সরকারের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে চার লাখ ৭৬ হাজার ২৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ফলে এক অর্থবছরেই সরকারের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ১১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সরকারি রাজস্ব প্রাপ্তিসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল চার লাখ ২২ হাজার ৬৩৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আদায় বেড়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকে এ প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়।
শেষ প্রান্তিকে আদায় বাড়লেও প্রশ্ন রয়ে গেছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক এপ্রিল-জুনে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৩৮৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিক জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এটি ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ তিন মাসে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেছে।
তবে এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে এনবিআর কর এবং অ-কর রাজস্ব থেকে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়কৃত কর থেকে। অ-এনবিআর করের অবদান মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অ-কর রাজস্বের অংশ ১২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এতে স্পষ্ট হয়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনো এনবিআর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। রাজস্বের বিকল্প উৎসগুলো এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে এনবিআরের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
এনবিআর ৮২ শতাংশের কিছু বেশি লক্ষ্য পূরণ করেছে
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে বছর শেষে আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এনবিআর তার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮২ দশমিক ছয় শতাংশ আদায় করতে পেরেছে।
একই সময়ে এনবিআর কর রাজস্ব আগের অর্থবছরের তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এনবিআরের এ আদায় বৃদ্ধির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত বিষয় রয়েছে-রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অংশ এখনো পরোক্ষ করনির্ভর।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এনবিআর এক লাখ ২৭ হাজার ৬১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা কর আদায় করেছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
কিন্তু এ রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৪৭ হাজার ১১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিপরীতে পরোক্ষ কর আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ৪৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এনবিআরের শেষ প্রান্তিকের কর আদায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে পরোক্ষ কর থেকে।
আয়কর বাড়লেও পরোক্ষ করের ওপর চাপ
এপ্রিল-জুনে প্রত্যক্ষ কর আদায় আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। প্রত্যক্ষ করের প্রধান উৎস আয়কর। এ সময়ে আয়কর আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৪৯৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
অন্য দিকে পরোক্ষ কর আদায় হয়েছে ৮০ হাজার ৪৯া১ কোটি ৬০ লাখ টা কা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকেই এসেছে ৪৮ হাজার ১৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় ভ্যাট আদায় বেড়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে ভ্যাট আদায়ের গতি আয়করের চেয়েও শক্তিশালী ছিল। কিন্তু অর্থনীতিতে কর কাঠামোর ভারসাম্য বিবেচনায় এটি একই সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তৈরি করে-রাজস্ব বাড়ানোর জন্য সরকার কতটা প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে পারছে এবং কতটা ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর পরোক্ষ করের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে।
আমদানি শুল্কে প্রবৃদ্ধি নেই, ভ্যাটে বড় উল্লম্ফন
এপ্রিল-জুনে আমদানি শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৬১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ২৪ দশমিক ১ শতাংশ বাড়লেও আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
এর বিপরীতে আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। দেশীয় ভ্যাট আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১৬৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দেখা যায়। আমদানি শুল্ক থেকে রাজস্ব কমলেও আমদানি পর্যায়ের ভ্যাট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ আমদানি-সম্পর্কিত কর আদায়ের ভেতরেও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে।
সবচেয়ে দুর্বল জায়গা অ-এনবিআর কর
সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হয়ে আছে অ-এনবিআর কর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি আদায় হয়েছে।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অবশ্য অ-এনবিআর কর আদায় আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি হয়েছে। এই খাতের প্রধান উৎস স্ট্যাম্প ডিউটি। শেষ প্রান্তিকে অ-এনবিআর করের ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ বা এক হাজার ৪৫৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা এসেছে স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে। পণ্য ব্যবহারের ওপর কর থেকে এসেছে ৫০২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ সরকারের মোট রাজস্ব ব্যবস্থায় অ-এনবিআর করের ভূমিকা এখনো অত্যন্ত সীমিত।
অ-কর রাজস্বে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন
তবে প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো অ-কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অ-কর রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৭৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি বেড়েছে ১৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১৯৪ দশমিক ২ শতাংশ। এ উল্লম্ফনের মূল চালিকাশক্তি লভ্যাংশ।
শেষ প্রান্তিকে লভ্যাংশ থেকে সরকারের আয় হয়েছে ১০ হাজার ৩৬০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আগের প্রান্তিকে এ খাত থেকে আয় ছিল মাত্র ২১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক প্রান্তিকেই লভ্যাংশ আয় বেড়েছে প্রায় ৪৭ গুণ। আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে এক হাজার ২৬৪ দশমিক তিন শতাংশ।
ফলে প্রশ্ন উঠছে- এটি কি রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নতির প্রতিফলন, নাকি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের এককালীন বা অস্বাভাবিক আদায়ের ফল?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন লভ্যাংশের এ বড় উল্লম্ফনের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে এ জায়গায় অতিরিক্ত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে রাজস্ব বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অ-কর রাজস্বের এক প্রান্তিকের এ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মোট রাজস্ব প্রবৃদ্ধির চিত্রকেও প্রভাবিত করেছে।
অ-কর আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে?
