জনপ্রশাসনে ৯ উদ্যোগে অগ্রগতি বড় সংস্কার এখনো প্রক্রিয়ায়

সরকারের ১৮০ দিন

নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের বিভিন্ন দফতর-সংস্থায় প্রায় পাঁচ লাখের বেশি শূন্য পদ দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পূরণের প্রতিশ্রুতি ছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার আওতাধীন দফতর ও প্রশাসনে ১৮০ দিনে দুই হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ১৬ আগস্ট পর্যন্ত পূরণ হয়েছে দুই হাজার ৬১টি পদ যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে মাঠ প্রশাসনে ৯৮১টি, দফতর ও সংস্থায় এক হাজার ৪৫টি এবং মন্ত্রণালয়ে ৩৫টি পদ পূরণ হয়েছে।

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ, দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, সিভিল সার্ভিস আইন, ই-গভর্ন্যান্স এবং জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান সরকার। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার হিসাব বলছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নির্ধারিত বেশ কয়েকটি প্রাথমিক ও প্রক্রিয়াগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছে। তবে যে সংস্কারগুলোর প্রভাব সরাসরি প্রশাসনের কাঠামো, নিয়োগ-পদোন্নতির সংস্কৃতি ও সরকারি সেবার মান বদলে দেয়ার কথা, সেগুলোর বড় অংশ এখনো আইন, বিধি, সফটওয়্যার উন্নয়ন বা কমিটি গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৬ আগস্ট প্রকাশিত সরকারের ১৮০তম দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অগ্রগতি প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে মোট পাঁচটি প্রধান ইশতেহারভিত্তিক প্রতিশ্রুতির অধীনে একাধিক কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে নিয়োগ বিধিমালা হালনাগাদে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা, শূন্য পদ পূরণে সমন্বয়, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের উদ্যোগ, সিভিল সার্ভিস আইনের খসড়া প্রণয়নে কমিটি, প্রশিক্ষণ, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার এবং অনলাইন পেনশন কার্যক্রমে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কথা বলা হয়েছে। অন্য দিকে অনলাইন বদলি ও পদায়ন মডিউল এবং সরকারি শূন্য পদ পূরণের মতো কার্যক্রমে এখনো ঘাটতি রয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার যে ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা হালনাগাদে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছে মন্ত্রণালয়। সভার সিদ্ধান্ত ও স্ব-স্ব বিধিমালা হালনাগাদের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি শতভাগ অগ্রগতি হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরগুলো বাস্তবে বিধিমালা কতটা পরিবর্তন করে এবং সেই পরিবর্তন নিয়োগ ও পদোন্নতিতে কতটা প্রয়োগ হয় তার ওপর। অর্থাৎ ১৮০ দিনের হিসাবের একটি বড় অংশই এখনো ‘প্রক্রিয়া সম্পন্ন’ হওয়ার হিসাব; কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনের নয়।

পাঁচ লাখ শূন্য পদের প্রতিশ্রুতি, ১৮০ দিনে পূরণ ২ হাজার ৬১

নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের বিভিন্ন দফতর-সংস্থায় প্রায় পাঁচ লাখের বেশি শূন্য পদ দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পূরণের প্রতিশ্রুতি ছিল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার আওতাধীন দফতর ও প্রশাসনে ১৮০ দিনে দুই হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ১৬ আগস্ট পর্যন্ত পূরণ হয়েছে দুই হাজার ৬১টি পদ যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে মাঠ প্রশাসনে ৯৮১টি, দফতর ও সংস্থায় এক হাজার ৪৫টি এবং মন্ত্রণালয়ে ৩৫টি পদ পূরণ হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন ঘটেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮০ দিনের শূন্য পদ পূরণের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৩৩টি। পরে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা পাঠানো হয় ৪৪৫টি। এর ফলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা দুই হাজার ৮৭৯ থেকে কমে দুই হাজার ৩৯১ হয়েছে। এই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার সাথে দুই হাজার ৬১টি পূরণ করা পদের তুলনা করলে অগ্রগতির হার প্রায় ৮৬ শতাংশই দাঁড়ায়। অর্থাৎ ৩৩০টি পদ তখনো পূরণ হয়নি।

এখানে বড় প্রশ্ন হলো, ইশতেহারে যে ‘পাঁচ লক্ষাধিক শূন্য পদ’ দ্রুত পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার তুলনায় ১৮০ দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাত্র কয়েক হাজার পদ পূরণ কতটা কাক্সিক্ষত গতি তৈরি করছে। অবশ্য পাঁচ লাখের পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়; সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দফতরকে নিয়ে সমন্বিত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

