্তর আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করা নরওয়ে এখন লাইমলাইটে।

অতীতে তাদের ফুটবল ইতিহাস খুব একটা সমৃদ্ধ না হলেও নব্বইয়ের দশকে তারা শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত ছিল।

নরওয়ের স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে দু’টি নাম সবার আগে আসবে। একজন হলেন আর্লিং হাল্যান্ড- ম্যানচেস্টার সিটির এই গোলমেশিনকে থামানোর ফর্মুলা আধুনিক ফুটবলে খুব কম ডিফেন্ডারই জানেন।

আর তাকে বল সাপ্লাই দেয়ার জন্য আছেন আর্সেনালের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড, যার ক্রিয়েটিভিটি এবং পিন-পয়েন্ট পাসিং বিশ্বমানের।

এই দুই তারকার সাথে যোগ হয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির তরুণ উইঙ্গার অস্কার বব। এছাড়াও ডেড বল বা কর্নারে কার্যকর আতলেতিকো মাদ্রিদের স্ট্রাইকার আলেক্সান্ডার সরলথের দিকেও নঞ্জর দেবেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা।

তবে স্কোয়াড গভীরতার দিক থেকে নরওয়ে বেশ পিছিয়ে। তাদের প্রথম একাদশ যতটা শক্তিশালী, বেঞ্চের শক্তি ঠিক ততটাই নড়বড়ে।

কোচ স্টেল সলবাকেন মূলত ওডেগার্ডকে কেন্দ্র করে খেলা সাজান। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে নরওয়ে চেষ্টা করে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে।

নরওয়ের মূল শক্তির জায়গা যেমন তাদের দুই সুপারস্টার, ঠিক তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের বাকি দলটির সাধারণ মান।

নরওয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে।

ওডেগার্ড-হাল্যান্ড জুটি যদি ক্লিক করে, তবে নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সারপ্রাইজ হতে পারে।

কলম্বিয়া

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে না পারাটা ছিল কলম্বিয়ান ফুটবলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফর্ম করে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে তারা।

কার্লোস ভালদেরামা থেকে শুরু করে হামেস রদ্রিগেজের যুগে কলম্বিয়া সবসময়ই নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়েছে। বর্তমানে তারা লাতিন আমেরিকার অন্যতম ফর্মে থাকা এক দল।

কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের প্রধান নেতা লিভারপুলের লুইস দিয়াজ। লেফট উইং দিয়ে তার গতি, ড্রিবলিং এবং ভেতরের দিকে কেটে এসে শট নেয়ার ক্ষমতা প্রতিপক্ষের রাইট-ব্যাকদের জন্য বড় পরীক্ষা।

আর্জেন্টাইন কোচ নেস্টর লরেঞ্জো দায়িত্ব নেয়ার পর কলম্বিয়া সাধারণত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলে এবং প্রচণ্ড হাই-প্রেস করে। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত উইংয়ে লুইস দিয়াজের কাছে বল পাঠানোই থাকে তাদের মূল লক্ষ্য।

জেমস রদ্রিগেজ মূলত ‘ফ্রি রোমিং ১০’ হিসেবে খেলেন, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্স মিডফিল্ডারদের পজিশন ভেঙে দেয়।

কলম্বিয়ার মূল সমস্যা তাদের অতিরিক্ত শারীরিক ফুটবলের প্রবণতা।

২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল কলম্বিয়া, যা তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য।

উত্তর আমেরিকার কন্ডিশন এবং গ্যালারিতে বিশাল কলম্বিয়ান সমর্থকদের উপস্থিতি তাদের বাড়তি সুবিধা দেবে।

সুইডেন

জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের যুগের অবসানের পর সুইডিশ ফুটবল কিছুটা দিক হারিয়ে ফেলেছিল। কাতার বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া এবং উয়েফা নেশনস লিগে অবনমন তাদের বড় সঙ্কটে ফেলে।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে সুইডেন ফিরছে নতুন রূপে। তাদের ফুটবল ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবে বেশ সমৃদ্ধ, তারা অতীতে বিশ্বকাপের ফাইনালও খেলেছে।

বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম ফর্মে থাকা স্ট্রাইকার হলেন সুইডেনের ভিক্টর গিওকেরেস। আর্সেনালের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জয় করা এই ফরোয়ার্ডের সাথে আছেন লিভারপুলের আলেকজান্ডার ইশাক, যার ড্রিবলিং ও ফিনিশিং স্কিল উন্নত মানের।

নিউক্যাসলের অ্যান্থনি ইলাঙ্গা উইংয়ে গতির সঞ্চার করতে পারেন।

স্কোয়াডের গভীরতার দিক থেকে সুইডেন কিছুটা ভারসাম্যহীন। তাদের আক্রমণভাগ যতটা বিশ্বমানের, সেই তুলনায় রক্ষণ বা মাঝমাঠের বেঞ্চ ততটা গভীর নয়।

বিশ্বকাপের ঠিক আগে সুইডেনের ডাগআউটে টমাসনের জায়গায় চেলসি ও ব্রাইটনের সাবেক ইংলিশ কোচ গ্রাহাম পটার আসায় দলটির ট্যাকটিক্যাল দর্শনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

পটারের অধীনে সুইডেন সাধারণত ৩-৪-২-১ অথবা ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলছে। তিনি চান তার দল নিচ থেকে ছোট ছোট পাসে নিখুঁতভাবে বিল্ড-আপ করুক এবং প্রতিপক্ষকে উইং ও হাফ-স্পেস দিয়ে আক্রমণ করুক।

ভিক্টর গিওকেরেস এবং আলেকজান্ডার ইশাকের মতো গতিময় ফরোয়ার্ডদের পটার বক্সের ভেতর স্ট্রাইকার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

আক্রমণভাগ বিশ্বমানের হলেও পটারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সুইডেনের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের ধারাবাহিকতাহীনতা দূর করা।

১৯৫৮ সালের রানার্স-আপ এবং ১৯৯৪ সালের তৃতীয় স্থানকারী সুইডেন ২০১৮ সালেও কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল।

মেক্সিকো

মেক্সিকোকে এ তালিকায় রাখাটা কিছুটা অন্যরকম শোনাতে পারে, কারণ তারা বিশ্বকাপের নিয়মিত মুখ এবং কনকাকাফ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শক্তি।

তবে গত আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় তাদের গ্রাফ কিছুটা নিচে নামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শক্তি।

কারণ তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঘরের মাঠ, আর এবার তারা টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান স্বাগতিক দেশ। কন্ডিশন এবং দর্শক সমর্থনের দিক থেকে তারা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।

মেক্সিকোর আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র এসি মিলান স্ট্রাইকার সান্তিয়াগো গিমেনেজ। মাঝমাঠের দায়িত্ব থাকতে পারে আলভারো ফিদালগো ও গিলবার্তো মোরার কাঁধে।

তারা দলের ট্যাকটিকাল ব্যালেন্স ধরে রাখেন। উইংয়ে গতিময় হারভিং ‘চুকি’ লোজানোকে মিস করতে পারে মেক্সিকো।

অভিজ্ঞ কোচ হাভিয়ের আগিরে মেক্সিকোর ডাগআউটে ফেরার পর দলে এক ধরনের কঠোর ডিসিপ্লিন নিয়ে এসেছেন।

মেক্সিকোর চেনা আক্রমণাত্মক ফুটবলকে তিনি কিছুটা গাণিতিক ও বাস্তববাদী রূপ দিয়েছেন। আগিরে মূলত ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দলকে খেলান। তার অধীনে মেক্সিকো উইং দিয়ে ওভারল্যাপ করে উইং-ব্যাকদের মাধ্যমে ক্রস বাড়াতে পছন্দ করে।

মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের ধারাবাহিকতার অভাব এবং বড় ম্যাচে অতি-উত্তেজিত হয়ে ট্যাকটিকাল ডিসিপ্লিন হারিয়ে ফেলা।

চাপের মুখে মেক্সিকান ডিফেন্স প্রায়ই খেই হারিয়ে ফেলে।

মেক্সিকো মোট ১৭ বার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে দুবার (১৯৭০ ও ১৯৮৬) কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল- দুবারই তারা ছিল স্বাগতিক।

