সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে সরকার-বিরোধী দলের বিতর্ক

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition
  • ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অংশ নিলেই ২৬ শতাংশ সভাপতি পদ : চিফ হুইপ
  • শর্ত দিয়ে পদ চাই না : বিরোধীদলীয় উপনেতা

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। সংসদে নিজেদের সদস্যসংখ্যার অনুপাতে ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি পদ দাবি করছে বিরোধী দল। তবে সরকারি দলের চিফ হুইপের বক্তব্য, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল অংশ নিলে তাদের আনুপাতিক হারে সভাপতি পদ দেয়া হবে। এ নিয়ে গতকাল জাতীয় সংসদে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে।

মাগরিবের নামাজের বিরতির পর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন এবং সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে আলোচনায় এ বিতর্ক হয়।

২৬ শতাংশ সভাপতি পদ দাবি বিরোধী দলের

অধিবেশনে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদে সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী আমরা ২৬ শতাংশ স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য পদ পাচ্ছি। একইভাবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কমিটিগুলোর সভাপতিরও ২৬ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হয়নি। এসময় তিনি চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সাথে ফোনালাপের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণের বিনিময়ে সভাপতি পদ দেয়ার বিষয়ে তাদের কোনো সমঝোতা হয়নি। সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আমরা যাব এবং সেই হিসেবে আপনি (চিফ হুইপ) আমাদের সভাপতি দেবেন- এমন কথা আমরা কখনোই বলিনি।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ না নেয়া। কোনো কমিটিতে যোগদানের জন্য শর্তারোপ করে চাপ সৃষ্টি করা আমরা সমর্থন করি না।

১০টি সভাপতি পদ দিতে প্রস্তুত সরকার

এর আগে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদে বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার সাথে ফোনালাপের ভিত্তিতে আশা করেছিলাম তারা (বিরোধী দল) সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবে। সেই বোঝাপড়ার কারণেই সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, গত ৫৪-৫৫ বছরে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ছাড়া অন্য কোনো সংসদীয় কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করার রেওয়াজ নেই। তার পরও বর্তমান সরকার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দিতে রাজি। তবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল অংশ নিলে এই সভাপতি পদ দেয়ার বিষয়ে আমরা প্রস্তুত আছি। আমরা কোনো কিছু আটকে রাখতে চাই না।’ আমি যদি দিল খুলে কথা বলি, তবে অপর পক্ষকেও ওপেন হার্ট হতে হবে। কথার মারপ্যাঁচ করে আমরা দেশ গঠনের কাজে এগোতে পারব না।

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অংশ নেয়ার আহ্বান

গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠিত হয়। সরকারি দল ও শরিক দলগুলো থেকে ১২ সদস্যের এই কমিটি গঠিত হলেও বিরোধী দলের জন্য পাঁচজন সদস্য শূন্য রাখা হয়। তবে শুরু থেকেই বিরোধী দল বলে আসছে, সংবিধান সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায় তারা। তাই সরকার গঠিত কমিটিতে অংশ নেবে না বিরোধী দল।

এ বিসয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নেয়ার ফের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য সরকার সংবিধান সংশোধনের কাজ শুরু করেছে। রুলস ২২৬-এর অধীনে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব কমিটিতে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল নীতিগতভাবে এতে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতেই পারে। যদি সংবিধান সংশোধিত না হয়, জুলাই জাতীয় সনদ তো বাস্তবায়িত হলো না।

বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মতামত নেয়া হবে

সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, তার সভাপতিত্বে সংবিধান সংশোধন কমিটির একটি বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মতামত নেয়া হবে। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে সাথে যারা কাজ করেছেন, তাদেরও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সাথেও আলোচনা করা হবে। পরে আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ নিলে তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তারা দ্বিমত বা ভিন্নমত পোষণ করলেও তা নথিভুক্ত করা হবে। সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেয়ার বিষয়টিও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সাথে যুক্ত। সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলকে দেয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে এটি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আপনাদের সব দাবি মানতে হবে, তার পরও আপনারা এই সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসবেন না- এটা সহযোগিতা হলো না। আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন।

এখন আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না। দুইটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।