অবশেষে ইতিহাস। ছয়বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অহম চূর্ণ করলো টাইগাররা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অধরা সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। এমন একটা মুহূর্তের জন্য কতো অপেক্ষা, কতো প্রার্থনা!
প্রথম ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের উড়িয়ে সিরিজে শুভসূচনা করেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে জয়টা অবশ্য অতো সহজ হয়নি, তবুও জিতেছে ৫ উইকেটে। তাতে ১ ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত হয়েছে সিরিজ।
মিরপুরে বৃহস্পতিবার আগে ব্যাট করে ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান তুলে অজিরা। এরপর বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হলে টাইগারদের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪১ ওভারে ১৯২ রান। যা ৬ ওভার হাতে রেখেই পেরিয়ে গেল বাংলাদেশ।
হলুদ জার্সিধারীদের দর্প বরাবরই একটু বেশি। অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর সাথে বৈষম্য করে থাকে বরাবরই। যার উদাহরণ বাংলাদেশ, টাইগারদের সাথে গত ১৫ বছরে কোনো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেনি তারা।
অতঃপর এবার যখন খেলতে এলো, অজিরা হাড়ে হাড়েই যেন টের পেল বাস্তবতা। এই বাংলাদেশ আর আগের মতো নেই। বদলে গেছে, এগিয়ে গেছে বহুদূর! নিশ্চয়ই এরপর আর টাইগারদের উপেক্ষা করবে না তারা।
এই নিয়ে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডের পর এবার টাইগারদের শিকার অজিরা। নিঃসন্দেহে এটি দেশের ক্রিকেটের বড় ঘটনা।
এবার ম্যাচে ফেরা যাক। আগের দিনের বড় জয়ের উচ্ছ্বাস নিয়েই আজ মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। এতোটাই উদ্দীপ্ত ছিল টাইগাররা যে, মিরপুরে টসে জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে লজ্জায় পড়তে হয় সফরকারীদের।
বল হাতে অবিশ্বাস্য শুরু পায় বাংলাদেশ। কোনো রান যোগ করার আগেই ৩ উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ঘটনা আর ঘটেনি অজিদের সাথে। বিশ্ব ক্রিকেটে দেখা গেল মাত্র চতুর্থবার!
আগের ম্যাচে ইনিংসের প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে গিয়েছিলেন ম্যাথু শর্ট, বোলার ছিলেন তাসকিন আহমেদও। এবারো বোল্ড হয়েছেন শর্ট, কেবল একটুখানি বেড়েছে অপেক্ষা। চতুর্থ বলে আউট হন তিনি।
সেই রেশ কাটতে না কাটতেই জোড়া উপলক্ষ এনে দেন মোস্তাফিজ। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বল ফেরান কুপার কনোলিকে। ওভারের শেষ বলেও জাদু দেখান মোস্তাফিজ।
এবার তার শিকার ম্যাট রেনশ। ৫ বল খেলে তিনিও খুলতে পারেননি রানের খাতা। ৩ ওভার শেষে স্কোর ০/৩! অবিশ্বাস্যই বটে। এমন কিছু হয়তো সুদূর কল্পনাতেও আসেনি বাংলাদেশের সমর্থকদের।
এমনকি প্রথম রান পেতে অজিদের অপেক্ষা করতে হয় ২০ নাম্বার বল পর্যন্ত। তবুও তাসকিন নো বল করায় রান যোগ হয় তাদের স্কোরবোর্ডে। পরে ওই ওভারেই রানের খাতা খোলেন জশ ইংলিস।
অজিরা ৪র্থ উইকেট হারায় ২৫ রানে। মোস্তাফিজের তৃতীয় শিকার হয়ে ফেরেন অ্যালেক্স ক্যারি। শান্তকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ১৭ বলে ১৩ করে। তবে এরপর ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করে অজিরা।
জশ ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন মিলে জমিয়ে তুলছিলেন জুটিটা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, জুটি ভেঙে দেন তানভীর। ১৮তম ওভারে এসে ফেরান অজি অধিনায়ককে। ৩৮ বলে ৩৪ করে আউট হন ইংলিস।
ক্যামেরন গ্রিন ফেরেন দলীয় ৮১ রানে তানভীরেরই দ্বিতীয় শিকার হয়ে। এরপর জমে ওঠে বার্টলেট ও লাবুশেনের জুটি। দুজনেই তুলে নেন ফিফটি। জুটিতে যোগ হয় শতরান (১০৩)।
এই জুটি ভেঙে বাংলাদেশের শিবিরের স্বস্তি ফেরান তাসকিন। থিতু হয়ে যাওয়া বার্টলেটকে থামান তিনি। ওয়ানডেতে আগের ৫ ইনিংসে মাত্র ১২ রান করা বার্টলেট আউট হন ক্যারিয়ার সেরা ৪৮ বলে ৫২ রান নিয়ে।
পরের বলেই তাসকিন বোল্ড করে দেন অ্যাডাম জাম্পাকে (০)। ৪০.৩ ওভারে ১৮৪ রানে ৮ উইকেট হারায় অজিরা। তবে এরপর বৃষ্টি নামলে বন্ধ হয়ে যায় খেলা। তখন ৮৫ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত লাবুশেন।
দুই ঘণ্টা পরে বৃষ্টি থামলেও অস্ট্রেলিয়ার আর ব্যাটিংয়ে নামা হয়নি। বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশকে ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য দেয়া হয়। এদিকে বল হাতে তাসকিন ও মোস্তাফিজ তিনটি করে উইকেট নেন।
রান তাড়ায় বরাবরই ভালো করলেও আজ ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই উইকেট দিয়ে আসেন তানজিদ তামিম। বার্টলেটের বলে তাকেই ক্যাচ দেন ০ রানে। তবে এই ধাক্কা দ্রুতই সামলে উঠে বাংলাদেশ।
নাজমুল হোসেন শান্ত ও সৌম্য সরকার মিলে হাল ধরেন দলের। দুজনের জুটিতে যখন সহজ জয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে দল, তখই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ১২ রানের ভেতর ফেরেন দুজনেই।
১ উইকেটে ৮৬ থেকে ৯৮ রানে ৩ উইকেট হারায় টাইগাররা। দুজনেই ফেরেন ফিফটি হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ নিয়ে। সৌম্য ৪৭ বলে ৪২ ও শান্ত আউট হন ৫৩ বলে ৪১ রান নিয়ে।
এরপর লিটন দাসের ব্যাটে আশা দেখলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি তিনি। ১৮ বলে ২১ রান নিয়ে ফেরেন তিনি। এরপর তাওহীদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক হোসেন মিলে দলকে ১৪৪ পর্যন্ত নিয়ে যান।
তবে এরপরই বড় শট খেলতে গিয়ে ১৪ বলে ১৫ রান করে জাম্পার শিকার হন মোসাদ্দেক। ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। তবে চাপ বাড়তে দেননি হৃদয় ও মেহেদী মিরাজ।
৪৯ বলে ৫১ রানের জুটি গড়েন দুজনে। ছয় ওভার হাতে রেখেই ছক্কা মেরে মিরাজ নিশ্চিত করেন জয়। অধিনায়ক অপরাজিত থাকেন ২২ বলে ২২ রানে। হৃদয় মাঠ ছাড়েন ৫৫ বলে ৪০ রান নিয়ে।
বাংলাদেশ পায় ঐতিহাসিক জয়। যা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এনে দেয় প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ। রোববার সিরিজের শেষ ম্যাচে টাইগাররা মাঠে নামবে অজিদের হোয়াইট ওয়াশ করার মিশনে।



