চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন হাঁটছে ২০/২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ মনোরেল প্রকল্পের পথে। আর নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন ২০৫০ সাল পর্যন্তই চট্টগ্রামে এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। চট্টগ্রাম শহরের সাথে সংযুক্ত বিদ্যমান বিভিন্ন রেলপথের পরিকল্পিত ব্যবহার, ডেডিকেটেড বাসলাইন চালু এবং ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করেই যানজট নিরসন সম্ভব বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে মনোরেলের পেছনে যে ব্যয় হবে, সেই টাকায় পুরো চট্টগ্রামের রোড নেটওয়ার্ক উন্নতভাবে ঢেলে সাজানো সম্ভব। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন করে মেগা অবকাঠামোর উদ্যোগকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন জনগণের অর্থের অপচয়ের আয়োজন। এতে সমস্যারও সমাধান হবে না বলে মনে করেন তারা।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য চারটি রুটে মনোরেল চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত (বহদ্দারহাট, চকবাজার, লালখান বাজার, দেওয়ানহাট ও পতেঙ্গা হয়ে) ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার, সিটি গেট থেকে শহীদ বশিরুজ্জামান চত্বর পর্যন্ত (এ কে খান, নিমতলী, সদরঘাট ও ফিরিঙ্গি বাজার হয়ে) ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং অক্সিজেন থেকে ফিরিঙ্গি বাজার (মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, আন্দরকিল্লা ও কোতোয়ালি হয়ে) পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেললাইন করা হবে। চতুর্থ রোড হিসেবে সিটি গেট থেকে পোর্ট কানেক্টিং রোড ও ভায়া আগ্রাবাদ এক্সেস হয়ে নিমতলা পর্যন্ত ১০.৯ কিমি রেললাইন করা হবে। সেন্ট্রাল স্টেশন, স্টোরেজসহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আনুমানিক ৫০ একর জায়গা লাগবে। প্রতিদিন মনোরেল পরিচালনায় ৩০-৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হতে সময় লাগবে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ মাস এবং নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ বছর।
আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রস্তাবনা অনুযায়ী মনোরেল চালু হলে ওরাসকম যাত্রী প্রতি অন্তত পাঁচ টাকা হারে সিটি করপোরেশনকে মুনাফা প্রদান করবে। পিপিওটি সিস্টেম এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে আনুমানিক ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে ২০-২৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেরা পরিচালনার পর সিটি করপোরেশনকে প্রকল্পটি হস্তান্তর করবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প সমন্বয়কারী আবু সাদাত মো: তৈয়ব নয়া দিগন্তকে বলেন, এটা একেবারেই প্রাথমিক স্তরে আছে। তিনি বলেন, মনোরেলই যে হবে তা কিন্তু এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি, বিআরটিও হতে পারে। আরব কনস্ট্রাকশন একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে মাত্র। চট্টগ্রাম শহরের রোডের প্রশস্ততা বিবেচনায় মনোরেল এই শহরের জন্য উপযোগী বলে মন্তব্য করেন এই প্রকৌশলী। এসব বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ’র সাথে সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, একটা শহরে মেট্রোরেল বা মনোরেল চালু হবে কি না বা প্রয়োজন আছে কি না, সেটা কতটুকু বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে তা একদমই সায়েন্টিফিক মেথডে একটা ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে হয়। সেক্ষেত্রে মেট্রোরেল বা মনোরেলের জন্য একটা নির্দিষ্ট ডিসটেন্স প্রয়োজন। ওই পরিমাণের ডিসটেন্সের মধ্যে যদি মেট্রোরেল বা মনোরেল রান না করতে পারে তাহলে সেটা লাভজনক কখনোই হবে না।
চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আমরা পরিকল্পনাবিদরা অনেক বছর ধরেই বলছি যে, চট্টগ্রামের সাথে তার চারপাশের অনেকগুলো উপজেলার মধ্যে অলরেডি বিদ্যমান রেললাইন আছে। এর আগে এগুলোর সাথে কানেক্টিং কমিউটার ট্রেন চালু ছিল। বোয়ালখালী, হাটহাজারী, নাজিরহাট, কালুরঘাটসহ অনেকগুলো উপজেলার সাথে রেল লাইন বিদ্যমান আছে। এই লাইনগুলো আগে আমরা চালু করে কমিউটার ট্রেন দিয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ চাহিদা সেটা পূরণ হতে পারে। মেট্রোরেল বা মনোরেল এখনই চট্টগ্রাম নগরের জন্য প্রয়োজন আছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না। এটা আরো লম্বা সময় পরে হতে পারে।
