বিশেষ সংবাদদাতা
অতীতে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অভাব এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারেনি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে স্থবিরতা, সার্কের নিষ্ক্রিয়তা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি হওয়াকে তারা এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘মক্কা চুক্তি’ বা প্রতিরক্ষা সমঝোতার রূপরেখা বাংলাদেশের সামনে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেয়া উচিত কি না, তা নিয়ে দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে জোর আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের এতে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি বা ‘রেডলাইন’ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশী বিশ্লেষকদের মতামত
সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের মতে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়ার সুযোগ থাকলে বাংলাদেশের তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সীমান্তে কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নেই। ফলে অস্তিত্ব রক্ষা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার স্বার্থে এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে নতুন করে কৌশলগত সংযোগ তৈরিতে এ প্যাক্ট ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের একটি শক্ত অবস্থান তৈরির ওপর জোর দেন।
আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. এম শাহীদুজ্জামান মনে করেন, প্রথাগত কূটনৈতিক ভারসাম্যের চিন্তা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা দরকার। যৌথ সামরিক ও প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং ভূরাজনৈতিক চাপ থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্র তৈরি হবে।
একই অভিমত ব্যক্ত করে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির বলেন, দীর্ঘ দিনের অসতর্কতার কারণে দেশীয় সামরিক প্রস্তুতির ভারসাম্য বিঘিœত হয়েছে। মক্কা চুক্তির মতো প্রতিরক্ষা জোটের সাথে যুক্ত হলে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে, যা অনাকাক্সিক্ষত বাহ্যিক হুমকি নিরসনে সহায়ক হতে পারে।
তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, চুক্তির অনুচ্ছেদগুলোতে কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্যদের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের নীতি ও চিন্তা দেশবাসীর জানা দরকার।
ভারতীয় বিশ্লেষক ও গ্লোবাল মিডিয়ার পর্যবেক্ষণ
ইন্ডিয়া গ্লোবাল রিভিউ-এর উপস্থাপিকা ও বিশ্লেষক পালকি শর্মার মতে, বাংলাদেশ এ ধরনের প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে ভারতের পক্ষে ঢাকা-নয়াদিল্লি পূর্বের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় ধারা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থান এখন বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্বের (যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য) দিকে এগোচ্ছে, যা ভারতের একক প্রভাবের বাইরে এক নতুন দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, মনোজ দাস, সুশান্ত সারিন ও দেবাশিস দাসের মতো ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মক্কা চুক্তিতে ঢাকার অংশগ্রহণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) সুরক্ষায় শঙ্কা বাড়াবে। মনোজ দাসের মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অবস্থান এবং তুর্কি ও সৌদি সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান ভারতকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই সীমান্তেই কৌশলগত চাপে ফেলতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত তার সীমানাসংলগ্ন রাডার, ড্রোন ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তিকে কেন্দ্র করে একদিকে বাংলাদেশের জন্য যেমন নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত ও কৌশলগত সার্বভৌমত্ব জোরদারের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের প্রতিরক্ষা ভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন বা অস্বস্তি দেখা দিচ্ছে।



