- কাটেনি বিশৃঙ্খলা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধ্যত্ব
- পিএস নিয়োগে বিতর্ক ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ
- সক্রিয় কোটি কোটি টাকার তদবির চক্র
- সুবিধাভোগীদের পোস্টিং, বঞ্চিতরা উপেক্ষিতই
- সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বনাম বাস্তবতার বৈপরীত্য
- গভীরতর সঙ্কট : ‘মেরিটোক্র্যাসি’ যখন বলয়ের চাদরে ঢাকা
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার আগেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মেধা, সক্ষমতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে (মেরিটোক্র্যাসি) পদোন্নতি ও পদায়নের জোরালো ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিতেও মেরিটোক্র্যাসির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়। তবে সরকার গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের বাস্তব চিত্রে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো অনেক সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্য দিকে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অসততা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ, এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবেও পদায়ন করা হয়েছে। এসব বিতর্কিত পদায়নের কারণে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে কোনো কোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করতেও বাধ্য হয়েছে সরকার। ফলে সামগ্রিকভাবে জনপ্রশাসনে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
কাটেনি বিশৃঙ্খলা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধ্যত্ব
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একাংশ জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রে একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো স্থবির হয়ে পড়ে প্রশাসনও। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নানাভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি; অনেক সময় সকালে নেয়া সিদ্ধান্ত সন্ধ্যায় বদলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কর্মকর্তাদের আশা ছিল, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে প্রশাসনে দ্রুত চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা ফিরবে। কিন্তু তিন মাস পরেও সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারের সচিব পদমর্যাদায় ২১ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক কর্মরত আছেন, যাদের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছর পর্যন্ত। এসব কর্মকর্তা অতীতে অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। ফলে তাদের মেধার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাচ্ছে না সরকার। এ ছাড়া দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর প্রশাসনের বাইরে থাকায় তারা বর্তমানে কর্মরত ব্যাচগুলোর কর্মকর্তাদের চেনেন না। ফলে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের সঠিক স্থানে পদায়ন করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছেন।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের এই স্থবিরতার পেছনে কেবল বয়স বা শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা কাজ করছে। ২১ জন সচিবকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ার অর্থ হলো বর্তমান প্রশাসনের ওপরের স্তরে তীব্র যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্কট রয়েছে অথবা সরকার ঝুঁকি এড়াতে পুরনো বিশ্বস্তদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিচের স্তরের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে, যার ফলে প্রশাসনের ভেতরে একধরনের ‘প্রচ্ছন্ন অসহযোগিতা’ তৈরি হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর ‘মেরিটোক্র্যাসি’র স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় বাধা।
পিএস নিয়োগে বিতর্ক ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগের ক্ষেত্রেও চরম উদাসীনতা ও অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
একজন প্রভাবশালী প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে এমন একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। এ কারণে তাকে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার ইউএনও পদ থেকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছিল এবং বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পিএস করা হয়েছে এমন একজনকে, যিনি অতীতে নৈতিক স্খলনজনিত মামলায় বিভাগীয় শাস্তি পেয়েছিলেন।
অন্য এক প্রতিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এমন এক কর্মকর্তা, যিনি প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়ে নিজ ক্যাডারেরই এক নারী কর্মকর্তাকে বিয়ে করা নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন।
সক্রিয় কোটি কোটি টাকার তদবির চক্র
কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলেও পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী দালাল ও তদবির চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রলোভন দেখিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক তদবির বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর রেওয়াজ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি আরো জটিল রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি ‘অদৃশ্য নেটওয়ার্ক’ প্রশাসনিক বলয় তৈরি করেছে। এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের ‘উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ’, ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ কিংবা ‘সমন্বয়কারী’ পরিচয় দিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। সচিব, দফতর প্রধান, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) পদে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে কর্মকর্তাদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই দর ২০ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সম্প্রতি এমন অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পর একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে তড়িঘড়ি করে প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
সুবিধাভোগীদের পোস্টিং, বঞ্চিতরা উপেক্ষিতই
সম্প্রতি বিসিএস (প্রশাসন) ১৮ ব্যাচের চারজন অতিরিক্ত সচিবকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হয়েছে। অথচ এই কর্মকর্তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মিত পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে দায়িত্ব পালনের মতো সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন।
অন্য দিকে একই ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘বিএনপি-জামায়াত সমর্থক’ তকমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন। বর্তমান সরকার আসার পর এই বঞ্চিত ও মেধাবী কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও অদৃশ্য বলয়ের তদবিরে সাবেক আমলের সুবিধাভোগীরাই আবার পুরস্কৃত হয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বনাম বাস্তবতার বৈপরীত্য
প্রশাসনে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে গঠিত ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’ যেসব সুপারিশ করেছিল, বর্তমান সরকারের তিন মাসের কর্মকাণ্ড তার ঠিক উল্টো পিঠ প্রদর্শন করছে। কমিশন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের প্রধান প্রধান সুপারিশগুলোর সাথে বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক বৈপরীত্য নিচে স্পষ্ট ধরা পড়ে :
১. পলিটিক্যাল ট্যাগিং ও ওএসডি সংস্কৃতির অবসান : সংস্কার কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ ছিল- সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা বিভাগীয় মামলা ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে কেবল ‘রাজনৈতিক ট্যাগ’ দিয়ে ওএসডি রাখা যাবে না। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মেধা ও সততা থাকা সত্ত্বেও অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ‘বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের’ কারণে ঢালাওভাবে সাইড লাইন করে রাখা হচ্ছে।
২. পিএস নিয়োগের সুনির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া : মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশ ছিল- একটি স্বাধীন প্যানেল বা সার্চ কমিটির মাধ্যমে সততা, ট্র্যাক রেকর্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার ভিত্তিতে এদের নির্বাচন করা। কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলয়ের গোপন তদবিরের ভিত্তিতে বিতর্কিত ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত কর্মকর্তাদের পিএস হিসেবে পোস্টিং দেয়া হয়েছে।
৩. তদবির সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর : কমিশন সুপারিশ করেছিল- বদলির আদেশ অনলাইনে স্বয়ংক্রিয় করার এবং পদায়নের জন্য কর্মকর্তাদের ‘পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ উন্মুক্ত করার, যাতে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা দালাল চক্র মাঝখানে কাজ করতে না পারে। কিন্তু এই স্বচ্ছ ডিজিটাল পদ্ধতি আলোর মুখ না দেখায় সচিবালয়ের অলিতে গলিতে এখন কোটি কোটি টাকার ‘বদলিবাণিজ্যের’ গুঞ্জন ডালপালা মেলছে।
৪. চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবসান : কমিশন সিভিল সার্ভিসকে গতিশীল করতে ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ’ সম্পূর্ণ বন্ধ করার এবং এর পরিবর্তে ইন-হাউজ লিডারশিপ প্রমোট করার সুপারিশ করেছিল। অথচ বর্তমানে ২১ জন চুক্তিভিত্তিক সচিব দিয়ে প্রশাসন চালানো হচ্ছে, যা মেরিটোক্র্যাসির মূল ধারণার সাথে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।
গভীরতর সঙ্কট : ‘মেরিটোক্র্যাসি’ যখন বলয়ের চাদরে ঢাকা
প্রশাসনের ভেতরের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘মেরিটোক্র্যাসি’র কথা বলা হলেও বাস্তবে তা আমলাতান্ত্রিক ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্ব এবং ‘বিশেষ তদবির বলয়ের’ কাছে মার খাচ্ছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী বিসিএস ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তারা যখন গুরুত্বপূর্ণ চার মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বসে যান, তখন তা প্রমাণ করে যে- তদবিরের জোর মেধার চেয়ে এখনো অনেক বেশি শক্তিশালী।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়, বরং কর্মকর্তাদের বিগত ৫ বছরের কাজের ট্র্যাক রেকর্ড ও সততার সুনামের ওপর ভিত্তি করে পয়েন্ট দিতে হবে। সরকার যদি দ্রুত এসব সুপারিশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন না করে, তবে প্রধানমন্ত্রীর ‘১৮০ দিনের কর্মসূচি’ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং আমলাতন্ত্রের পুরোনো রোগ- ’তদবির, ভয় এবং স্থবিরতা’- নতুন খোলসে পুনর্বাসিত হবে।



