আমন রোপণের ভরা মৌসুমে এক দিকে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের ব্যস্ততা, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে তাদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। সারের দাবিতে লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে নামতে দেখা গেছে। অথচ কৃষি বিভাগ থেকে দাবি করা হচ্ছে- দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের এই বাস্তবতার সাথে সরকারি বক্তব্যের বড় ধরনের ফারাক দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে খাতাকলমে সার মজুদ থাকলেও তা কৃষকের হাতে পৌঁছানো নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আমনের পরপরই শুরু হবে রবি ও বোরো মৌসুম। ফলে আগামী মার্চ পর্যন্ত দেশের কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে সার সঙ্কটের সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের শেষ সময়ে, যা পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আরো ঘনীভূত হয়। তৎকালীন কৃষি সচিব সময়মতো সার আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায় সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময়ের প্রশাসনিক অবহেলার খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৎকালীন সচিবকে পরবর্তী সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালেও তার অনুসারীরা এখনো সার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উইংগুলো পরিচালনা করছেন।
মাঠপর্যায়ের চিত্র
রাজশাহী, লালমনিরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর ও কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকরা চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। কোনো কোনো এলাকায় সরকারি বরাদ্দ বাড়লেও সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না; আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলেই সার মিলছে।
নাটোর : কৃষকদের অভিযোগ, বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, টিএসপি এক হাজার ৮০০, ইউরিয়া এক হাজার ৫০০, ডিএপি এক হাজার ৭৫০ এবং এমওপি এক হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররা বেশি দাম রাখায় তারাও বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে ডিলারদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামেই সার দিচ্ছেন। অন্য দিকে কৃষি বিভাগের ভাষ্য, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই।
কিশোরগঞ্জ : করিমগঞ্জ, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুরে কৃষকরা কয়েক দিন ঘুরেও সার পাচ্ছেন না। ২৭ টাকা কেজি দরের ইউরিয়া ৩৫ টাকা, টিএসপি ৩০-৩৫ টাকা এবং এমওপি ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিলারদের দাবি, বিসিআইসি ও বিএডিসি থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। বিশেষ করে ডিএপি ও টিএসপির সঙ্কট প্রকট। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
নিরাপদ মাত্রার নিচে নন-ইউরিয়া সারের মজুদ
বিএডিসির তথ্যানুযায়ী, দেশে নন-ইউরিয়া সার-ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ ইতোমধ্যে নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে ডিএপির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।
ডিএপি : বর্তমানে মজুদ তিন লাখ ৯০ হাজার টন (প্রয়োজন পাঁচ লাখ টন; ঘাটতি এক লাখ ১০ হাজার টন)।
টিএসপি : বর্তমানে মজুদ তিন লাখ ৫৩ হাজার টন (প্রয়োজন চার লাখ টন; ঘাটতি ৪৭ হাজার টন)।
এমওপি : বর্তমানে মজুদ এক লাখ ৯৬ হাজার টন (প্রয়োজন তিন লাখ টন; ঘাটতি এক লাখ চার হাজার টন)।
আমনের সারের চাহিদা সামাল দিতে গত ২৬ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেয় বিএডিসি। সংস্থাটি জানায়, অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চুক্তির আওতাধীন চালানের পাশাপাশি আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে অতিরিক্ত দুই লট করে ডিএপি আমদানি করা জরুরি।
অন্য দিকে ইউরিয়া সারের মজুদ পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। পাঁচ লাখ টন নিরাপদ মজুদের বিপরীতে বর্তমানে মজুদ রয়েছে পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার টন (৮৫ হাজার টন বেশি)। তবে ইউরিয়া পুরোটাই আমদানিনির্ভর হওয়ায় এটি একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
আমদানি ও নীতিগত জটিলতা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টন (ইউরিয়া ২৬.২২ লাখ, টিএসপি ৯.০১ লাখ, ডিএপি ১৩.৫৫ লাখ, এমওপি ৯.৭০ লাখ এবং অন্যান্য ৯.২১ লাখ টন)। এর বিপরীতে বর্তমানে মোট মজুদ মাত্র ১৬ লাখ টনের কাছাকাছি।
বেসরকারি আমদানিকারকরা জানান, সার আমদানির জন্য সরকার এখনো প্রয়োজনীয় ক্রয়সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করেনি। পরিপত্র জারির পর এলসি খোলা এবং জাহাজে সার এসে পৌঁছাতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস লাগে। এখন সিদ্ধান্ত নিলেও নতুন সার পৌঁছাতে অক্টোবর বা নভেম্বর হয়ে যাবে। ফলে শীতকালীন ফসলের মৌসুমেও সার অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক সার ব্যবস্থাপনার বর্তমান নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আগের ভারসাম্যপূর্ণ সার নীতিমালা বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে নীতি করা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না। বর্তমান সরকারও সেই জটিল পথেই হাঁটছে। বিএডিসির ওপর প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ থাকায় অনেক ব্যাংক নতুন এলসি দিতে চাইছে না, গুদাম সক্ষমতারও ঘাটতি আছে। বিএডিসির একচ্ছত্র ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাতকে সাথে নিয়ে বাজার মনিটরিং ও স্থিতিশীল রাখার ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘গ্রামপর্যায়ে সার সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়ে গেছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পাশাপাশি গ্যাসসঙ্কট দূর করে বন্ধ থাকা সরকারি সার কারখানাগুলো চালু করে অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদন বাড়ানো দরকার।’
কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য
চলতি আমন মৌসুমে দেশে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছে এক কোটি ৮০ লাখ ৫৭৬ টন। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে সার পাওয়া নিশ্চিত করা জরুরি হলেও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ভিন্ন দাবি করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই; বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুদ রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মজুদ আরো বেশি। যারা কৃত্রিম সঙ্কটের কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।’
(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি মো: আল আমিন ও নাটোর প্রতিনিধি রিয়াজুল ইসলাম রিজু।)