২০২৫-২৬ অর্থবছরে অ-কর রাজস্বের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা-লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই খাত থেকে আদায় হয়েছিল ৪৫ হাজার ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
কিন্তু বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মোটামুটি সন্তোষজনক অবস্থানের পেছনে শেষ প্রান্তিকের অস্বাভাবিক লভ্যাংশ আদায়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। শেষ প্রান্তিকে অ-কর রাজস্বের ৫৫ দশমিক ২ শতাংশই এসেছে লভ্যাংশ থেকে। সুদ থেকে ১১ শতাংশ, প্রশাসনিক ফি থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং অ-আর্থিক সম্পদ বিক্রি থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে।
এ ধরনের কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব স্থিতিশীলতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিয়মিত করভিত্তি সম্প্রসারণের পরিবর্তে সম্পদ, লভ্যাংশ বা অন্যান্য অ-কর উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়লে রাজস্ব প্রবাহের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
রাজস্ব সংস্কারে একাধিক উদ্যোগ, ফল কতটা?
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি এনবিআর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব কৌশল গ্রহণ করেছে। কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণে কর ব্যয় নীতি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো গ্রহণ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী যাচাইয়ে নথি যাচাইকরণ ব্যবস্থা, কর কর্তনের হিসাব অনুসরণে ই-টিডিএস, এবং ভ্যাট আদায়ে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস-বিক্রয় ডেটা কন্ট্রোলার চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো, আয়কর রিটার্ন দাখিল সহজ করা এবং ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর পরিশোধ সহজ করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এনবিআরের কার্যক্রম অটোমেশনের জন্য পরবর্তী অর্থবছরে ১৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে।
তবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৯ শতাংশ ঘাটতি দেখিয়ে দেয়, সংস্কার উদ্যোগগুলোর বাস্তব ফল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পেঁৗঁছেনি।
মূল সঙ্কট কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায় অন্তত চারটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট হয় :
প্রথমত, লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে বড় ব্যবধান। পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় চার লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা।
দ্বিতীয়ত, এনবিআর নির্ভরতা। মোট রাজস্বের সিংহভাগই এনবিআরের মাধ্যমে আসে। বিকল্প রাজস্ব উৎসগুলোর সক্ষমতা এখনো সীমিত।
তৃতীয়ত, অ-এনবিআর করের দুর্বলতা। ২০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ছয় হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।
চতুর্থত, শেষ প্রান্তিকের অ-কর রাজস্বে অস্বাভাবিক নির্ভরতা। বিশেষ করে লভ্যাংশ থেকে ১০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা আদায় পুরো অ-কর রাজস্বের কাঠামোকে এক প্রান্তিকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে।
রাজস্ব বাড়ল, কিন্তু রাজস্ব কাঠামো কি শক্তিশালী হলো?
সরকারের জন্য শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো কিভাবে সে রাজস্ব আসছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রাজস্ব টাকার চলতি মূল্যে ১২ দশমিক সাত শতাংশ বেড়েছে। শেষ প্রান্তিকে মোট আদায়ও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি; কিন্তু একই সময়ে রাজস্ব ব্যবস্থার বড় অংশ এসেছে এনবিআর কর থেকে এবং এনবিআর করের মধ্যেও পরোক্ষ করের অংশ প্রত্যক্ষ করের চেয়ে অনেক বেশি।
অন্য দিকে অ-কর রাজস্বের শেষ প্রান্তিকের প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে লভ্যাংশ। ফলে সামগ্রিক রাজস্ব বৃদ্ধিকে কাঠামোগত সক্ষমতার স্থায়ী উন্নতি হিসেবে দেখার আগে এর উৎস ও স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বিশেষ করে আগামী অর্থবছরগুলোতে সরকারি ব্যয়, ঋণের সুদ পরিশোধ, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং উন্নয়ন ব্যয় বাড়তে থাকলে রাজস্ব ঘাটতি আরো বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
সামনে ৩টি বড় চ্যালেঞ্জ
রাজস্ব ব্যবস্থার সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক. করজাল সম্প্রসারণ-একই করদাতা ও একই ভোক্তা শ্রেণীর ওপর নির্ভর না করে নতুন করদাতা শনাক্ত করা। দুই. প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো-পরোক্ষ কর নির্ভরতা কমিয়ে আয়, সম্পদ ও মুনাফাভিত্তিক কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো। তিন. কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার বাস্তবায়ন-ডিভিএস, ই-টিডিএস, ইএফডি এবং অটোমেশনকে কেবল প্রকল্প হিসেবে না রেখে বাস্তব কর ফাঁকি শনাক্তকরণ ও আদায়ে ব্যবহার করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রাজস্ব আদায়ে গতি এসেছে ঠিকই; কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঘাটতি এবং কর কাঠামোর ভারসাম্যহীনতা এখনো বড় সমস্যা। বিশেষ করে অ-এনবিআর করের দুর্বলতা এবং শেষ প্রান্তিকে লভ্যাংশ নির্ভর অ-কর রাজস্বের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখিয়ে দেয়-রাজস্বের পরিমাণ বাড়লেও রাজস্ব ব্যবস্থার ভিত এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি।
সরকারের জন্য তাই আগামী দিনের মূল প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা রাজস্ব আদায় হলো নয়; বরং কতটা স্থায়ী, কতটা ন্যায্য এবং কতটা বিস্তৃত করভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সে রাজস্ব আদায় হচ্ছে-সেটিই হবে রাজস্ব সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা।



