বিশেষ প্রতিনিধি
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক কাঠামোয় ব্যাপক ও কার্যকর সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কর্মশালায় বক্তারা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে বিনিয়োগ বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, শুল্ক হার কমালে বাংলাদেশ মূল্য সংযোজন করে বেশি আয় করতে পারবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকায় পিআরআই মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি এক সন্ধিক্ষণে : জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো: ফজলুল হক।
উচ্চ শুল্ক ও প্যারা-ট্যারিফের নেতিবাচক প্রভাব
কর্মশালায় বিশ্বব্যাংকের ম্যাক্রোইকোনমিক্স, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. নোরা ডিহেল মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য-ভারযুক্ত গড় এমএফএন (মোস্ট ফেভারড নেশন) শুল্ক ছিল ৭.০ শতাংশ। কিন্তু এর সাথে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ও সম্পূরক শুল্কের (এসডি) মতো প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত থাকায় সীমান্ত সুরক্ষার গড় হার দাঁড়িয়েছে ১৫.৪ শতাংশে।
তিনি উল্লেখ করেন, জুতা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাথর, কাচ ও পরিবহন সরঞ্জাম খাতে এ জাতীয় অতিরিক্ত শুল্ক নামমাত্র হারকে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী উপাদানের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে দেশীয় রফতানিকারকদের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংকের উপস্থাপনায় মধ্যবর্তী উপকরণের শুল্ক হ্রাস, ধাপে ধাপে প্যারা-ট্যারিফ প্রত্যাহার এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির সমন্বিত সুপারিশ করা হয়।
উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের তাগিদ
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো: ফজলুল হক বলেন, ‘শুধু উচ্চ শুল্ক আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে কোনো শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব নয়।’ তিনি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কাস্টমস ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করার আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে তুলা সুতা আমদানির বিধিনিষেধের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে শিল্প মালিক ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা এবং সহজ অর্থায়নের ঘাটতি মেটানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রফতানিবিরোধী পক্ষপাত নিরসন ও শুল্কনীতির যৌক্তিকীকরণ
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত ২৫ বছর ধরে জমে থাকা সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়। ১৯৯০-এর দশকের শুল্ক সংস্কার দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিল।’ তিনি বাণিজ্যনীতির ‘রফতানিবিরোধী পক্ষপাত’ (অ্যান্টি এক্সপোর্ট বায়াস) দূর করার তাগিদ দেন। উচ্চ শুল্কপ্রাচীরের কারণে দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা যতটা লাভজনক, তৈরী পোশাক ছাড়া অন্যান্য খাতে রফতানি করা ততটা আকর্ষণীয় থাকে না, যা রফতানি বহুমুখীকরণের প্রধান বাধা।
তিনি প্রস্তাব করেন, ২০২৯ সালের মধ্যে আরডি ও এসডি সম্পূর্ণ বিলোপ করে সর্বোচ্চ কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ এবং এসডি ১০ শতাংশে নামিয়ে এনে বাণিজ্যনীতিকে নিরপেক্ষ করতে হবে। এ ছাড়া স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি ও জাতীয় শুল্কনীতি ২০২৩ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে পরামর্শ দেন তিনি।
ড. সাত্তার আরো উল্লেখ করেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামো বজায় রেখে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন করা বেশ কঠিন। তাই এফটিএর চেয়ে বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পাদনে মনোযোগী হওয়া অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
কর্মশালায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন, সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ), এবং এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান। আলোচকরা একমত হন যে, শুল্ক সংস্কারের ফলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লে তা পুষিয়ে যাবে। তাই এলডিসি উত্তরণের আগেই প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার তাগিদ দেন তারা।



