- সিলিকনের সীমা পেরিয়ে পেরোভস্কাইট
- একই ছাদে বেশি বিদ্যুৎ
সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তিতে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এতদিন সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রায় পুরো শিল্পই নির্ভর করেছে সিলিকনভিত্তিক ফটোভোলটাইক বা পিভি প্রযুক্তির ওপর। এখন সেই ব্যবস্থার ওপর নতুন একটি স্তর বসিয়ে একই জায়গা থেকে আরো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তিটির নাম পেরোভস্কাইট-সিলিকন ট্যান্ডেম সোলার সেল।
এটি সিলিকনকে রাতারাতি সরিয়ে দেয়ার প্রযুক্তি নয়; বরং বর্তমান সিলিকন সৌরকোষের ওপর পেরোভস্কাইটের একটি অতিরিক্ত আলোক-শোষক স্তর যুক্ত করে একই সূর্যালোকের আরো বড় অংশকে বিদ্যুতে রূপান্তর করার কৌশল। ফলে একই আয়তনের ছাদ, জমি বা ভবনের দেয়াল থেকে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎচাহিদা বাড়ছে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল ও আমদানিনির্ভর এবং বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ‘কম জমিতে বেশি বিদ্যুৎ’ বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশলের একটি অপরিহার্য লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল প্রায় এক হাজার ৪৪৯ মেগাওয়াট; যার প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থাৎ এক হাজার ১৫৫ মেগাওয়াটই ছিল সৌরনির্ভর। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌরশক্তির ওপর একটি মজবুত নির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো- পরবর্তী পর্যায়ে সেই সৌরব্যবস্থাকে আরো দক্ষ করা যাবে কি না।
পেরোভস্কাইট কী ও কেন এত আলোচনা?
পেরোভস্কাইট কোনো একটি নির্দিষ্ট ধাতু বা খনিজের নাম নয়; এটি একটি বিশেষ স্ফটিক কাঠামো, যার বিভিন্ন রাসায়নিক সংমিশ্রণ সৌরকোষে ব্যবহার করা যায়। প্রাকৃতিক পেরোভস্কাইট খনিজের নামকরণ করা হয়েছিল রুশ খনিজবিদ লেভ পেরোভস্কির নামে।
সৌরবিদ্যায় এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- এর আলোক শোষণ বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যায়। ফলে সিলিকন যে আলোক-বর্ণালির অংশ সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না, পেরোভস্কাইটকে ঠিক সেই অংশের উপযোগী করে ডিজাইন করা সম্ভব। এখান থেকেই আসে ট্যান্ডেম প্রযুক্তির ধারণা।
উপরের পেরোভস্কাইট স্তর সূর্যের অপেক্ষাকৃত উচ্চশক্তির আলো (বিশেষ করে নীল ও সবুজ অংশ) শোষণ করে, আর নিচের সিলিকন স্তর অপেক্ষাকৃত কম-শক্তির আলো ব্যবহার করে। ফলে একই সূর্যালোক থেকে দুই স্তর মিলিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়। সিলিকনের একক জংশন সেলের তাত্ত্বিক দক্ষতার সীমা প্রায় ৩০ শতাংশের নিচে হলেও পেরোভস্কাইট-সিলিকন ট্যান্ডেমের তাত্ত্বিক দক্ষতা ৪৩ শতাংশের বেশি হতে পারে। তবে তাত্ত্বিক দক্ষতা আর বাজারে প্রচলিত বাস্তব প্যানেলের কার্যকারিতা এক নয়।
‘দ্বিগুণ বিদ্যুৎ’ দাবির বাস্তব চিত্র
পেরোভস্কাইট নিয়ে প্রচারণায় অনেক সময় একই জায়গা থেকে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব বাণিজ্যিক প্রযুক্তিতে বিষয়টি এখনো এতটা সরল নয়।
অক্সপোর্ড পিভি জানিয়েছে, তাদের বর্তমান বাণিজ্যিক ট্যান্ডেম প্রযুক্তি প্রচলিত মডিউলের তুলনায় অন্তত ২০ শতাংশ বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পারে। তাদের বর্তমান মডিউল দক্ষতা প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে তা ২৭ শতাংশ ও ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির শিল্প-আকারের একটি ট্যান্ডেম মডিউল ১.৬৮ বর্গমিটার এলাকায় ৪২১ ওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
