পাকিস্তান ক্রিকেটে যেন একের পর এক ঝড়। মাঠে ব্যর্থতা, কোচ বদল, খেলোয়াড় ছাঁটাই—সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড সফরের মাঝপথেই অস্থিরতায় পাকিস্তান দল। এমন পরিস্থিতিতে এবার সরাসরি নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান আকিব জাভেদকে কাঠগড়ায় তুলেছেন জেসন গিলেস্পি।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই পেসারের দাবি, পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা এখন ‘ভয় নিয়ে খেলছেন’। দলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে আকিবকে নিজের ভূমিকা নিয়ে আয়নায় তাকানোর পরামর্শও দিয়েছেন পাকিস্তান দলের সাবেক কোচ।
ইংল্যান্ড সফরে প্রথম দুই টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর সফরের মাঝপথেই পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) দলে বড় পরিবর্তন আনে। টেস্ট দলের প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও পেস বোলিং কোচ উমর গুলকে সরিয়ে দেয়া হয়। একইসাথে সাতজন খেলোয়াড়কেও দল থেকে বাদ দেয়া হয়।
হঠাৎ নেয়া এসব সিদ্ধান্তের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ সালমান আলী আগা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেয়া এই ব্যাটারকে পরের টেস্টেই দল থেকে বাদ দেয়া হয়। এরপর তৃতীয় টেস্টের আগেই তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
বিষয়টি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না গিলেস্পি। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য অস্ট্রেলিয়ানকে তিনি বলেন, ‘প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলকে নেতৃত্ব দেয়া সালমান আলী আগা কিভাবে দ্বিতীয় টেস্টেই দলের বাইরে চলে যায় ও তৃতীয় টেস্টের আগেই বিমানে দেশে ফিরে যায়? এটা কিভাবে সম্ভব?’
২০২৪ সালে প্রায় আট মাস পাকিস্তানের কোচ ছিলেন গিলেস্পি। তার অধীনেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল পাকিস্তান। সেই দলের বর্তমান অবস্থা দেখে নিজের হতাশার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
‘আমার খেলোয়াড়দের জন্য খারাপ লাগছে। এটাই তাদের পেশা। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে, তারা ভয় নিয়ে খেলছে,’ বলেন গিলেস্পি।
পাকিস্তানের দল নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও বড় সমস্যা দেখছেন তিনি। আকিব জাভেদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটির কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই বলেও অভিযোগ করেন গিলেস্পি।
তার ভাষায়, ‘আকিব জাভেদের অধীন তাদের যে দল নির্বাচনের কোনো কৌশল নেই, সেটা স্পষ্ট। তারা প্রতিদিন নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলায়—যেভাবে প্রতিদিন পোশাক বদলায়।’
এদিকে এর আগে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক দুরবস্থার জন্য গ্যারি কারস্টেন ও গিলেস্পিকেও দায়ী করেছিলেন আকিব জাভেদ। সেই বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে গিলেস্পি বলেন, ‘সম্প্রতি পাকিস্তানের যা কিছু হচ্ছে, তার জন্য আকিব জাভেদ গ্যারি কারস্টেন ও আমাকে দায়ী করেছেন। অথচ দুই বছর ধরে আকিবই নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান। আমরা তো সেখানে ছিলামই না। আমার মনে হয়, তার নিজের চেহারা আয়নায় দেখা উচিত।’
তবে গিলেস্পির ক্ষোভ শুধু দল নির্বাচন বা মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে নয়। খেলোয়াড়দের সাথে টিম ম্যানেজমেন্টের যোগাযোগের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বাদ পড়া খেলোয়াড়দের অনেকে নিজেদের বাদ পড়ার খবর পরিবার, বন্ধু কিংবা গণমাধ্যমের কাছ থেকে জেনেছেন—এমন দাবি করে গিলেস্পি।
তিনি বলেন, ‘আকিব জাভেদের সাথে খেলোয়াড়দের কোনো যোগাযোগ নেই। অথচ নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে খেলোয়াড়দের সাথে তারই যোগাযোগ রাখার কথা। যেসব খেলোয়াড়কে বাদ দেয়া হয়েছে, তারা পরিবার, বন্ধু এবং গণমাধ্যমের কাছ থেকে শুনেছে যে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। এটা কতটা অসম্মানজনক!’
পাকিস্তান ক্রিকেটের এই অস্থিরতায় গিলেস্পি একা নন। পিসিবির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি ও শোয়েব মালিকও। সাবেক কোচ মিকি আর্থার পরিস্থিতিকে বলেছেন ‘একেবারে হাস্যকর’।
এদিকে ইংল্যান্ড সফরের বাকি সময়ের জন্য পাকিস্তান দলের কোচিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নিউজিল্যান্ডের মাইক হেসন ও অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশলি নফকেকে। হেসন আগে থেকেই পাকিস্তানের সাদা বলের দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মাঠের পারফরম্যান্সও অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলছে না। হেডিংলিতে সিরিজের প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ১০৩ রানে হারের পর লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে ১৯৪ রানে হারে পাকিস্তান। সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হবে ৯ সেপ্টেম্বর, এজবাস্টনে।
এমন অবস্থায় গিলেস্পির বক্তব্য পাকিস্তান ক্রিকেটের চলমান সঙ্কটকে আরো একবার সামনে নিয়ে এসেছে—সমস্যা শুধু মাঠে নয়, দলের ভেতরের সিদ্ধান্ত নেয়া ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।