এই কারণেই ১১-২০ গ্রেডের শূন্য পদগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহ এবং নিয়োগের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। ২৮ জুলাইয়ের ১৭৯ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হয়েছে। এই উদ্যোগের অগ্রগতি প্রতিবেদনে ১০০ শতাংশ বলা হয়েছে।

প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন : এখনো মূলত চিঠির পর্যায়ে

নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। বলা হয়েছিল, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করে প্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন করা হবে। ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল কমিশন গঠনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পত্র পাঠানো। সেই কাজ ১৩ এপ্রিলেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদনে তাই অগ্রগতি ১০০ শতাংশ। কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা জরুরি, কমিশন গঠনের সুপারিশ বা অনুরোধ পাঠানো এবং কমিশন গঠন করা এক বিষয় নয়।

মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পত্র প্রেরণ। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। কিন্তু ইশতেহারের মূল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন ও সংস্কার বাস্তবায়ন। ফলে বৃহত্তর সংস্কারের দিক থেকে কাজটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এখানেই ১৮০ দিনের সরকারি হিসাব এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়।

সিভিল সার্ভিস আইন : কমিটি হয়েছে, আইন এখনো হয়নি

জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধানের আলোকে উপযুক্ত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন। এই লক্ষ্যে ১৩ জুলাই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৯ জুলাই কমিটির প্রথম সভা হয়। এরপর ২৮ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার সাথে কমিটির সদস্যদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয়ের হিসেবে এ কর্মসূচির অগ্রগতি ১০০ শতাংশ, কারণ ১৮০ দিনের লক্ষ্য ছিল কমিটি গঠন। কিন্তু বাস্তব সংস্কারের দৃষ্টিতে এটি মাত্র সূচনা।

কারণ আইন প্রণয়নের সবচেয়ে কঠিন ধাপগুলো এখনো সামনে, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা, সিভিল সার্ভিসের কাঠামো নির্ধারণ, নিয়োগ-পদোন্নতি-পদায়ন ও জবাবদিহির নীতি নির্ধারণ, বিভিন্ন ক্যাডারের স্বার্থের সমন্বয়, অংশীজনের মতামত গ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত আইন প্রণয়ন। তাই ১৮০ দিনের হিসেবে ‘১০০ শতাংশ’ হলেও সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি এখনো শুরুর পর্যায়ে।

প্রশিক্ষণে লক্ষ্যমাত্রার বেশি সাফল্য

জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান। ১৮০ দিনের লক্ষ্য ছিল দেশে এক হাজার ৫০০ এবং বিদেশে ১০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশে দুই হাজার ৮৩১ এবং বিদেশে ৯৬ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। দেশীয় প্রশিক্ষণে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৮৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। বিদেশী প্রশিক্ষণে অগ্রগতি ৯৬ শতাংশ।

অর্থাৎ দেশে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় নির্ধারিত লক্ষ্য উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে। এটি ইতিবাচক। তবে প্রশিক্ষণের সংখ্যা দিয়ে প্রশাসনের দক্ষতা পরিমাপের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মদক্ষতা এবং সরকারি সেবায় তার বাস্তব প্রভাবও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় পরিবর্তন

প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিকায়নের আরেকটি উদ্যোগ হলো ‘সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল, ২০২০’ এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশিকা হালনাগাদ। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ জুলাই এগুলো হালনাগাদ করে মুদ্রণের জন্য মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় এই কাজের অগ্রগতি ১০০ শতাংশ হিসেবে দেখিয়েছে।

এটি প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ কোনো দফতরের দায়িত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও কাজের বিভাজন পুরনো থাকলে নতুন বাস্তবতায় প্রশাসনিক দক্ষতা কমে যায়। তবে হালনাগাদ নির্দেশিকা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার মূল্যায়ন ১৮০ দিনের পরবর্তী পর্যায়ে করতে হবে।

ডিজিটাল প্রশাসনে সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণতা অনলাইন বদলি

সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় অনলাইন বদলি ও পদায়ন মডিউল চালু করার উদ্যোগটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বদলি ও পদায়ন দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি প্রশাসনে প্রভাব, পছন্দ-অপছন্দ ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের অভিযোগের সাথে যুক্ত। এই মডিউলের ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ শতাংশ অগ্রগতি। বাস্তবে লক্ষ্য বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হলেও কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের মতামতের ভিত্তিতে ইউজার ইন্টারফেস ও প্রোটোটাইপ ডেভেলপমেন্ট করা হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের ফিডব্যাক নেয়া হয়েছে। তবে সফটওয়্যার রিকোয়ারমেন্টস স্পেসিফিকেশন পাওয়ার পর বাস্তবায়ন শুরু হবে। অর্থাৎ এই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সংস্কার এখনো উন্নয়ন ও প্রস্তুতি পর্যায়ে।