মরক্কো

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বেলজিয়াম, স্পেন এবং পর্তুগালকে বিদায় করে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। সে সাফল্য কোনো ভাগ্যের জোর ছিল না, তা ছিল নিরেট ট্যাকটিকাল মাস্টারক্লাস।

তাদের এই ল্যান্ডমার্ক সাফল্য আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছে।

এবারো মরক্কো স্কোয়াড কাগজ-কলমে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। পিএসজির আশরাফ হাকিমি বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক, যার ওভারল্যাপিং রান প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে দেয়।

কাতার বিশ্বকাপের পর এই দলে নতুন যোগ হয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাহিম দিয়াজ, যা মরক্কোর আক্রমণভাগের ক্রিয়েটিভিটি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাঝমাঠ সচল রাখতে আছেন সোফিয়ান আমরাবাত। তবে গোলবারের নিচে ইয়াসিন বোনো এবারো থাকছেন।

ডিফেন্সে থাকছেন নুসাইর মাজরাউই। পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ প্রতিভার কারণে স্কোয়াডের গভীরতা এখন বেশ ভালো।

কোচ মোহামেদ ওয়াহবি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সিনিয়র দলের দায়িত্ব নেয়ার পর দলটির কৌশলগত ধরনে ভারসাম্য এনেছেন।

কাতার বিশ্বকাপের আগের রক্ষণাত্মক ও কাউন্টার-অ্যাটাকিং নির্ভরতা থেকে বের হয়ে ওয়াহবি দলকে কিছুটা প্রোগ্রেসিভ ও পাসিং-ভিত্তিক ফুটবলের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি সাধারণত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দলকে খেলান, যেখানে রক্ষণভাগের দৃঢ়তা ঠিক রেখে উইংয়ের গতি ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণে ওঠা যায়।

ছয়বার বিশ্বকাপে অংশ নেয়া মরক্কোর সেরা সাফল্য ২০২২ সালের চতুর্থ স্থান।

ক্রোয়েশিয়া

২০১৮ সালের রানার্স-আপ এবং ২০২২ সালের তৃতীয় স্থানকারী ক্রোয়েশিয়াকে এখনো অনেকে আন্ডারডগ মনে করেন। তবে মাঠের ফুটবলে তারা এক প্রমাণিত পরাশক্তি।

১৯৯৮ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই তৃতীয় হওয়া ক্রোয়েশিয়ার আসল শক্তি তাদের মাঝমাঠ।

লুকা মদ্রিচ, মাতেও কোভাচিচ এবং মারিও পাসালিচদের নিয়ে গড়া ৪-৩-৩ ফর্মেশনের মিডফিল্ড যেকোনো দলের কাছ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে কিংবদন্তি লুকা মদ্রিচের শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারের পারফরম্যান্স দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।

রক্ষণে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির জোসকো গাভার্দিওল, যিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ও দামি ডিফেন্ডার।

ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তাদের মানসিক শক্তি এবং অতিরিক্ত সময়েও ক্লান্তিহীনভাবে খেলে যাওয়ার ক্ষমতা।

তবে স্কোয়াড গভীরতার দিক থেকে আগের চেয়ে তাদের বেঞ্চ কিছুটা দুর্বল, বিশেষ করে মাঝমাঠের মূল তারকাদের বিকল্প এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি।

এছাড়া মদ্রিচের বয়স একটি বড় ফ্যাক্টর, পুরো ৯০ বা ১২০ মিনিট তার পক্ষে একই তীব্রতা ধরে রাখা কঠিন।

২০২৬ বিশ্বকাপের বর্ধিত ফরম্যাটে গ্রুপ পর্ব পার হওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও রাউন্ড অব ৩২ থেকে আসল পরীক্ষা শুরু হবে।

সেখানে একটি খারাপ দিন মানেই টুর্নামেন্ট থেকে সোজা বিদায়। আর এই নকআউট ফরম্যাটেই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে এই দলগুলোর রণকৌশল।

প্রথাগত পরাশক্তিদের ফেবারিট তকমা ভেঙে এ আটটি দলের যেকোনো একটি যদি টুর্নামেন্টের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সূত্র : বিবিসি