উম্মেহানী বিনতে আব্দুর রহমান
আনন্দ আর বেদনা পুঞ্জীভূত থাকে হৃদয়ে; আর হৃদয়ের বড় একটা অংশ বরাদ্দ উম্মাহর জন্য। মুসলিম উম্মাহ এক দেহের মতো; একটি মজবুতি সম্পর্ক। উম্মাহ যখন বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত তখন জখম হয় আমাদের হৃদয়ের প্রতিটা কোণে। কারো লেখার শব্দে, কারো মজবুতি হুঙ্কারে, কারো স্থির পদযাত্রায় ময়দানে ছুটে চলা ঘোড়সওয়ারে যা কাফেরের মসনদ ভেঙে চুরমার করে, কারোর বা হৃদয় নিংড়ানো গানের কণ্ঠে- কলব আন্দোলিত হয়; নির্যাতিত মুসলিমদের রোনাজারির শব্দ বেদনার লেখা নিয়ে বসেছি, যদি এ লেখা একটি মাত্র হৃদয়কেও আন্দোলিত করে আর উম্মাহর জন্য দাঁড়িয়ে যায় এক ঝাপটে, তবেই সার্থক।
মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র (রহ:)... নু’মান ইবনু বাশির (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লøাল্লøাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মুমিনদের দৃষ্টান্ত তাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি, দয়ার্দ্রতা ও সহমর্মিতার দিক দিয়ে একটি মানবদেহের মতো। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন তার সমগ্র দেহতাপ ও অনিদ্রা ডেকে আনে। (সহিহ মুসলিম)।
পুরোদস্তুর রোদ্দুরে মরুর মুসাফির যেমন তীব্র পিপাসার্ত থাকে কিন্তু পিপাসা নিবারণের জন্য পানির খোঁজ মিলে না ঠিক তেমনি কল্পনায় দেখি নবিজীর শাসনকৃত সেই মদিনা। কল্পনাতে তৃপ্তির স্বাদ পাওয়া দায় তবুও সিরাত পড়ার ফাঁকে ক্ষতি কী যদি ভাবি আছি সেই স্বপ্নের শহর মদিনায়।
ক্লান্ত, অসার দেহে মরুগামী পথিকের মতো তপ্ত-মরুর প্রান্তরে খুঁজে ফিরি পিপাসা নিবারণের জন্য সুপেয় পানি।
স্বপ্নের দ্বিধাহীন রাজ্যে আমি, মরুর সুবাসে পথ চলি আর থেকে থেকে অবসন্ন চোখে রবের সাথে কথা বলি। হঠাৎ থমকে দাঁড়াই তপ্ত বালুকা রাজ্যে- চোখে ভাসে প্রস্তরময় তপ্ত মরুভূমিতে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত বেলাল রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মুখে শত অত্যাচার সয়ে আল্লাহ আহাদ, আল্লাহ আহাদ বলা শব্দটি আল্লাহর কাছে কত প্রিয় ছিল সে দৃশ্য; কল্পনাতেই অনুভব করলাম তৃষ্ণার্ত এ গাত্র যেন কম্পিত হলো পলকে, দৃপ্ত সেই সুমধুর সুরে আচ্ছন্ন হই।
সিরাতের প্রতিটা পৃষ্ঠা কত ব্যথাভরা স্মৃতি বহন করে; মরুর ধুলো, তপ্ত বালুকারাশি, পাহাড়ের বুক চিড়ে অতিক্রম করা পথ। চলতে চলতে মনে পড়ে ফের- দুর্বিষহ বিরামহীন ইয়াসির পরিবারের সেই আর্তনাদ, ভেসে আসে পুনঃব্যথাতুর সেই স্বর, এরপর রাসূল বললেন- হে ইয়াসির পরিবার! আর একটুখানি সবর করো, এরপর গন্তব্য হবে জান্নাত। আনন্দে ভরে যায় অন্তর, কী সুন্দর বর্ণনা হাদিসে।
তীব্র আবেশে ভাসে ক্ষতবিক্ষত সেই হাড় থেকে চামড়া খসে পড়ার দৃশ্য, কষ্ট-জড়ানো শোকগাথা; খাব্বাব ইবন আ’রাত রাদিয়াল্লাহু আনহুর সবরের সুবাসে আবেশিত ক্ষণে আঁখি হয় অশ্রুসিক্ত। নিদারুণ এই নির্যাতিত চিত্র স্পষ্ট বর্ণিত আছে- (হায়াতুস সাহাবা-১/২৯২, সিরাতু ইবন হিশাম, টীকা-১/৩৪৩)-এ।
এরপর হাঁটি, যতদূর যাই অন্তরকাঁপা সেই নিষ্পেষিত চিত্রের দেখা মিলে। আহ! সে চিত্র! কুরআনে শহীদদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন রব। আল্লাহ বলেন, আর আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা বুঝ না, (সূরা বাকারাহ : ১৫৪)।
ক্লান্ত অসার মস্তিষ্ক আমার যেন ঘোর কাটে না কিছুতেই; সিরাতে ডুবে ফের দেখি ওই বদরের ময়দানে ফেরেশতারা জমিনে নামে, যোগ দেয় মুমিনদের সাথে এক কাতারে, এরপর এগিয়ে চলছে সিরাত আপন গতিতে। অশ্রু দু’চোখে ঢের, উহুদ, খন্দক হয়ে শুভ্র দলে হাজার বাহিনী মক্কার পথ দ্বারে, মক্কা বিজয় সুরের মূর্ছনায় কলবে আনন্দ জাগে।
বেদনায় ভরপুর ঝাঁপসা আঁখি, তনুমনে অনুভব করি- ফাতহের সত্যবাণী।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ, হিজরির দশম বছরে তীব্র রোদ, লাখো জনস্রোতে আরাফাহর ভাষণ বিদায় হজ নামে খ্যাত। আল্লাহ সে দিন কুরআনকে পূর্ণ করেছেন, পূর্ণ করেছেন জীবন ধারণের সব বিধিনিষেধ। এরপর সুবাসিত গোলাপের সৌরভে সুবাসিত বিদায়ের সেই ভাষণ শেষ হলো সুস্পষ্টভাবে।
সিরাতে স্বীয় পাঠকের হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দেয় যে অধ্যায়, এখন তা পাঠ করার সময় এসেছে, একটি ভাঙা অন্তর নিয়ে পড়া শুরু করছি যা পড়তে গিয়ে হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে বারবার, আমাদের নবীজি আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন যেভাবে- আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দিন মদিনায় প্রবেশ করছিলেন, সে দিন সেখানকার প্রতিটি জিনিস আলোকোজ্জ্বল হয়ে পড়েছিল। এরপর যে দিন তিনি ইন্তেকাল করেন, সে দিন আবার তথাকার প্রতিটি প্রান্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আমরা তাঁর দাফনকাজ শেষ করে কবরের মাটি থেকে হাত ঝাড়া না দিতেই আমাদের অন্তরে পরিবর্তন অনুভব করলাম। (ইবনে মাজাহ-১৬৩১)
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, উম্মাহ বিপর্যস্ত অবস্থায়। হে আল্লাহ! ক্ষমা করুন আমাদের, মুসলিমদের একতা দিন, শক্তিশালী করে দিন- আমাদের পায়ের গোড়ালি যেন বিদ্বেষীদের ধ্বংস করার প্রথম হাতিয়ার হয়!