যদি অনলাইন বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা যায়, তাহলে এটি জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম দৃশ্যমান সংস্কার হতে পারে। কিন্তু সফটওয়্যার তৈরি করলেই সংস্কার হবে না। কোন কর্মকর্তা কোথায় বদলি হবেন, সে সিদ্ধান্তের মানদণ্ড, অনুমোদন কাঠামো, তথ্য প্রকাশ এবং আপিল বা অভিযোগ ব্যবস্থাও ডিজিটাল ব্যবস্থার অংশ করতে হবে।

অনলাইন পেনশন : বাস্তব প্রয়োগ শুরু

ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সরাসরি ফল পাওয়া গেছে অনলাইন পেনশন ব্যবস্থায়। ৩ আগস্ট পাইলটিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব আফজাল হোসেনের পেনশন অনলাইনে অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০০ শতাংশ এবং মন্ত্রণালয় তা পূরণ করেছে। এ ধরনের সেবা সাধারণ সরকারি কর্মচারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অবসর-পরবর্তী পেনশন পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও কাগজপত্রের জটিলতা সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির একটি উৎস। পাইলট প্রকল্প থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় যেতে হলে অবশ্যই সব স্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীকে এর আওতায় আনা, ডাটাবেজ সমন্বয় এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল : উদ্যোগ আছে, ফলের অপেক্ষা

বেসরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সার্ভিস রুল প্রণয়নের প্রতিশ্রুতিও ছিল সরকারের ইশতেহারে। ১৮০ দিনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আইন ও বিধির রূপরেখা নিয়ে অংশীজন ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে মতবিনিময়। এ লক্ষ্যে ১০ মে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। ১০ জুন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে অংশীজনদের নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ২০ জুলাই কোর কমিটি গঠন করা হয় এবং ২৩ জুলাই সেই কমিটির সভা হয়। অর্থাৎ আলোচনার কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কার্যকর সার্ভিস রুল এখনো প্রণীত হয়নি। এখানেও একই চিত্র-প্রক্রিয়া এগিয়েছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত নীতিগত ফল এখনো সামনে।

১৮০ দিনের মূল্যায়নে আসল প্রশ্ন

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের অগ্রগতি মূল্যায়ন করলে তিন ধরনের চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমত, যেসব কাজের লক্ষ্য ছিল সভা, চিঠি, কমিটি বা মডিউল তৈরি- সেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি বেশির ভাগই ১০০ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের মতো বাস্তব কার্যক্রমে লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ আছে। তৃতীয়ত, যেসব উদ্যোগ প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে সরাসরি যুক্ত, যেমন সিভিল সার্ভিস আইন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের বাস্তব কার্যক্রম, অনলাইন বদলি-পদায়ন এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল, সেগুলোর বড় অংশ এখনো প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে। সুতরাং ১৮০ দিনের এই রিপোর্টকে ব্যর্থতা বলা যাবে না। আবার এটিকে জনপ্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের পূর্ণ সাফল্যও বলা যাবে না।

বরং এটি সংস্কারের প্রস্তুতিপর্বের একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া-কমিটি থেকে আইন, সভা থেকে সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবায়ন এবং সফটওয়্যার থেকে নাগরিকসেবায়।

মেধাভিত্তিক প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হলো, তার প্রমাণ মিলবে পরবর্তী নিয়োগ ও পদোন্নতিতে। স্বচ্ছ বদলি ব্যবস্থার প্রমাণ মিলবে কোনো কর্মকর্তা প্রভাব ছাড়াই কোথায় পদায়িত হচ্ছেন তাতে। জনবান্ধব প্রশাসনের প্রমাণ মিলবে সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসে কত দ্রুত সেবা পাচ্ছেন তাতে। আর প্রশাসনিক সংস্কারের সাফল্য মাপা হবে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি বা সরকারের ইচ্ছার বাইরে কতটা নিয়ম ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, তার মাধ্যমে। ১৮০ দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বেশ কিছু দরজা খুলেছে। এখন প্রশ্ন- সেই দরজা দিয়ে প্রশাসন সত্যিই নতুন পথে হাঁটবে কি না। কারণ ইশতেহারে প্রতিশ্রুত ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ গড়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ সভা করা নয়; যোগ্যতা, সততা ও জবাবদিহিকে বাস্তবে ক্ষমতা ও প্রভাবের ওপরে প্রতিষ্ঠা করা। আগামী ছয় মাসে সেই পরীক্ষাই দিতে হবে সরকারকে।