পাঠ্যবইয়ের কারিকুলাম পরিবর্তন বা পরিমার্জন একটি চলমানপ্রক্রিয়া। কিন্তু ২০২৭ সালে পাঠ্যবইয়ে যেভাবে পরিমার্জন আনা হচ্ছে তাতে দেশের শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নতুন চারটি বইয়ের কন্টেন্ট নিয়ে শিশুরা কতটুকু সন্তুষ্ট থাকতে পারবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকে বলছেন নতুনভাবে চালু করা চতুর্থ শ্রেণীর আনন্দপাঠ বইটি হাতে পেয়ে শিশুরা যাতে আনন্দের পরিবর্তে কন্টেন্ট দেখে ভয় না পায় কিংবা আতঙ্কিত না হয় সে বিষয়েও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। একইসাথে প্রেস মালিকদের অনেকে বলছেন নতুন এই চারটি বই মুদ্রণের দায়িত্ব এমন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া উচিত যারা অতীতে কোনো খারাপ বই দেয়নি বা কালো তালিকাতেও ছিল না। প্রয়োজনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নিজস্বভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সবুজ তালিকার চার-পাঁচটি প্রেসকে আলাদা দায়িত্ব দিয়ে এই চারটি বইয়ের পুরো লট ভাগ করে দায়িত্ব দিক।
এ দিকে ২০২৭ শিাবর্ষকে সামনে রেখে এনসিটিবি দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিমার্জনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। ২০২২ সালের নতুন শিাক্রম বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপাতত ২০১২ সালের শিাক্রমের ভিত্তিতে পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হলেও, ২০২৭ সালের বইয়ে বিষয়বস্তু, ইতিহাস, দতাভিত্তিক শিা এবং নতুন কয়েকটি বিষয় সংযোজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে ২০২৮ সাল থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন বা পরিমার্জিত শিাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনসিটিবির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৭ সালের জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৭টি এবং প্রাথমিকের ৩৬টি মোট ১৩৩টি পাঠ্যবই বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিমার্জন করা হচ্ছে। এ কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিা প্রতিষ্ঠান, শিা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), শিক প্রশিণ প্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ শিকদের নিয়ে প্রায় ৩২০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। এনসিটিবি জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের যে বিতর্ক ও একপেশে উপস্থাপনার অভিযোগ ছিল, তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ সাম্প্রতিক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিহাসকে আরো তথ্যনির্ভর ও নিরপেভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। সূত্র মতে ২০২৭ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন কয়েকটি বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণীতে ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণীতে লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস ও দতাভিত্তিক শিার নতুন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিার বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটিবির হিসাব অনুযায়ী ২০২৭ শিাবর্ষে প্রায় ৩০ কোটি ৮৩ লাখ পাঠ্যবই মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের জন্য আট কোটি ২১ লাখের বেশি এবং মাধ্যমিক, মাদরাসা ও কারিগরি স্তরের জন্য বাকি বই ছাপানো হবে। অতীতের মতো বই বিতরণে বিলম্ব এড়াতে এবার আগেভাগেই মুদ্রণপ্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যদিও সরকার ২০২৭ সালকে পরিবর্তনের বছর হিসেবে দেখছে, তবে শিাবিদদের একাংশ মনে করছেন, শুধু বই সংশোধন করলেই কাক্সিত পরিবর্তন আসবে না। শিক প্রশিণ, মূল্যায়নপদ্ধতি, শ্রেণিক পরিচালনা এবং শিা প্রশাসনের সমতা একসাথে উন্নত না হলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে। একইসাথে একটি পূর্ণাঙ্গ শিাক্রম তৈরি ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে; তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ২০২২ সালের শিাক্রম চালুর পর মূল্যায়নপদ্ধতি, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু, ইতিহাস উপস্থাপন, ভাষাগত ভুল এবং শিকদের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে সরকার মাধ্যমিক পর্যায়ে সেই শিাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিাক্রম পুনর্বহাল করে এবং সংশোধিত বই প্রকাশ শুরু করে। এখন সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ধাপে ধাপে নতুন পরিমার্জনের পথে হাঁটছে এনসিটিবি।
এনসিটিবি বলছে, এবার কেবল পাঠ্যবই সম্পাদনা নয়; বিষয়বস্তু, ভাষা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং শিার্থীর দতা অর্জনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে শিা বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বই ছাপা ও বিতরণে বিলম্ব, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত শিক প্রশিণের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। একই সমস্যা থেকে গেলে ২০২৭ সালের পরিমার্জিত বইও প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, ২০২৭ সালের কারিকুলাম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন বাংলাদেশের শিাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ১৩৩টি বই সংশোধন, নতুন বিষয় সংযোজন, ইতিহাস পুনর্বিন্যাস এবং কোটি কোটি বই মুদ্রণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে হলে শুধু এনসিটিবির উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; শিা মন্ত্রণালয়, শিক প্রশিণ প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের শিকদের সমন্বিত প্রস্তুতি অপরিহার্য। তবে আশা করছি সবার সহযোগিতা নিয়ে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই নির্ভুলভাবে এবং সময়মতো শিক্ষার্র্থীদের হাতে তুলে দিতে পারব।



