নাসিরুদ্দিন শাহর কড়া সমালোচনা

ভারতের শাসনব্যবস্থাকে ‘জাহিল’ ও ‘বেরহম’, মোদিকে ‘ভণ্ড’ আখ্যা

যখন কোনো অজ্ঞ ব্যক্তি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকেন, তখন তিনি পুরো দেশকে নিজের মতো অজ্ঞ, অযোগ্য ও সংবেদনহীন করে তুলতে চান।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি ভারতের বর্তমান সরকারকে ‘জাহিল’ (অজ্ঞ) ও ‘বেরহম’ (নির্মম) বলে অভিহিত করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভণ্ড’ বলে মন্তব্য করেছেন। ছাত্র আন্দোলন, পুলিশি দমন-পীড়ন, বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে দেয়া তার সাম্প্রতিক বক্তব্য ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণপ্রাপ্ত এই অভিনেতা বলেন, যখন কোনো অজ্ঞ ব্যক্তি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকেন, তখন তিনি পুরো দেশকে নিজের মতো অজ্ঞ, অযোগ্য ও সংবেদনহীন করে তুলতে চান।

জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে নাসিরুদ্দিন শাহ অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, ছাত্রীদের পোশাক টেনে ছিঁড়ে ফেলা, এমনকি প্রতিবাদকারীদের ওপর বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। তার ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ড সরকারের ‘নির্মম’ ও ‘অমানবিক’ আচরণের প্রতিফলন। তিনি দাবি করেন, বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে, এমনকি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এসব দৃশ্য দেখে তার ‘রক্ত রাগে ফুটছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শাহ বলেন, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকারী লাঠিধারি ও মুখোশধারিদের আচরণ তাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থা আইস-এর অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার অভিযোগ, সরকার জনগণকে সংবেদনহীন করে তুলতে চায় এবং তাই এমন দমনমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যদি মানবিক না হয়, তাহলে সমাজও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যায়।

ছাত্রদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেন, তাদের ক্ষোভ ও দাবি যৌক্তিক, কারণ এটি তাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। একই সাথে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘ভণ্ড’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী কখনো নিজের ভুলের দায় স্বীকার করেন না। তার ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞানীদের সামনে অবৈজ্ঞানিক বক্তব্য দেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সঙ্কট নিয়ে কথা বলেন না।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি আরো বলেন, অনেক হামলাকারীর পোশাকে কোনো নামফলক বা পরিচয়চিহ্ন ছিল না। তার সন্দেহ, তারা ‘ভাড়াটে গুণ্ডা’ হতে পারে। তার মতে, পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তিনি সরকারের আচরণকে ‘দ্বিচারিতা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রতিফলন।

বর্তমান ভারতের পরিস্থিতিকে তিনি গভীর উদ্বেগের সাথে বর্ণনা করে বলেন, ‘এটি সেই ভারত নয়, যাকে আমি ভালোবাসতে শিখেছিলাম।’ একই সাথে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘১৯৮৪’-এর সাথে। তার মতে, বাকস্বাধীনতা সঙ্কুচিত হওয়া, সরকারি ভাষ্যে সত্যের বিকৃতি এবং নাগরিকদের ওপর বাড়তি নজরদারির কারণে ভারত এক ধরনের ‘ডিস্টোপিয়ান’ বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে।

চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক তারকার নীরবতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাসিরুদ্দিন শাহ। তার ভাষায়, ‘যতদিন মানুষের মুখে সুবিধাভোগের হাড় থাকবে, ততদিন তারা প্রতিবাদ করবে না।’ তিনি বলেন, অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বিবেকের কণ্ঠরোধ করছেন। একটি প্রচলিত প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুখে হাড় থাকা কুকুর ডাকতে পারে না।’ তার ব্যাখ্যায়, যতদিন সুবিধা-স্বার্থ অক্ষুণœ থাকবে, ততদিন অনেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলবেন না।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ‘চুপ করে থাকার সময় নয়’। দীর্ঘদিন কোনো সাক্ষাৎকার না দেয়ার সিদ্ধান্ত ভেঙে তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন। তার মতে, দেশের এই সঙ্কটময় সময়ে নীরবতা কোনো সমাধান হতে পারে না।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবির প্রসঙ্গেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ওই দাবি কার্যকর হবে না, কারণ সরকার তাকে অপসারণ করবে না এবং তিনিও পদত্যাগ করবেন না। বরং শিক্ষার্থীদের আরো গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি দাবির ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেন, এক সময় ভারতে নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং প্রাক্তন মন্ত্রী মাধবরাও সিন্ধিয়ার উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সময়ে সেই রাজনৈতিক নৈতিকতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তার ভাষায়, এখন দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টি কেবল ‘কথার কথা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।