সামাজিক সুরক্ষায় প্রশংসা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিতর্ক

সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা.

সুশাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারের প্রধান কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দেশে একটি সুশাসন উপহার দেয়া। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নে কাজ শুরু করলেও বেশ কিছু পরিকল্পনায় তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক খাতে নেয়া উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তখন ১০০ দিনের ‘স্বল্পমেয়াদি’ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। এতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অর্থনীতি পুনর্গঠন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থানের বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হয়। যদিও এগুলো নিয়ে পরবর্তীতে ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুশাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে সরকারের প্রধান কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দেশে একটি সুশাসন উপহার দেয়া। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নে কাজ শুরু করলেও বেশ কিছু পরিকল্পনায় তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক খাতে নেয়া উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: সাহাবুল হক বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান, সেটি একটি বাস্তব সত্য। বিএনপির ১০০ দিনের কর্মসূচি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর কিছু অংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তবে এই সময়ে পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়নের সুযোগ সেভাবে থাকে না।

সূত্র মতে, আইনশৃঙ্খলা ও গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সরকার গঠন করে বিএনপি। শুরু থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বাড়তি চাপ নিতে হয়েছে সরকারকে। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সামাল দেয়াও সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা ছিল। এ ছাড়া জুলাই সনদসহ নানা ইস্যু দেশের রাজনীতিতে এখন বেশ আলোচনায় রয়েছে। চেপে বসা জ্বালানি সঙ্কট এবং হাম পরিস্থিতিও সরকারকে বেশ ভুগিয়েছে। প্রথম থেকেই কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমালোচনার মুখেও পড়া এই সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেয়া কিছু পদক্ষেপে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র ১০০ দিনের বিবেচনায় পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়নের সুযোগ না থাকলেও শুরুটা কেমন হলো, এটাও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, এ সময়ে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য খাতভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। যেখানে কিছু ক্ষেত্রে সফলতার ইঙ্গিত মিললেও এখনো অধরাই রয়ে গেছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ খাত। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা এখনো তেমন কার্যকর হয়নি বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগসহ বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রায় ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পেরেছে সরকার। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, হামের ভয়াবহ প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের অন্যতম সফলতা। বিভিন্ন দুর্ঘটনা, অপরাধ এবং সামাজিক ট্র্যাজেডির শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, তাদের কথা শোনা এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেয়ার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের মানবিক চেহারাকে সামনে এনেছে বলে মনে করে সরকার।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দিয়েছে সরকার। তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনো তেমন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পাশাপাশি অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে উদ্বেগ এখনো কাটেনি বলেই মনে করেন তিনি।

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে চলমান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা এবং ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো এখনো সাধারণ মানুষের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম আগের থেকে কিছুটা বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্ত ম্যাকানিজম বা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থা নেই সেটি ফুটে উঠেছে, এটি প্রত্যাশিত ছিল না। রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও কাঠামোগত স্বচ্ছতা জরুরি, যা এখনো পূর্ণতা পায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, সরকার এক দিকে সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করছে, অন্য দিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। তবে জুলাই সনদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে শিগগিরই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সরকারকে আরো চাপে ফেলবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এই সরকারকে বেশ ভোগাচ্ছে হাম ইস্যু। ইতোমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে তৈরি হওয়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার কথা জানিয়েছে সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো: মিজানুর রহমান বলেন, এই সময়ের কর্মকাণ্ডে অনেকের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তুলনামূলক সংযম ও সরলতা অনেকের নজর কেড়েছে। তবে সন্ত্রাস, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা ছিল লক্ষণীয়।

ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ মো: কামরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, শুরু থেকেই কিছু ইতিবাচক প্রবণতা ও উদ্যোগ জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগ কাটাতে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সরকারের কর্মকাণ্ডের অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের ১০০ দিন জাতির সামনে আশাবাদ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে। সরকারের নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগ ইতোমধ্যে জনজীবন ও সমাজে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে ১০০ দিনের পরিকল্পনায় ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে ৩৭টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকিগুলোও অনেকাংশে বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পসহ দেশজুড়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছিল উল্লেখযোগ্য সফলতার অংশ। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার বিভাগেও বেশ উন্নতি ঘটেছে। তবে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় সরকারের সবক্ষেত্রেই গতিশীলতার বড় প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।