সাক্ষাৎকার : এম হুমায়ুন কবীর

আমরা একটা ‘লারেলাপ্পা স্টেট’ চালাচ্ছি

ভারত তার ডোমেস্টিক পলিটিক্সটা বাংলাদেশে ট্রান্সফার করছে। এটা অনুচিত এবং ভারত তা করলে রিলেশন কিন্তু ভালো হবে না। ২৪’এর পর ভারতকে ভিন্ন চোখে দেখে মানুষ। কারণ তারা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। আবার উত্তেজনা সৃষ্টি করলে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী কিন্তু ভারতের ওপর নারাজ হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জন্যে ইতিবাচক নয়, এমন কাজ পরিহার করতে হবে, নিকট প্রতিবেশী হিসেবে দু’দেশেরই দু’দেশের ওপর নির্ভরশীলতা আছে। বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক অনেক কিছু, সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে। শক্তিশালী সম্পর্ক চাইলে এ ধরনের বাহুল্য কাজ না করাই ভালো।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
আমরা একটা ‘লারেলাপ্পা স্টেট’ চালাচ্ছি
আমরা একটা ‘লারেলাপ্পা স্টেট’ চালাচ্ছি

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর বলেছেন, ইরানকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। চার থেকে পাঁচ শ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতিতে দেশটির মানুষ কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে। টিকে থাকা ইরানের বিজয় এবং অন্তত এ মুহূর্তে স্বস্তিতে রয়েছে দেশটি। ‘কোয়ারশিপ স্টেট’ হিসেবে ইরানকে বর্ণনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে ইরানকে তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে ডেমোক্রেটাইজ করতে হবে, নতুবা যুদ্ধ থামলেও অভ্যন্তরীণ আন্দোলন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে ইরান একটি ‘স্মার্ট কার্ড’ খেলেছে এবং সাম্প্রতিক চুক্তির বেশির ভাগ শর্তই ইরানের পক্ষে গেছে।

আঞ্চলিক জোটের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, আসিয়ানে বর্তমানে বাংলাদেশের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া সম্ভব নয়। ব্রিকসের ক্ষেত্রেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে বাড়তি কী সুবিধা আসবে তা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। মনে রাখতে হবে পররাষ্ট্রনীতির ৫০ শতাংশই অন্য দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই এখানে আরো বেশি বুদ্ধিমান ও কৌশলগত অবস্থান জরুরি, যার অভাব বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এম হুমায়ুন কবির ইরান যুদ্ধ, যুদ্ধ পরবর্তীয় মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তন, বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে করণীয় বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য রাখেন।

নয়া দিগন্ত : যুদ্ধের শুরুতে ইরান টিকে থাকলেই তা দেশটির জন্যে জয় বলে উল্লেখ করেছিলেন, এখন কী বলবেন?

এম হুমায়ুন কবীর : বড় যুদ্ধের পর সমাজে চিন্তা চেতনায় বড় একটা পরিবর্তন আসে। বর্তমান রেজিমকে টিকে থাকতে হলে আরো কিছুটা ডেমোক্রেটাইজের দিকে যেতে হবে। ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ছাড়াও ইরানের জন্যে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে যুদ্ধ থেমে যাওয়া ইরানের জন্য বড় স্বস্তি এবং নিশ্চিতভাবেই ইরান খুবই স্মার্টলি সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। চুক্তির বেশির ভাগ অংশই ইরানের পক্ষে গিয়েছে।

নয়া দিগন্ত : যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে কিভাবে পাল্টে দিতে পারে?

এম হুমায়ুন কবীর : পারস্যে ইরানকে ঘিরে নতুন ইকুয়েশন তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তায় যেমন যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে, তাকে এসব দেশ থেকে চলে যেতে হতে পারে, আবার পাল্টা আঘাত হানায় ইরানের ওপর একটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এখানে ইরানের সাথে দেশগুলোর নতুন একটা বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে। সামরিক ভারসাম্যের জন্যে না হলেও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশের সাথে এসব দেশ কাজ করবে। চীন, রাশিয়া এমনকি আমেরিকার বিনিয়োগ এসব দেশের পাশাপাশি ইরানেও হতে পারে। কারণ ইসরাইল, আমেরিকা, ইরানের মিলিটারি পাওয়ারের লিমিটেশন সবাই দেখে ফেলেছে। যুদ্ধের ধ্বংস দেখে মানুষের মধ্যে নতুন চিন্তার আবির্ভাব হতে পারে বলে আমার একান্তই ধারণা।

নয়া দিগন্ত : গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনার কী হবে?

