আজকের আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে সত্য, কিন্তু হাজার বছর আগের প্রাচীন মানুষও এমন সব জটিল সমস্যার অবিশ্বাস্য সমাধান বের করেছিলেন— যা শুনলে চোখ কপালে উঠবে।
আমরা ভাবি, তখন মানুষের হাতে ছিল কেবল কিছু সাধারণ হাতিয়ার। কিন্তু ইরান সরকারের ছাত্র সংবাদ সংস্থা ‘ইসনা’ -এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভিন্ন গল্প। প্রাচীন যুগের এমন কিছু প্রযুক্তির সন্ধান মিলেছে যা আজকের যুগের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অথচ এর অনেকগুলোই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, আর কোনো কোনোটির রহস্য মানুষ আজ বুঝতে পারছে।
আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে কতটা উদ্ভাবনী মনের অধিকারী ছিলেন তার প্রমাণ মেলে আটটি প্রাচীন প্রযুক্তিতে।
জাহাজের ধ্বংসাবশেষে মিলল এনালগ কম্পিউটার :
গ্রিসের অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে এক প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া যায় দুই হাজার বছরের পুরোনো এক যন্ত্র। এটিকে পৃথিবীর প্রথম এনালগ কম্পিউটার বলা চলে। ব্রোঞ্জের তৈরি জটিল সব গিয়ার দিয়ে সাজানো এই যন্ত্রটি সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ, গ্রহের গতিবিধি এবং চাঁদের চক্র নিখুঁতভাবে হিসাব করতে পারত। এমনকি প্রাচীন অলিম্পিকের মতো খেলার সময়সূচিও ঠিক করত এই যন্ত্র। এর মেকানিক্যাল নকশা এতটাই উন্নত ছিল যে, এর পরবর্তী এক হাজার বছরেও মানুষ এমন কিছু বানাতে পারেনি।
রোমানদের তৈরি নিজে নিজে সেরে ওঠা কংক্রিট :
রোমানদের তৈরি বহু স্থাপত্য আজও প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এক বিশেষ ধরনের কংক্রিটে। গবেষকরা দেখছেন, এই মিশ্রণে এক ধরনের চুন ব্যবহার করা হত। সময়ের সাথে সাথে দেয়ালে কোনো ফাটল ধরলে তার ভেতর পানি ঢুকলেই এই চুন রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ফাটলটি নিজে নিজেই জোড়া লাগিয়ে দিত। আজকের বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি খাটিয়ে আরো টেকসই বাড়িঘর বানানোর উপায় খুঁজছেন।
মরুভূমিতে পানির মায়াজাল :
জর্ডানের দক্ষিণের এক রুক্ষ মরুভূমিকে দারুণ এক বাসযোগ্য শহরে পরিণত করেছিল প্রাচীন নাবাতীয় সভ্যতা। তাদের রাজধানী পেত্রায় তারা বানিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য পানির নেটওয়ার্ক। খাল, পাইপলাইন, জলাধার আর বাঁধের মাধ্যমে তারা বৃষ্টির পানি ধরে রাখত, আকস্মিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ করত এবং পাহাড়ি ঢাল বেয়ে পানি সরবরাহ করত। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, তারা পাইপের ভেতর উচ্চ চাপ তৈরি করে পানি বহনের পদ্ধতিও জানত। যা আগে কেবল রোমানদের আবিষ্কার বলেই ভাবা হত।
গ্রিক ফায়ার, পানির ওপর জ্বলন্ত আগুন :
মধ্যযুগের যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল ‘গ্রিক ফায়ার’। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের তৈরি এই ভয়ানক অগ্নি-অস্ত্রটি সাগরের পানির ওপরও অনায়াসে জ্বলতে পারত। নৌবাহিনীর যুদ্ধে এটি প্রতিপক্ষকে মুহূর্তে ছারখার করে দিত। শত বছরের গবেষণার পরও এর আসল সূত্র কেউ জানতে পারেনি। ধারণা করা হয়, এতে খনিজ তেলের নানা উপাদান ছিল। তবে এর গোপনীয়তা এত কঠোরভাবে রক্ষা করা হত যে, একসময় এটি পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।
ভাইকিংদের কুয়াশা কাটার জাদুকরী পাথর :
আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম বা দিকনির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের বহু আগে ভাইকিং নাবিকরা এক বিশেষ ধরনের ক্রিস্টাল ব্যবহার করত, যার নাম ছিল ‘সানস্টোন’ বা সূর্যপাথর। আইসল্যান্ড স্পারের মতো এই খনিজ পাথরগুলো মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশেও সূর্যের আলো ফিল্টার করে তার সঠিক অবস্থান জানিয়ে দিতে পারত। এই জাদুকরী পাথরের ওপর ভরসা করেই কম্পাস আবিষ্কারের বহু শতাব্দী আগে ভাইকিংরা উত্তর আটলান্টিকের বিশাল সমুদ্র অনায়াসে পাড়ি দিয়েছিল।
দক্ষিণ ভারতের উটজ স্টিল :
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে প্রাচীন ভারতে তৈরি হতো ‘উটজ স্টিল’ নামের এক বিশেষ ধাতু। এই লোহা যেমন ছিল শক্ত, তেমনই একে ইচ্ছেমতো বাঁকানো যেত, আর এর ধার থাকত দীর্ঘদিন। এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দেদারসে রফতানি হত এই ধাতু। এই ধাতু দিয়েই পরবর্তীতে তৈরি হয় ইতিহাসের কিংবদন্তি ‘দামেস্ক ব্লেড’ যা যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধা আর বণিকদের কাছে এক পরম বিস্ময় ছিল।
ভূমিকম্প মাপার প্রাচীন চিনা যন্ত্র :
১৩২ খ্রিস্টাব্দের দিকে চিনা বিজ্ঞানী ঝাং হেং পৃথিবীর প্রথম ভূকম্পন মাপার যন্ত্র বা সিসমোগ্রাফ তৈরি করেন। ব্রোঞ্জের তৈরি এই কলসাকৃতির যন্ত্রটির ভেতরে এক চমৎকার মেকানিজম ছিল। দূর দেশের কোথাও ভূমিকম্প হলে যন্ত্রটির গায়ে থাকা ড্রাগনের মুখ থেকে একটি বল স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচে থাকা ব্যাঙের মুখে গিয়ে পড়ত। এতেই বোঝা যেত কোন দিক থেকে ভূমিকম্প আসছে। আধুনিক সিসমোলজির জন্মের প্রায় ১৯০০ বছর আগে এটি ছিল এক অভাবনীয় চিন্তার ফসল।
দামেস্ক স্টিলের রহস্য :
দামেস্ক স্টিলের তরবারিগুলো তার চমৎকার ঢেউখেলানো নকশা আর ধারালো গুণের জন্য পৃথিবীখ্যাত ছিল। ইতিহাস বলে, এই তরবারিগুলো এতটাই নমনীয় ছিল যে বাঁকা করলেও ভাঙত না, আবার এর ধার কমত না কখনো। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, দক্ষিণ ভারতের উটজ স্টিলকে বিশেষ পদ্ধতিতে কার্বন মিশিয়ে কামারশালায় পিটিয়ে এই রূপ দেয়া হত। তবে এই তরবারি তৈরির অনেক গোপন কৌশল আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক অমীমাংসিত বিতর্ক।



