অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট শেষ হয়েছে মাত্র দুই দিনেই। ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে দুই দল মিলে খেলেছে মাত্র ৭৫০ বল। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বলের হিসেবে এটি চতুর্থ সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যের টেস্ট। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি জিতেছে ইনিংস ও ৫১ রানে।
এদিকে ম্যাচের এমন পিচ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহল কিংবা গণমাধ্যমে তেমন সমালোচনা না থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশে তিন দিনের মধ্যে টেস্ট শেষ হলেই পিচ নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। এই দ্বিমুখী মানসিকতা নিয়েই নিজের কলামে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারতের কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্পোর্টস্টারে প্রকাশিত নিজের কলামে গাভাস্কার ম্যাকাইয়ের পিচকে ‘ট্র্যাম্পোলিন-বাউন্স’ পিচ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এমন ফলাফলের পরও পিচের সমালোচনা না করে নানা ধরনের অজুহাত সামনে আনা হয়। বিশেষ করে কিউরেটর বা টার্ফ এক্সিকিউটিভের ভুলকে দায়ী করা হয়।
এই প্রসঙ্গে গাভাস্কার বলেন, ‘ওহ, গ্রাউন্ডসম্যান দুঃখিত, টার্ফ এক্সিকিউটিভ ভুল করেছেন। তিনি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর ভরসা করেছিলেন, যেখানে গরম আবহাওয়া বলা হয়েছিল। তাই তিনি কিছুটা বেশি ঘাস রেখে দিয়েছিলেন ও সেটাই অতিরিক্ত বাউন্স তৈরি করেছে।’
পিচের সমালোচনা এড়াতে ব্যাটারদের টেকনিকের ঘাটতিকে দায়ী করার প্রবণতাকেও কাঠগড়ায় তুলেছেন গাভাস্কার। তার মতে, ব্যাটাররা বাউন্স সামলাতে পারেননি—এমন ব্যাখ্যা তখনই কিছুটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন স্বাগতিক দলের ব্যাটাররা একই পিচে ভালো ব্যাটিং করেন।
কিন্তু ম্যাকাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররাও যখন বড় জুটি গড়তে পারেননি, তখন শুধু ব্যাটারদের টেকনিককে দায়ী করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে গাভাস্কার বলেন, ‘এই শেষ অজুহাতটি হয়তো কিছুটা মেনে নেয়া যেত, যদি স্বাগতিক দলের ব্যাটাররা ভালো ব্যাট করত। কিন্তু যখন ঘরের ছেলেরাই একটি রান বা ভালো জুটি গড়তে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি পিচ সম্পর্কে আপনাদের কি বলে?’
ম্যাকাইয়ের পিচ নিয়ে অবশ্য গাভাস্কারের কাছে বিস্ময়ের কিছু নেই। প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হারের পর ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া কি ধরনের পিচ চাইবে, সেটি অনুমান করা কঠিন ছিল না বলে মনে করেন তিনি। তার দাবি, পিচ তৈরিতে টিম ম্যানেজমেন্টের কোনো ভূমিকা নেই—এমন দাবি করা হলেও বাস্তবে পর্দার আড়ালে ভিন্ন কিছুই ঘটে।
ভারতীয় এই কিংবদন্তির মতে, ‘ম্যাকাইয়ের পিচ কোনো চমক ছিল না। প্রথম টেস্টে বাংলাদেশীদের কাছে অস্ট্রেলিয়ানরা অপমানিত হওয়ার পর তারা এমন একটি পিচ তৈরি করবে, যা হবে দ্রুতগতির ও বাউন্সি, এটা জানা কথা। আর অবশ্যই তারা দাবি করবে যে গ্রাউন্ডসম্যান নিজে থেকেই এটি করেছেন ও টিম ম্যানেজমেন্টের তরফ থেকে শূন্য নির্দেশনা ছিল। তবে আমরা সবাই জানি পর্দার আড়ালে কি ঘটে।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেতে বাংলাদেশকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেটিও নিজের লেখায় তুলে ধরেছেন গাভাস্কার। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজ খেলতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৩ বছর।
২০০৩ সালের পর ২০২৬ সালে আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। এবারও অবশ্য সিরিজটি আয়োজন করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত টেস্ট ভেন্যুর বাইরে।
ভারতের ক্ষেত্রেও ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার ইতিহাস। ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম সফরের পর দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া সফর করতে ভারতকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৬৭-৬৮ সাল পর্যন্ত ২০ বছর। এরপর পরবর্তী সফরের জন্যও অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরে ১০ বছর।
বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলার সুযোগ পাওয়া প্রসঙ্গে গাভাস্কার বলেন, ‘২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া তাদের দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজের জন্য আমন্ত্রণ জানানো উপযুক্ত মনে করে, তাও আবার তাদের অনিয়মিত টেস্ট ভেন্যুতে।’
ম্যাকাই টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস মাত্র ৬৪ রানে শেষ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২১০ রান করে। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ করতে পারে ৯৫ রান। ফলে মাত্র ৭৫০ বলেই শেষ হয়ে যায় পুরো টেস্ট এবং ইনিংস ও ৫১ রানের জয় পায় অস্ট্রেলিয়া।
ডারউইনে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটে হারের পর ম্যাকাইয়ে এমন দাপুটে জয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া। তবে ফলাফলের পাশাপাশি দুই দিনের এই টেস্টের পর পিচের মান নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গাভাস্কারের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরো জোরালো করেছে।



