বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন এক উদ্বেগের নাম বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিস্থিতি এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, শিল্প খাতে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কটে ভুগছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগে এই দীর্ঘ খরার অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ধরনে বড় পরিবর্তন। উৎপাদন ও শিল্প খাতে ঋণ দেয়ার পরিবর্তে ব্যাংকগুলো ক্রমেই সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে।
এ দিকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের হার জিডিপির অনুপাতে কমেছে। একই সাথে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করায় বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ধীরগতির কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারকে ঋণ দেয়া নিরাপদ ও লাভজনক। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করলে নির্ধারিত হারে সুদ পাওয়া যায় এবং ঋণখেলাপি হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। অন্য দিকে বেসরকারি খাতে ঋণ দিলে ব্যবসায়িক ঝুঁকি, ঋণ পুনরুদ্ধারের অনিশ্চয়তা এবং খেলাপির আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক ব্যাংক এখন শিল্প ও ব্যবসা খাতের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক সময় যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে বর্তমানে তা এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর অর্থ হচ্ছে নতুন কারখানা কম হচ্ছে, নতুন ব্যবসা কম শুরু হচ্ছে এবং বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছে।
দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের উচ্চ সুদহারও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণের খরচ বেড়েছে। একই সাথে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও আগের মতো নেই। এমন পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
ঢাকার একটি মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন, দুই বছর আগে উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য একটি নতুন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ব্যাংক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন না। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয়া কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছিল না। এখন সেটি সরাসরি নিম্নমুখী হওয়া আরো উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সরকার যত বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, তত বেশি বেসরকারি খাত অর্থসঙ্কটে পড়বে।
এ দিকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা আরো উদ্বেগের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে নিয়মিত নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা এবং সেবা খাতের উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি হয় বেসরকারি খাতে। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন চাকরিও তৈরি হবে না। এর প্রভাব ইতোমধ্যে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান সঙ্কটের পেছনে শুধু সরকারি ঋণগ্রহণ নয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ব্যাংকগুলো যদি উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে আস্থা না পায়, তাহলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান দু’টিই বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ঋণ প্রবাহ উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণ কমাতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণ, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজারকে কার্যকর অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরবে না বলে তিনি মনে করেন।
এ দিকে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলছে, বেসরকারি বিনিয়োগের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ অর্থনীতির টেকসই সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। বিনিয়োগ কমতে থাকলে শিল্পায়নের গতি শ্লথ হবে এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সেই ধারাকে ধরে রাখতে হলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। ব্যাংকের অর্থ যদি উৎপাদন, শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবর্তে ক্রমাগত সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হতে থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধির চাকা ধীর হয়ে যাবে এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরো গভীর হবে। ফলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



