- আল হাসান মিলাদ
বাংলাদেশে প্রযুক্তির প্রসার যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনি কিছু নতুন সামাজিক সংকটও তৈরি করেছে। বর্তমানে টিকটক, মাদক এবং অনলাইন জুয়ার প্রতি মানুষের আসক্তি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, মধ্যবয়স্ক ও বয়স্কদের মধ্যেও এই আসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
টিকটক মূলত একটি বিনোদনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তৈরি হয়েছিল, যেখানে ব্যবহারকারীরা অল্প সময়ে ভিডিও তৈরি ও শেয়ার করতে পারেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এমন এক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে, যা মানুষের মনোযোগকে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখতে সক্ষম। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন পড়াশোনা বা গঠনমূলক কাজে সময় না দিয়ে টিকটকে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সময় ব্যয় করছে।
টিকটকের আসক্তির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর অ্যালগরিদম। একজন ব্যবহারকারী কোন ভিডিও কতক্ষণ দেখছেন, কোথায় লাইক দিচ্ছেন বা কোন ভিডিও বারবার দেখছেন—সবকিছু বিশ্লেষণ করে প্ল্যাটফর্মটি তার জন্য নির্দিষ্ট কনটেন্ট সাজিয়ে দেয়। ফলে ব্যবহারকারীর সামনে এমন কনটেন্ট বারবার আসে, যা তার আগ্রহের সঙ্গে মিলে যায় এবং তাকে আরও বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখে।
এছাড়া টিকটকের ‘ইনফিনিট স্ক্রলিং’ ব্যবস্থাও আসক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবহারকারী যতই স্ক্রল করবেন, নতুন ভিডিও আসতেই থাকবে। কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। এই পদ্ধতি অনেকটা ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের মতো কাজ করে, যেখানে মানুষ মনে করে পরের ভিডিওটি হয়তো আরও আকর্ষণীয় হবে। এই কৌতূহলই মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে আটকে রাখে।
বয়স্কদের ক্ষেত্রেও টিকটকের আসক্তির কারণ ভিন্ন নয়। একাকীত্ব দূর করা, সহজ ব্যবহার পদ্ধতি এবং পুরোনো দিনের স্মৃতিবিজড়িত কনটেন্ট তাদের আকৃষ্ট করে। ধর্মীয় আলোচনা, রান্নার ভিডিও, পুরোনো গান কিংবা ঘরোয়া নানা বিষয়বস্তু বয়স্কদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে।
মাদকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর। বিভিন্ন সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ কিংবা ওটিটি কনটেন্টে অনেক সময় ধূমপান ও মাদক গ্রহণকে আকর্ষণীয় বা আধুনিক জীবনধারার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে তরুণদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হয় যে মাদক গ্রহণ কোনো ধরনের স্মার্টনেস বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক।
তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ বন্ধুদের প্রভাব। একটি নির্দিষ্ট গ্রুপে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, বন্ধুদের চাপ এবং কৌতূহল থেকে অনেকেই প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তা নেশায় পরিণত হয়।
নারীদের মধ্যেও মাদকাসক্তির হার বাড়ছে, যা অনেক সময় সামাজিক লজ্জা বা ট্যাবুর কারণে প্রকাশ্যে আসে না। পারিবারিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং হতাশা অনেক তরুণীকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধুদের প্রভাবে কিংবা তথাকথিত আধুনিক জীবনধারার অনুসরণ করতে গিয়েও তারা মাদক গ্রহণ শুরু করে।
অন্যদিকে অনলাইন জুয়া বর্তমানে নতুন এক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তরুণদের একটি বড় অংশ রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের জুয়ার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার অ্যাপগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যে নতুন ব্যবহারকারীরা শুরুতেই কিছু অর্থ জিতে যায়। এই সাময়িক সাফল্য তাদের মধ্যে মিথ্যা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে। তারা মনে করে, আরও বেশি খেললে আরও বেশি লাভ করা সম্ভব। অথচ বাস্তবে এই সাময়িক জয়ই তাদের বড় ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয় সেলিব্রেটি বা ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার প্রচারণা তরুণদের বিভ্রান্ত করছে। যখন তারা দেখে পরিচিত মুখেরা এসব অ্যাপের প্রচার করছে, তখন অনেকেই জুয়াকে বৈধ, নিরাপদ বা লাভজনক মনে করে।
আমার মতে, টিকটক, মাদক ও জুয়ার আসক্তি কোনো একক ব্যক্তির দুর্বলতার ফল নয়। বরং এটি প্রযুক্তি, সামাজিক বাস্তবতা, মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত ফল। এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
লেখক : প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোক্তা ও সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট



