- হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট
- বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমীকরণে নতুন মোড়?
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাথে মার্কিন বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত দূত সার্জিও গোরের বৈঠকের পরই ভারতের ভূখণ্ড থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট করেছে দিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয়ে রাখা হলেও ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।
একই সময়ে ঘটে যাওয়া এই দু’টি ঘটনা ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনা দু’টির সময়কাল কাছাকাছি হলেও এদের মধ্যে সরাসরি কোনো সংযোগ বা কার্যকারণ রয়েছে- এমন কোনো দাফতরিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং এটিকে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘোষিত নীতিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন তারা।
দিল্লির অবস্থান ও প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গের সমীকরণ
ভারতের সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনটি বিষয় জানায়। প্রথমত. শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও তাকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর অনুমতি দেয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত. বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধটি আইনগত ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে রেখে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত. একই সাথে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, সীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে সুপারিশ করেছে ভারতের সংসদীয় কমিটি।
এর আগেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলেছে, প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে নিজস্ব ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়া তাদের একটি নীতিগত অবস্থান।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন সমীকরণ
সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশের দৃষ্টিতে দেখতে চায় না বরং নিজস্ব কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করতে আগ্রহী।
এর পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে : প্রথমত. ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিতীয়ত. আঞ্চলিক ভারসাম্য। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রভাবের বিপরীতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে ওয়াশিংটন। তৃতীয়ত. দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও নিরাপত্তা। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামনে ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক কৌশলী অবস্থানে রয়েছে, যেখানে একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন- এই তিন পরাশক্তির সাথেই ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। চীনের কৌশলগত গুরুত্ব হলো-বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী ও বৃহৎ অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। ভারত হলো-নিকটতম প্রতিবেশী; যার সাথে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সীমান্ত, বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সংযোগের বহুমাত্রিক সংযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব হলো- বাংলাদেশের বৃহত্তম একক রফতানি বাজার এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশলের বড় অংশীদার।
তাই কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো একটি শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে বাকিদের সাথে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সার্জিও গোর ও প্রণয় ভার্মার বৈঠক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে ওয়াশিংটন-দিল্লির যৌথ চাপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ একে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
তবে কূটনৈতিক অঙ্গনে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সব তথ্য প্রকাশ্যে আসে না। ফলে শুধু সময়ের কাকতালীয় মিল দেখে চূড়ান্ত রাজনৈতিক উপসংহারে পৌঁছানো পেশাদার বিশ্লেষণের পরিপন্থী।
পর্যবেকদের ধারণা, আগামী দিনগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক কূটনীতি আরো গতিশীল হবে। প্রধানত পাঁচটি বিষয়ের ওপর পরাশক্তিগুলোর নীতি নির্ভর করবে। এর মধ্যে রয়েছে- নতুন সরকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি। বাণিজ্য ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণ। নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা। আর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
গোর-প্রণয় বৈঠক এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিষয়ে ভারতের অবস্থান- উভয় ঘটনাই দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কূটনৈতিক বাস্তবতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে একক কোনো বৈঠক বা ঘোষণার মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতি বদলে যাচ্ছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরো নির্ভরযোগ্য ও দাফতরিক তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ নিয়ে ভারতের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ঢাকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘অপেক্ষাকৃত শীতল’ সম্পর্কের বরফ গলাতে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বিষয়টি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য বা পর্যবেক্ষক কোনোটিই না হওয়া সত্ত্বেও এই বিশেষ আমন্ত্রণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাসিনাকে ফেরত দিতে বাংলাদেশ ভারতকে একাধিক চিঠি দেয়ার পর এখনো স্পষ্ট কোনো উত্তর আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দিল্লি স্বাভাবিকভাবে না নেয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে আরো কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। হিন্দুস্তান টাইমসসহ একাধিক ভারতীয় মিডিয়ার দাবি, চীনের সাথে করিডোরে না যেতে এবং মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার ব্যাপারে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি সার্জিও গোর ঢাকায় সফরের সময় বিশেষ অনুরোধ করেছেন। ভারত মনে করছে, ড. ইউনূসের মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ভারতের জন্য কৌশলগত ঝুঁঁকি। ভারত মূলত ড. ইউনূসের অনুপস্থিতিতে শুধু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বেশি সুবিধাজনক মনে করছে। তাদের ভয় হলো, ইউনূস ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সরাসরি ওয়াশিংটন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। সেখানে নয়াদিল্লি নাক গলানোর কোনো সুযোগ আর পাবে না। অন্য দিকে বাংলাদেশে কর্মরত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রির মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ব্রিকসের আমন্ত্রণ- এ দু’টি বিষয়কে আলাদা রাখা উচিত। এদের একে-অপরের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বাংলাদেশকে নিয়ে বীণার অসংখ্য অভিযোগ
ভারতীয় মিডিয়া ইয়নে ‘রেস টু পাওয়ার’ অনুষ্ঠানে বীণা সিক্রি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে ভারত সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ তারেক রহমানের জন্য জরুরি। বাংলাদেশে এই আমন্ত্রণ নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু বীণা মনে করেন দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে এবং নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের বাধাগুলো দূর করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আশ্বাসের কূটনৈতিক ভাষায় এই প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এমনভাবে বক্তব্য রাখেন যা সরাসরি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন। বীণার দাবি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো কেবল শিক্ষার্থীদের সাধারণ গণঅভ্যুত্থান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত অপারেশন’, যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থন ছিল। তার মতে, গত ১৮ মাস ধরে (তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার আগে থেকে) জামায়াতে ইসলামী পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং দেশটি গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে ‘ইসলামীকরণ’ ও ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের আগের মতো পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশনের সাথে যুক্ত হতে চাইছে এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও ভিসার ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোর ভেতরে পাকিস্তানের এই ধরনের প্রবেশ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।
ভারতের নিরাপত্তা এবং হাসিনার শাসনামল
বীণার দাবি হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ভারতের ‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত রেড লাইন’গুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমান ভারতের এই নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত দেননি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ভেঙে পড়ার মুখে এবং অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। তারেক রহমানের উচিত কোনো দ্বিধা বা শর্ত ছাড়াই ভারতের এই বিশেষ আমন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং আলোচনার টেবিলে আসা। ভারত যথেষ্ট ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করছে এবং এখন সম্পর্কের উন্নতির জন্য বাংলাদেশকে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের ‘নিরাপত্তা রেড লাইন’গুলোর প্রতি উদাসীনতার অভিযোগ তুললেও বীণা তার এ বক্তব্যের নির্দিষ্ট কারণ বা বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের আগ্রহকে ভারতের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে গণ্য করলেও এ দুটি প্রকল্প নিয়ে ভারত বছরের পর বছর সময় ক্ষেপণ করেছে সে সম্পর্কে বীণা কিছু বলেননি। উল্টো অভিযোগ তুলেছেন এই উদাসীনতা (তার ভাষায়) দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তার দাবি, তারেক রহমান এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন যে, তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সরাসরি সাহায্য করবেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবেন, আওয়ামী লীগের কার্যকলাপের ওপর জারি করা নির্বাহী আদেশ তুলে নেবেন। কিন্তু তিনি এর কিছুই করেননি।
শশী থারুর ভিন্ন বয়ান
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (যার নেতৃত্বে রয়েছেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর) সম্প্রতি ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে প্রতিবেদনটিতে নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে ভারত একটি ‘পরিমিত ও অহস্তক্ষেপ নীতি’ অনুসরণ করছে বলে দাবির মধ্যে যা পরোক্ষভাবে পূর্ববর্তী সরকারের সময় ভারতের হস্তক্ষেপের বিষয়টিকেই প্রমাণ করেছে।
হাসিনার প্রত্যর্পণ সম্ভাবনা
একই প্রতিবেদনে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। পানি বণ্টন (বিশেষ করে তিস্তা), সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভিসানীতি নিয়ে ভারত এখন ‘ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক’ সম্পর্কের কথা বলছে, যা তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার গৌতম দাস বলছেন, মূলত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের ‘ভালো সাজার’ বা বাজার ধরে রাখার চেষ্টা মাত্র। তারেক রহমান যদি মার্কিন বা ভারতীয় চাপের মুখে না পড়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে,আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায় এবং অনেক নেতাকর্মীই এখন ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিএনপির দিকে ঝুঁঁকে পড়ার চেষ্টা করছেন। ভারতের এই পরিবর্তিত অবস্থান মূলত তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষারই একটি কৌশল। গৌতম দাসের চোখে নামে তিনি তার ইউটিউব চ্যানেলে এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, ভারতের নিজস্ব স্বার্থে প্রয়োজন হলে তারা হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরও করতে পারে, যেমনটা অতীতে কাদের সিদ্দিকীসহ অন্যান্য নেতাদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ১৯৯৭ সালে পাহাড়ী বিদ্রোহীদেরও ভারত একইভাবে ফেরত পাঠিয়েছিল। এছাড়া ভারত বাংলাদেশে মার্কিন প্রভাব (ড. ইউনূসের মাধ্যমে) নিয়ে চিন্তিত। তারা মনে করছে, ড. ইউনূস বাদে যদি শুধু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটি ভারতের জন্য বেশি সুবিধাজনক হতে পারে। এই স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ভারত হাসিনাকে ‘তারেক রহমানের হাতে হ্যান্ড ওভার’ করতে পারে। ভারত এখন মনে করছে বাংলাদেশে ‘হাসিনা জমানার দিন শেষ’ এবং হাসিনার পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
সতর্ক ঢাকা
একই দিনে দুই পরাশক্তির দুই মেরুর জোটে ঢাকার নাম শোনা গেছে। মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাক্স সিলিকা জোটে যোগ দেওয়ার আহবান জানানোর পর একই দিন বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় চীনের নেতৃত্বাধীন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জোট ওয়াইকোতে পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। দুই পরাশক্তির ঢাকাকে কাছে টানার প্রতিযোগিতায় ঢাকা ভারসম্য রক্ষার কৌশল নিয়েই আগাচ্ছে। বাংলাদেশের স্থীতিশীলতা ফেরায় যুক্তরাষ্ট্র তার ভ্রমণ সতর্কতা লেভেল তিন থেকে দুই-এ নামিয়ে এনেছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রীও মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং চীনের সাথে সম্ভাব্য টু প্লাস টু কৌশলগত সংলাপ সব মিলিয়ে ঢাকার ওপর তীক্ষè নজর রেখেছে ওয়াশিংটন ও দিল্লি। প্যাক্স সিলিকায় বাংলাদেশকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে চায় ওয়াশিংটন কিন্তু ঢাকা এখনোই কোনো পক্ষকে প্রতিশ্রুতি না দিয়ে ওয়াইকোতে পূর্ণ সদস্য না হয়ে পর্যবেক্ষক থেকে ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো হেজিং নীতি নিয়েছে।



