বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় প্রায় অসম্ভব

পিপিআরসির বাজেট নিয়ে আলোচনা

২০১৫ সালের পর থেকে এনবিআরকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না যে, ‘তুমি কত পারবে?’ বরং ওপর থেকে একটি ব্যয়ের বাজেট তৈরি করে এনবিআরের ওপর লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেয়া হয়। আগে নিয়ম ছিল, এনবিআরই খতিয়ান দিয়ে বলবে তারা কোন খাতে কত আদায় করতে পারবে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জনের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেছেন, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তারা আরো বলেছেন, বাজেটের উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণে প্রয়োজন বাস্তবায়নের দৃঢতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।

গতকাল শনিবার বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ভার্চুয়াল পোস্ট-বাজেট আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনে এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর মজিদ বলেন, ব্যয়ের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করায় আইএমএফের পরামর্শ ও সনাতনী নিয়ম মেনে সামগ্রিক ঘাটতি সাড়ে ৩ শতাংশ ধরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটি একটি সাধারণ অঙ্ক (সিম্পল ম্যাথ)। কিন্তু এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা কতটা যথার্থ, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর। তিনি উল্লেখ করেন, ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার মোট রাজস্বপ্রাপ্তির মধ্যে এনবিআরের করগুলোই হচ্ছে ছয় লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা এনবিআর-বহির্ভূত কর ও প্রাপ্তি। এনবিআরের ওপর চাপ কমাতে বিআরটিএ, পেট্রোবাংলা, রেলওয়ে কিংবা বিমানের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জোর দেয়া যেত। কারণ এসব খাতে সরকারের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। আমাদের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। কিন্তু এসব খাত থেকে রিটার্ন আসছে না, এমনকি এসএলএ বাবদ পাওনা টাকাও তারা দিচ্ছে না। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা না বাড়ালে মনে হবে তাদের ‘ওয়াকওভার’ দেয়া হচ্ছে।

বাজেট বাস্তবায়নে ‘অর্থ বিধি’ একটি বড় সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে সাবেক এই এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অর্থ বিধিটাই আসলে মূল পলিসি। অথচ এটি তৈরির সময় স্টেকহোল্ডার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে করা হয়। বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে কোন কোন খাতে কিভাবে রাজস্ব বাড়ানো হবে, তা বলা থাকলে সবার একটি মানসিক প্রস্তুতি থাকত।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এনবিআরকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না যে, ‘তুমি কত পারবে?’ বরং ওপর থেকে একটি ব্যয়ের বাজেট তৈরি করে এনবিআরের ওপর লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেয়া হয়। আগে নিয়ম ছিল, এনবিআরই খতিয়ান দিয়ে বলবে তারা কোন খাতে কত আদায় করতে পারবে।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম, বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো: ফজলুল হক এবং এনজিও সংগঠক ফারাহ কবির।

মো: ফজলুল হক বলেন, ‘বাজেটের অনেক প্রক্ষেপণ দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। বাজেটে যেন ধরে নেয়া হয়েছে যে অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধার হবে; কিন্তু পুনরুদ্ধারের জন্য সময় প্রয়োজন। প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন নির্ভর করবে এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর, যেখানে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে আস্থা রাখতে পারেন।’

কৃষি, গ্রামীণ জীবিকা এবং প্রান্তিক কৃষকদের সম্মুখীন চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল প্রশ্ন রাখেন, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। তিনি উল্লেখ করেন, কৃষকদের লক্ষ্য করে নেয়া পূর্ববর্তী উদ্যোগগুলো প্রায়ই উপকারভোগী চিহ্নিতকরণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে। কৃষি খাতে অব্যাহত মনোযোগের কথা স্বীকার করেও তিনি বলেন, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এই খাতের রূপান্তরের জন্য বাজেটে একটি বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, কৃষির জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। কৃষকদের সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি আমাদের আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং স্মার্ট কৃষির দিকে রূপান্তরের ওপরও মনোযোগ দিতে হবে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দেশে দীর্ঘ দিন ধরে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, এর প্রভাব মানুষের জীবনে পড়ছে। এ বাস্তবতায় তরুণদের একাধিক কাজ করতে হচ্ছে। এমনকি অনেক তরুণ তিনটি কাজও করছেন। খরচ সামলাতে গিয়ে এক বেলা কম খাচ্ছেন।

আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান নীতিগত অঙ্গীকারকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আমাদের সব উচ্চাকাক্সক্ষা ব্যাহত হয় তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধির কারণে দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যর্থতা, এবং অপ্রয়োজনীয় দফতর ও প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় বিস্তারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অপচয়।