জ্যৈষ্ঠ আসতে এখনো সপ্তাহ বাকি; কিন্তু তার আগেই কৃত্রিম উপায়ে পাকা ফলে চলছে ক্রেতা ঠকানোর ফাঁদ। বাজার ঘুরে দেখা যায়, দোকানে থরে থরে সাজানো আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, (লাল ও সাদা) জামরুল, আতাফল ও তরমুজসহ বিভিন্ন জাতের অসংখ্য ফল। দেখলে পাকা মনে হলেও এর সবই অপরিপক্ব। দামও কম নয়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। বলা হচ্ছে- সময়ের আগে বাজারে আনতে গিয়ে খরচ বেশি পড়েছে। তাই দামও বেশি; কিন্তু ভয়ানক তথ্য হলো- এসব ফল অপরিপক্ব ও কৃত্রিমভাকে পাকানো হলেও তা বোঝার উপায় নেই। তাই এসব কিনে প্রতিদিন প্রতারিত হওয়ার সাথে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ক্রেতারা।
গতকাল একাধিক দোকান ঘুরে দেখা যায়, দোকানে রাখা পাকা আমের আঁটিও শক্ত হয়নি। বাইরের রঙ হলুদ হলেও হাতে নিয়ে ঝাঁকি দিলে ভেতরে আঁটি নড়ার শব্দ পাওয়া যায়। পরে একটি আম কেটে দেখা যায় তা সম্পূর্ণ অপরিপক্ব। ভেতরের অঁটির উপরে শক্ত আবরণও পড়েনি। অথচ বিক্রেতা তা কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে পাকা আম বলে বিক্রি করছেন। আর দাম হলো প্রতি কেজি দেড় শ’ টাকা, যা পরিপক্ব আমের দামের চেয়ে অনেক বেশি।
একই অবস্থা লিচুতেও। মাত্র ফুল ঝরেছে এমন লিচু আকারে একেবারে ছোট হলেও তার উপরের রঙ দেখলে পাকা মনে হয়; কিন্তু হাতে নিয়ে দেখা যায় তা এত অপরিপক্ব যে ঠিকমতো ছিলতেও পারা যায় না। আর ভেতরে মাত্র আঁটি গজিয়েছে, যা পরিপক্ব হতে আরো কমপক্ষে ১৫ দিন লাগবে। এমন লিচু উচ্চদামে পাকা বলে বিক্রি হচ্ছে।
কাঁঠালে চাপ দিয়ে দেখা যায় তা অনেকটা নরম, মনে হয় পাকা; কিন্তু কেটে দেখা যায় পাকা তো দূরে থাক, ভেতরে মাত্র দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এমন আরো অনেক ফল আছে যেগুলো খাবার অনুপযোগী হলেও রাসায়নিক দিয়ে পাকিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসের ৫ তারিখ পর্যন্ত শুধু দেশী আম ছাড়া কোনো আম খাওয়া নিরাপদ না। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসতে শুরু করা আম অপরিপক্ব হয়। আরো সপ্তাহ বা ১০ দিন পর এই আম বাজারে এলে তাতে ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। এর আগ পর্যন্ত বাজারের রাসায়নিক পদার্থ কার্বাইড মেশানো আম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু দেশী গুটি আম খাওয়া যাবে। তবে এর আগে আসা আমগুলো রাসায়নিক পদার্থ কার্বাইড মিশিয়ে পাকানো হচ্ছে, যা মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
একজন পাইকারী আম ব্যবসায়ী জানান, তারা মূলত পরিপক্ব না হওয়া পর্যন্ত আম বাজারে আনেন না। তবে বেশি মুনাফার আশায় কিছু অসৎ ব্যবসায়ী নির্দিষ্ট সময়ের আগে অপরিপক্ব আম নিয়ে এসে রাসায়নিক পদার্থ কার্বাইড মিশিয়ে পাকায়। এরপর এই আম বাজারে চড়া দামে বিক্রি শুরু করে।
শান্তিনগর বাজারে কয়েকজন ক্রেতা জানান, বর্তমানে যে আম পাওয়া যাচ্ছে তা অপরিপক্ব বোঝার উপায় নেই। তাই তারা সরল বিশ্বাসে এগুলো কিনে নিয়ে যান। বাসায় গিয়ে কাটার পর আসল রূপ ধরা পড়ে। তাতে দেখা যায়, এসব আম পাকা তো দূরে থাক, ভেতরের আঁটিও ঠিকমতো পূর্ণ হয়নি। ফলে এগুলো না খেয়ে ফেলে দিতে হয়।
তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুম জেনে ফল কিনলে তাতে প্রতারণা থেকে রক্ষা সম্ভব। তাদের মতে, মূলত মে থেকে সেপ্টেম্বর মোট পাঁচ মাস আমের মৌসুম থাকে। সবচেয়ে বেশি আম পাওয়া যায় জুন থেকে জুলাই মাসে। তবে কোন আম কোন সময় পাওয়া যাবে সে বিষয়ে অনেকের ধারণা নেই।
মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি সময়ে পাকে আগাম জাতের আম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, বৃন্দাবনি, গুলাবখাশ, রানীপছন্দ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত ও বারি-১।
জুনের মাঝামাঝি থেকে পাকতে শুরু করে মধ্য মৌসুমি আম, এগুলো হলো ল্যাংড়া, হাঁড়িভাঙ্গা, লক্ষণভোগ, খুদিক্ষীরশা, বারি-২, বোম্বাই, সূর্যপুরী।
জুলাই মাস থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাকে নাবি জাতের আম। সেগুলো হলো ফজলি, আম্রপালি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গৌড়মতি, বারি-৩, বারি-৪ ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো জানা থাকলে আর প্রতারিত হওয়ার অশঙ্কা থাকবে না।