এম হুমায়ুন কবীর : দ্যাটস ডুম, দ্যাটস ডুম। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এখন একঘরে। জেডি ভ্যান্স থেকে ট্রাম্প কী বলছেন? গাজা ও ইরান যুদ্ধের পর আমেরিকার তরুণরা মার্কিন প্রশাসনের ওপর সিন্দাবাদের ভুতের মতো ইসরাইল চেপে থাক এটা দেখতে চাচ্ছে না। ৫৮ শতাংশ ইসরাইলি চাচ্ছে নেতানিয়াহু নির্বাচন থেকে সরে যাক। নির্বাচনে দাঁড়ালেও নেতানিয়াহু হেরে যাবে এবং শঙ্কা কাটাতে ইসরাইলে নতুন চিন্তার উদ্ভব ঘটবে। ইরান একটা ভেরিটেবল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইসরাইলকে স্বাভাবিক সম্পর্কে পথ ধরতে হবে।

নয়া দিগন্ত : ইরানের নিজস্ব গবেষণা ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ছিল, এ যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশ কী শিক্ষা নিতে পারে?

এম হুমায়ুন কবীর : নিজের ওপর ভরসা করতে হবে, বল বল বাহুবল কিন্তু সেটা কি আছে আমাদের? লেখাপড়াই তো নাই, গবেষণা কী করবেন, রাজনৈতিক ঐক্য, কাঠামোগত শক্তি, শিক্ষার বেইসিক ভিত্তি তো নাই। আমরা একটা লারেলাপ্পা স্টেট চালাচ্ছি।

নয়া দিগন্ত : পুশইনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক কাঠামো ব্যবহারের কথা বলেছেন আপনি।

এম হুমায়ুন কবীর : এটা এ্যালার্মিং। ভারত তার ডোমেস্টিক পলিটিক্সটা বাংলাদেশে ট্রান্সফার করছে। এটা অনুচিত এবং ভারত তা করলে রিলেশন কিন্তু ভালো হবে না। ২৪’এর পর ভারতকে ভিন্ন চোখে দেখে মানুষ। কারণ তারা আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। আবার উত্তেজনা সৃষ্টি করলে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী কিন্তু ভারতের ওপর নারাজ হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জন্যে ইতিবাচক নয়, এমন কাজ পরিহার করতে হবে, নিকট প্রতিবেশী হিসেবে দু’দেশেরই দু’দেশের ওপর নির্ভরশীলতা আছে। বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক অনেক কিছু, সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে। শক্তিশালী সম্পর্ক চাইলে এ ধরনের বাহুল্য কাজ না করাই ভালো।

নয়া দিগন্ত : রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে কি নতুন কোনো আশা দেখছেন, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাচ্ছেন।

এম হুমায়ুন কবীর : না, ভেরি ডিফিকাল্ট চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের ভেতরে যতক্ষণ না ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে ততক্ষণ রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান হবে না।

নয়া দিগন্ত : দুটো প্রতিবেশীর একটি গুলিতে হত্যা আরেকটির পেতে রাখা মাইনে হতাহত হতে হচ্ছে আমাদের, সমস্যা দিনকে দিন জটিলতর হচ্ছে..

এম হুমায়ুন কবীর : হচ্ছে, সেটার জন্যেই আমাদের পেশাগত কূটনীতি পরিচালনা করা উচিত। কূটনীতি শুধু রুটিন কাজের জন্যে নয়। জাতীয় স্বার্থকে সংরক্ষণ ও সম্প্রসারিত করার জন্যেই কূটনীতি। এ কাজের জন্যে কূটনীতি করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে আসতে হবে।

নয়া দিগন্ত : কোনো উদ্যোগও কি দেখছেন?

