৮০৯ পৃষ্ঠার রায়ে ২ পুলিশের ফাঁসি ও পলাতক আসামিদের ভূমিকা নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় বর্বরতা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মামলার ৩০ আসামির সাজার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় প্রকাশ করেন। রায়ে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ, সেদিনের নৃশংসতার আইনি বিশ্লেষণ এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণের বিশদ যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই মামলার সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া সাজাপ্রাপ্ত অন্য এক আসামির হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ বলে গণ্য করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিশদ পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হয়ে সাবেক ভিসি এবং প্রক্টরিয়াল বডি যেভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো পুলিশ ও ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাসে ডেকে এনে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমনপীড়ন চালিয়েছেন, তা সভ্য সমাজে নজিরবিহীন। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের চরম বহিঃপ্রকাশ। রায়ের যুক্তিকাঠামো অনুযায়ী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে কোনো উসকানি ছাড়াই অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার দায়ে পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, যারা উভয়ই বর্তমানে কারাবন্দী। অন্য দিকে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সরাসরি গুলির নির্দেশ দেয়ার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম এবং সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং এই তিনজনই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
হামলার পরিকল্পনা, উসকানি ও পুলিশকে সরাসরি সহযোগিতাকারী হিসেবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে বেরোবির সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশীদ, আরপিএমপির সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান বেল্টু, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং বেরোবি ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণে প্ররোচনা দেয়ার দায়ে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছেন সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান, ছাত্রলীগের এমরান চৌধুরী আকাশ, অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান বাবু এবং স্বাচিপ সভাপতি ডা: সারোয়ার হোসেন চন্দন। এই ১০ বছর ও ৫ বছর মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বেশির ভাগই বর্তমানে পলাতক কিংবা জামিনে রয়েছেন।
এ ছাড়া হামলায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও বহিরাগতদের সহায়তার অপরাধে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন এবং সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়াকে। অন্য দিকে, প্রক্টর অফিসের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী মো: আনোয়ার পারভেজকে (আপেল) দোষী সাব্যস্ত করা হলেও তার হাজতবাসের সময়কে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করে অন্য কোনো মামলায় প্রয়োজন না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নৃশংসভাবে নিহত হন আবু সাঈদ। প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, কোনো প্রকার অস্ত্র বা সহিংস আচরণ ছাড়াই কেবল একটি লাঠি হাতে দুই হাত প্রসারিত করে বীরদর্পে পুলিশের বন্দুকের সামনে একাকী দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পুলিশ কোনো রকম সতর্কবার্তা না দিয়েই অত্যন্ত কাছ থেকে তার বুক লক্ষ করে একের পর এক ছররা গুলি ছুঁড়তে থাকে। তার এই বুক পেতে দেয়ার দৃশ্যটি পরবর্তীতে দেশজুড়ে দাবানলের মতো ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে স্ফুলিঙ্গে রূপান্তরিত করে। আবু সাঈদের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা একপর্যায়ে স্বৈরাচারবিরোধী একদফা দাবিতে রূপ নেয়। তৎকালীন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি, সেনা মোতায়েন এবং ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করলেও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ থামানো সম্ভব হয়নি। ঘটনার মাত্র ২০ দিনের মাথায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। ট্রাইব্যুনাল এই রায়কে সেই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।