তাই এখনই পেরোভস্কাইট সৌরপ্যানেল দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে- এমন দাবি সঠিক নয়। বরং বলা যায়, এটি একই জায়গা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। ভুল প্রত্যাশার ওপর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মাথায় রাখা জরুরি।
সিলিকনকে বাদ নয়, বরং সংযোজন
পেরোভস্কাইটের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিপ্লব সিলিকনকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং সিলিকন ও পেরোভস্কাইটের সংমিশ্রণ। বিশ্ব ইতোমধ্যে সিলিকনভিত্তিক সৌরশিল্পে ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো, সরবরাহশৃঙ্খল এবং উৎপাদনক্ষমতা তৈরি করেছে। আইইএ-এর হিসাবে, চীন এখনো সৌর পিভি উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু; ২০২৪ সালে বৈশ্বিক মডিউল উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি এবং ওয়েফার উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশ চীনে কেন্দ্রীভূত ছিল।
তাই পেরোভস্কাইটের উত্থানকে শুধু নতুন একটি সৌরকোষের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভবিষ্যতের সৌরশক্তির বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণেরও প্রশ্ন। ২০২৫ সালে বিশ্বে সৌর পিভির নতুন সংযোজন ৬০০ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে এবং মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় দুই হাজার ৮০০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। নতুন প্রযুক্তির বাজার তৈরি হলে চীন সেটিকে বৃহৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দ্রুত সাশ্রয়ী করার ক্ষমতা রাখে।
পেরোভস্কাইটের মূল সুবিধা : কম তাপ ও পাতলা স্তর
সিলিকন উৎপাদনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চ তাপমাত্রা ও শক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া। পক্ষান্তরে, পেরোভস্কাইটের পাতলা স্তর তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় তৈরি ও আবরণ করা যায়। ভবিষ্যতে এটি কালি বা কোটিংয়ের মতো প্রক্রিয়ায় বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে উৎপাদন খরচ আরো কমবে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, এর নি¤œ-তাপমাত্রা প্রক্রিয়াজাতকরণ মূলধন ব্যয় ও উৎপাদন ধাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
ফলে ভবিষ্যতের সৌরপ্যানেল কেবল কাচের ওপর বসানো ভারী কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সম্ভাব্য ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হলো: ভবনের কাচ ও হাইরাইজ ভবনের দেয়াল; হালকা ওজনের ছাদ ও ড্রোনের কাঠামো; বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রচলিত যানবাহন; মোবাইল টাওয়ার ও প্রত্যন্ত এলাকার ক্ষুদ্র বিদ্যুৎব্যবস্থা; কৃষি, সেচ এবং মহাকাশ প্রযুক্তি।
বাংলাদেশের জন্য ৫ প্রধান সুযোগ
১. কম জমিতে বেশি বিদ্যুৎ : জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে বাংলাদেশে জমির সঙ্কট তীব্র। প্রচলিত প্যানেলের তুলনায় ট্যান্ডেম প্রযুক্তি ২০-৩০ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই বিদ্যমান অবকাঠামো থেকে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। একই সাথে ব্যালান্স-অব-সিস্টেম (বিওএস) খরচও কমে আসবে।
২. আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ: বাংলাদেশ প্রধানত চীন থেকে সৌরপ্যানেল আমদানি করে। পেরোভস্কাইটের ক্ষেত্রে যদি দেশেই গবেষণা, পাইলট উৎপাদন, কোটিং প্রযুক্তি, এনক্যাপসুলেশন ও রিসাইক্লিংয়ের পুরো চেইন গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদক হওয়ার সুযোগ পাবে।