এম হুমায়ুন কবীর : আপনি তো আগেই সারেন্ডার করে বসে আছেন। ক্যামনে হবে? আমেরিকার সাথে ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট তো বিএনপি-জামায়াত দুই পক্ষই সমর্থন করেছে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চালাতে চাইলে এটি নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা করেন না কেন? সরকারি দল আছে, বিরোধী দল এখনো কমপ্লাইন্ট বিরোধী দল, তারা তো অকোয়ার্ড বিরোধী দল না। এগ্রিমেন্টে যে বিষয়গুলোতে ডিফিকাল্টি আছে পার্লামেন্টের বাইরে আলাপ-আলোচনা করে পার্লামেন্টে একটা সিদ্ধান্ত নেন। তাতে লুকানো ছাপানো না থেকে একটা জাতীয় স্বার্থে সহমতের জায়গা তৈরি হবে। মানুষ বাইরে এটাকে নেগিটিভলি দেখছে। পার্লামেন্টে আলোচনা করে জাতীয় ইস্যুতে সহমত তৈরিতে একটা রিফ্লেক্ট করতে পারলে একটা মেনিফেস্টাশন দিতে পারতেন যে নিজেরা চিন্তা করে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি।

নয়া দিগন্ত : স্বাধীন কূটনীতির জন্যে দরকষাকষিতে তরুণদের কিভাবে তৈরি করা যায়?

এম হুমায়ুন কবীর : তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করতে তো আলোচনা করতে হবে। ফরেন মিনিস্ট্রির কাউকে কি পাওয়া যায়, যিনি বাইরে এসে কথা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, বলে না কেন? উনি কোনো কথা বলবেন, ওনার গলাকাটা যাবে, কী দরকার আছে, উনি চাকরি বাঁচান। সমাজে একটা ওপেন ডিসকাশন, এ জগতে যারা কাজ করেন তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, অন্যদের এনলাইটেন করা, এ কাজগুলোর স্পেস তৈরি করতে হবে। পলিটিক্যাল লিডারশিপ দিয়েই করতে হবে, তা না হলে আমলাদের বের করতে পারবেন না। আমলারা বের না হলে মানুষ জানবে কী করে হোয়াট ইজ হ্যাপেন্ড? আমেরিকার সাথে ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট নিয়ে কি সুধীসমাজে কোনো অর্গানাইজড আলোচনা হয়, যাতে চিন্তাশীল ও তরুণরা অংশ নিতে পারে। চুক্তির সব কিছুকেই নেগেটিভ বলছি না। বড় রাষ্ট্রের সাথে কিভাবে একটা ছোট রাষ্ট্রকে যেতে হয় বুঝলাম, একটা স্ট্যান্ডার্ড হলো, কৌশলগত অবস্থানও তৈরি হলো, বিপদে পড়লে বলতে পারব ভাই তুমি আমাকে সাহায্য কর। একটা কমিটমেন্ট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোনো খোলামেলা আলোচনা নাই। কিন্তু পাবলিক দেখছি স্ট্রংলি নেগেটিভ এটার ব্যাপারে। আমেরিকার মতো একটা বড় পার্টনারের সাথে এ রকম নেগেটিভ হলে কিভাবে পলিসি চালাবেন। ইন্ডিয়ার সাথে নেগেটিভ, ইউএসের সাথে নেগেটিভ, মিয়ানমারের সাথে নেগেটিভ তো আমার কয়টা বন্ধু আছে? দুইটা নেইবার তো দুইজনের সাথেই সম্পর্ক খারাপ, এইটা কেমন হলো?

নয়া দিগন্ত : সার্কও হচ্ছে না, ব্রিকস আর আসিয়ানই কি লক্ষ্য হওয়া উচিত?

এম হুমায়ুন কবীর : আসিয়ানে নতুন সদস্য নেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ। ডায়ালগ, স্ট্রাটেজিক পার্টনার হতে পারেন। তারও কি কোনো উদ্যোগ আছে? মুখে মুখে বলি। আর ব্রিকসে চীন, ভারত, সৌদি আরব, রাশিয়ার সাথে রিলেশনশিপকে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ তো নিতে হবে। ইরানের সাথেও রিলেশনশিপ খারাপ না। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে অতিরিক্ত কী বেনিফিট আসবে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে না? সেটারও তো কোনো যাচাই বাছাই, স্বচ্ছতা আছে বলে মনে হয় না। ফরেন পলিসি দিন আনি দিন খাই ভিত্তিতে চলে না। ফরেন পলিসিতে ফিফটি পার্সেন্ট অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল বলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু আমার দেশে তো নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। আরেকটু বুদ্ধিমান হওয়ার চিন্তা তো দেখছি না। কোনো উদ্যোগও দেখছি না। আমরা দুই চারটা কথা বলি, বেশির ভাগ মানুষ অন্যকে নারাজ করতে চায় না।