- স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় রমরমা ব্যবসা
- অস্ত্র গোলাবারুদ ঢুকছে নদী ও দুর্গম পাহাড়ি পথে
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং ভারতের উন্মুক্ত সীমান্তকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে ভয়াবহ মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার সিন্ডিকেট। টেকনাফের নাফ নদ থেকে শুরু করে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত এখন আর কেবল ইয়াবা, আইস বা স্বর্ণ চোরাচালানের রুট নয়- আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সহায়তায় এই পথগুলো দিয়ে দেশে ঢুকছে স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র। আর এই পুরো নেটওয়ার্কের অর্থায়ন ও লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ক্রিপ্টো-কারেন্সি ও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে। স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় এই চোরাচালান নেটওয়ার্ক এখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের গোপন প্রতিবেদন ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপে গিয়ে কয়েকজন মাঝির সাথে কথা হলে তারা জানান, মিয়ানমারের সশস্ত্র আরাকান আর্মির সদস্যরা জেলেদের ধরে নিয়ে পাঁচ থেকে সাত মাস আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য বন্দী রাখার ঘটনার বেশির ভাগই আসলে নাটক। আরাকানদের সাথে অনেক মাঝির বাণিজ্যিকভাবে সম্পর্ক রয়েছে। যেসব মাঝি অপহরণের শিকার হন তারা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সাথেই কাজ করেন। মাদক আনানেয়া থেকে শুরু করে অর্থ আদান-প্রদান করা হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এরপর সেই টাকা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্রিপ্টো-কারেন্সি ও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে চলে যায় গন্তব্যে। এর সাথে জড়িত টেকনাফ ও কক্সবাজারের কয়েকজন মাফিয়া।
সম্প্রতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা ‘বাইশফারি’ এবং বালুখালী কাস্টমস ঘাট এলাকায় বিজিবি (১১ বিজিবি ও ৩৪ বিজিবি) এই রুটে বিশেষ অভিযান চালিয়ে একে-৪৭ রাইফেল, যুগোস্লাভিয়ার তৈরি ৯ এমএম টিটি পিস্তল, বিপুল রাউন্ড গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জামসহ আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য ও স্থানীয় পাচারকারীদের হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে।
নাফ নদ ও নাইক্ষ্যংছড়ি, অপরাধের মূল প্রবেশদ্বার : গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির চলমান সঙ্ঘাতের সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক চোরাচালানিরা। নাফ নদের অববাহিকা এবং নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু ও ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে রাতারাতি বদলে যাচ্ছে চোরাচালানের ধরন। আগে যেখানে কেবল মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসত, এখন সেখানে আসছে ‘ক্রিস্টাল মেথ’ বা আইস এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র।
বিজিবির গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে গত এক বছরে বিপুল পরিমাণ বিদেশী পিস্তল, সাব-মেশিনগান এবং গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এই অস্ত্রগুলো মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে চোরাকারবারিরা সংগ্রহ করছে। এগুলো দেশের ভেতরে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও পাহাড়ি সশস্ত্র দলগুলোর কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
ধরাছোঁয়ার বাইরে আর্থিক লেনদেন : প্রথাগত হুন্ডি ব্যবসাকে পেছনে ফেলে এই অপরাধচক্র এখন শতভাগ ডিজিটাল পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান অপরাধীরা সাধারণ মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করছে না। তারা লেনদেনের জন্য ‘ডার্ক ওয়েব’ এবং বিটকয়েন, ইউএসডিটির মতো ক্রিপ্টো-কারেন্সি ব্যবহার করছে। মিয়ানমার ও ভারতের ডিলারদের সাথে ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে অর্থপ্রবাহের উৎস ট্র্যাক করা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ল্যাব ও আইটি উইংয়ের তথ্যমতে, টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক বেশ কিছু অপরাধী চক্র এই ক্রিপ্টো লেনদেনের সাথে সরাসরি যুক্ত। স্থানীয় কিছু আইটি-দক্ষ যুবককে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নেপথ্য সম্পৃক্ততা : সম্প্রতি অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্ত অঞ্চলের এই বিশাল ডার্ক-নেটওয়ার্ক সচল রাখার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য নায়ক।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সীমান্ত এলাকায় যেকোনো বড় চালানের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এই জনপ্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট হারে ‘টোল’ বা কমিশন দিতে হয়। নাইক্ষ্যংছড়ির এক স্থানীয় বাসিন্দা (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম গোপন রাখা হলো) জানান, সীমান্তে বিজিবি পাহারা দিলেও মেম্বার-চেয়ারম্যানদের নিজস্ব লোকজন লাইনম্যান হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ি ঢাল বা নদীপথ কখন ফাঁকা থাকবে, সেই খবর চোরাকারবারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। কোনো চালানের লোক ধরা পড়লে এই নেতারাই তদবির করে তাদের ছাড়িয়ে নেন।
মানবপাচার ও বন্দিশালা, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দী : সমান্তরাল অর্থনীতির আরেকটি কালো অধ্যায় হলো মানবপাচার। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও ভারতের সীমান্ত দিয়ে অবৈধ উপায়ে মানবপাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা এবং দেশের ভেতরের বেকার যুবকদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ডার্ক-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের এক ভুক্তভোগী যুবক সম্প্রতি মানবপাচারকারীদের কবল থেকে ফিরে এসে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, আমাকে ভালো চাকরির কথা বলে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে গহিন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাদের আটকে রেখে নির্যাতন করে। তারা আমার পরিবারের কাছে ডার্ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রিপ্টো-কারেন্সিতে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। টাকা দিতে না পারায় চোখের সামনে দু’জনকে মেরে ফেলা হয়েছে।
বিজিবির বক্তব্য : বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দফতরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা সীমান্তে নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়েছি। তবে অপরাধীরা এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আমরাও আমাদের টেকনিক্যাল নজরদারি ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী যারাই এর সাথে জড়িত থাকুক না কেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত চোরাচালানের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানির পর সেই অর্থ ক্রিপ্টো-কারেন্সির মাধ্যমে যাওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম উদ্বেগজনক। এটি কেবল চোরাচালান নয়, এটি একটি হাইব্রিড থ্রেট। ক্রিপ্টো-কারেন্সির মাধ্যমে অস্ত্র কেনাবেচা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দেয়। মিয়ানমারের বর্তমান অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী বাংলাদেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এই ডার্ক-নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে প্রথাগত সীমান্ত পাহারার পাশাপাশি ‘সাইবার ইন্টেলিজেন্স’ বা সাইবার গোয়েন্দা ইউনিটকে সীমান্তে সক্রিয় করতে হবে।



