- তরল জালানি তেল কেনায় এই অর্থ ব্যবহার করা হবে
- দৈনিক গড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট
- মানতে হবে ৪ শর্ত
চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়া বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বাবিউবো) ছয় হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে তরল জ্বালানি বা হেভি ফিউয়েল অয়েল (এইচএফও) ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দৈনিক গড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য বাবিউবো এর আর্থিক সঙ্কট বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সুদমুক্ত ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এই অর্থ ঋণ হিসেবে বাবিউবো প্রদান করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অনুমোদনক্রমে গতকাল রবিবার এই অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে বাবিউবো সূত্রে জানা গেছে।
বাবিউবো সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে দেশের বহু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্য দিকে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫,৬৩৭ মেগাওয়াট (মোট সক্ষমতার প্রায় ১৯.৫৮%) হলেও আর্থিক সঙ্কটের কারণে বেসরকারি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) বিল বকেয়া পড়েছিল।
তরল জ¦ালানি কেন্দ্রগুলো পূর্ণ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে চালু রেখে দৈনিক চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন। প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রতি মাসে আনুমানিক ছয় লাখ ৩০ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন তরল জ্বালানি ক্রয় করতে হবে, যার বাজারমূল্য (প্রতি লিটার প্রায় ১০০ টাকা হিসাবে) প্রায় ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এর আগে গত ২১ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব এবং বাবিউবো চেয়ারম্যানের বৈঠকে তরল জ¦ালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে বাবিউবো এককালীন ছয় হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হয়, যা পরবর্তী সাত মাসের সরকারি ভর্তুকি বিল থেকে প্রতি মাসে এক হাজার কোটি টাকা করে কেটে সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বলে সূত্র জানায়।
পরে অর্থ বিভাগ সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পরিচালন ঋণ খাত থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে মঞ্জুরি প্রদান করে। তবে এ জন্য চারটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।
১. সুদমুক্ত ঋণ : বরাদ্দকৃত ছয় হাজার কোটি টাকা সম্পূর্ণ সুদমুক্ত সরকারি পরিচালন ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
২. ভর্তুকির সাথে নির্দিষ্ট কিস্তিতে সমন্বয় : ঋণকৃত অর্থ আগামী মার্চ ২০২৭ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত চার মাসের মধ্যে সরকার কর্তৃক দেয়া বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বিলের সাথে চারটি সমান কিস্তিতে সমন্বিত হবে।
৩. আনুষ্ঠানিক ঋণচুক্তি : অর্থ ছাড়ের আগে বাবিউবো ও অর্থ বিভাগের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে হবে।
৪. আর্থিক বিধিমালার কঠোর পরিপালন: অর্থ খরচে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয়নীতি (পিপিআর), ২০২৫ সহ সরকারের যাবতীয় আর্থিক নিয়মাচার মেনে চলতে হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের আইপিপি, আরপিপি ও যৌথ উদ্যোগের প্রদেয় ভর্তুকি নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন এই ছয় হাজার কোটি টাকা ছাড়ের ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া এবং নতুন জ্বালানি কেনার নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত হবে, যা জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
তবে সুদমুক্ত এই বিপুল পরিমাণ ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি সমন্বয় বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইপিপি ও তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও প্রাথমিক জ্বালানি (যেমন: গ্যাস ও কয়লা) সরবরাহে জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে অর্থ বিভাগ মনে করে।
লোকসানে জর্জরিত বাবিউবো : সাত বারে বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি বেড়েছে ৬৩৩%
এ দিকে, বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে প্রতি বছরই বিদ্যুৎখাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে। যা এককথায় লোকসানের পর্যায় পরে। গত সাত বছরের ব্যবধানে এই খাতে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে সাত গুণেরও বেশি, শতকরা হিসাবে যা ৬৩৩ শতাংশ। যেমন, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎখাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছিল আট হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। সেখানে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে এই ভর্তুকি পরিমাণ গিয়ে ঠেকবে ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
প্রতি বছর ভর্তুকি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশী-বিদেশী কোম্পানি থেকে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে প্রতি বছর বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। যেমন ২০২১-২০২২২ অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি দেয়া লাগছে এগারো হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এরপরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তা একলাফে ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা দ্বিগুণের মতো আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) তা হবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।