৩. ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর: জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও নেট-মিটারিং নির্দেশিকার আওতায় শিল্পকারখানা, গুদাম, শপিংমল এবং হাসপাতালের বিশাল ছাদগুলো ট্যান্ডেম প্যানেলের মাধ্যমে কম জমিতে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আদর্শ ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
৪. শিল্পের বিদ্যুৎ খরচ হ্রাস : পোশাকশিল্পসহ রফতানিমুখী খাতগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ব্যয়ের মুখোমুখি। দিনের বেলায় উচ্চদক্ষতার ট্যান্ডেম প্যানেল এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করে কারখানাগুলো গ্রিডের ওপর চাপ ও উৎপাদন খরচ কমাতে পারে।
৫. জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি চাপ কমানো : দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুতের বিস্তার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাবে। ফলস্বরূপ, এলএনজি আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত হবে।
বিদ্যমান ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
স্থায়িত্ব ও জলবায়ু: আর্দ্রতা, তীব্র গরম, বর্ষাকাল, লবণাক্ত বাতাস ও ধুলবালির কারণে প্যানেলের ক্ষয় বা অবক্ষয় ঘটে। ইউরোপে পরীক্ষিত প্যানেল বাংলাদেশে ২৫ বছর টিকবে কি না, তা নিশ্চিত করতে দেশভিত্তিক ফিল্ড টেস্ট বাধ্যতামূলক করা দরকার।
সিসা-ঝুঁকি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: অনেক পেরোভস্কাইট ফর্মুলেশনে সিসা বা লিড ব্যবহৃত হয়। তাই পরিবেশ দূষণ এড়ানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর মানদণ্ড ও রিসাইক্লিং নীতিমালা প্রয়োজন।
আর্থিক ও ব্যাংকযোগ্যতা: দীর্ঘমেয়াদি ক্যাশ ফ্লো এবং ২৫ বছরের স্থায়িত্বের প্রমাণ না মিললে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলো বড় ঋণ বা ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করবে।
গ্রিড ব্যবস্থাপনা: আকস্মিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও স্টোরেজ ও ট্রান্সমিশন ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ‘সোলার কার্টেলমেন্ট’ বা উৎপাদন অপচয় বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের করণীয় : অপেক্ষা না করে বা অন্ধভাবে বিনিয়োগ না করে সরকারকে একটি সমন্বিত ‘ন্যাশনাল পেরোভস্কাইট পিভি রিসার্চ অ্যান্ড কমার্শিয়ালাইজেশন প্রোগ্রাম’ গ্রহণ করতে হবে। এর অধীনে যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে: বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে পেরোভস্কাইট নিয়ে গবেষণা এবং পাইলট উৎপাদন লাইন স্থাপন; ঢাকা, গাজীপুর ও উপকূলীয় অঞ্চলে ফিল্ড-টেস্টিং ও এক্সিলারেটেড এজিং টেস্ট সুবিধা তৈরি; জাতীয় মান নির্ধারণ, সার্টিফিকেশন এবং বিপজ্জনক উপাদান ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন; স্থানীয় মডিউল অ্যাসেম্বলি ও এনক্যাপসুলেশন শিল্পে কর-সুবিধা প্রদান এবং স্রেডা, বিদ্যুৎ বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের সমন্বয় নিশ্চিত করা।
উপসংহার : সৌরশক্তির দ্বিতীয় অধ্যায়
সিলিকন যুগের অবসান নয়, বরং তার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হচ্ছে সৌরশক্তির দ্বিতীয় অধ্যায়। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি আর শুধু প্রযুক্তি সফল হওয়ার নয়, বরং পেরোভস্কাইটের বাণিজ্যিক সফলতার যুগে বাংলাদেশ কেবল আমদানিকারক থাকবে, নাকি প্রযুক্তি অংশীদার ও উৎপাদক হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করবে- এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই।