ড. রাশিদ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ব্যক্তিগত যান ব্যবহার করে ৪-৬ শতাংশ মানুষ। এরা কিন্তু বেশির ভাগই ফ্লাইওভার ব্যবহার করে। কিন্তু জনমানুষের জন্য চট্টগ্রামের যে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণে বাস সার্ভিস চালু করা, সেই বাসগুলো কিন্তু নিচের রাস্তা ব্যবহার করে। ফ্লাইওভারে কোনো পাবলিক পরিবহন ওঠে না। চট্টগ্রাম মহানগরীতে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে বাস এবং মিনিবাস যেগুলো জনবান্ধব, বড় পরিবহন ব্যবস্থাপনা সেদিকে আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, শহরের ভিতর কালুরঘাট থেকে রেল স্টেশন পর্যন্ত তো আমাদের বিদ্যমান রেললাইন আছে। তাহলে আমরা সেই রেললাইনটাকে যদি আরো উন্নত করি এবং সেই রেল লাইনের মধ্যে যদি রেগুলার বেসিসে কমিউটার ট্রেন চালু করি তাহলে সেটাই তো আমাদের সার্ভিসটা দেবে। বাংলাদেশে আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা নতুন কিছু প্রকল্প নেয়ার বিষয়ে খুব উৎসাহী। আমাদের রাষ্ট্রের আরো হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। কিন্তু ফলপ্রসূ হবে না।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়–য়া নয়া দিগন্তকে বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, জাংশন ম্যানেজমেন্ট। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করতে লাগবে হয়তো ৫০০ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, এই প্রজেষ্টগুলো তো করা উচিত ছিল ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ারদের। এটার ফিজিবিলিটি স্টাডিও যদি করতে হয় একটা ডিপার্টমেন্টকেরা বুয়েটকে দিতে পারত। কিন্তু সিদ্ধান্তটা নিচ্ছে হয় পলিটিক্যাল পার্টি, নয়তো আমাদের বর্তমানে যারা মন্ত্রী হচ্ছেন বা সংসদ সদস্য হয়েছেন ওনারা। ওনারা কিন্তু প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার না ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার না। কিন্তু ওনারাই এই বড় বড় প্রজেক্টগুলো নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, আমি যে কাজটা ১০০ টাকা দিয়ে করতে পারব সেটাতে কেন দুই হাজার টাকা খরচ করতে চাচ্ছি? কোরিয়ান কোম্পানি মেট্রোরেলের যে প্রাক ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে সেটার রিপোর্টেই আছে এটার যদি বাস্তবায়ন করতে হয় আগে আপনাকে ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। সড়ক নেটওয়ার্ক যেগুলো আছে সেগুলোকে ডেভেলপ করতে হবে। আমাদের এখানে প্রয়োজন হলো ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। সেটা না করে ওনারা কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন।
সুভাষ বড়–য়া বলেন, মনোরেল করার জন্য ৫৪ কিলোমিটারের একটা পথ ঠিক করেছেন। এই ৫৪ কিলোমিটার মনোরেল করতে গেলে ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা লাগবে। সেটা আরো বাড়তে পারে। ধরেন, ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা। একটা উপজেলার যে সড়কগুলো আছে সেগুলোকে যদি ডেভেলপ করতে চান খরচ হবে এক হাজার ৪০ কোটি টাকা। বড় উপজেলা হলে হয়তো দেড় হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জনগণের টাকা কেন এইভাবে খরচ করা হচ্ছে। ওনাদের প্রমাণ করতে হবে যে, মেট্রোরেল চট্টগ্রামে দরকার আছে, মনোরেল দরকার আছে। আগে আপনাকে দেখতে হবে লো কস্ট লো টেকনিকে কিভাবে কাজ করা যায়।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন এখানে ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবেন? কার জন্য? কত শতাংশ মানুষের জন্য? এই হিসাবগুলো না দিয়ে যেন কোনো প্রজেক্ট হাতে না নেয়। এটা এই মুহূর্তে চট্টগ্রামে প্রয়োজন নেই। আপনি পাবলিক বাসকে উৎসাহিত করেন, প্রাইভেট কারকে ডিসকারেজ করেন। আপনাকে ডেডিকেটেড বাসলেইন করতে হবে এবং সেটার সুযোগ এখনো আছে।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম শহরে ঘণ্টায় সিডিএ এভিনিউ দিয়ে যে গাড়িগুলো চলে সেখানে ২০৩০ সালে হবে ম্যাক্সিমাম ঘণ্টায় ১৭ হাজার প্যাসেঞ্জার। একটা মেট্রোরেল ঘণ্টায় ৬০ হাজার প্যাসেঞ্জার ক্যারি করতে পারবে। তাহলে ৬০ হাজার প্যাসেঞ্জার কোথায় পাবেন? আপনি ৭০ কোটি টাকা মেট্রোরেলের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে দিচ্ছেন, আপনি ৩৫ কোটি টাকার বাস কিনেন, আপনি ডেডিকেটেড বাস লেইন করেন, বাকি টাকা দিয়ে ম্যানেজমেন্ট করেন। সেটা না করে কেন এগুলো চাচ্ছেন? এটা তো ঠিক আগের সরকারের মতো। ডিফারেন্সটা কী হলো। ১৪শ’/১৫শ’ ছেলে যে মারা গেল আন্দোলনে, এই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আবার কেন এই সব কাজ করা হচ্ছে? তিনি বলেন, জনগণের টাকার জবাবদিহি চাই। চট্টগ্রামে মনোরেল-মেট্রোরেলের প্রয়োজন নেই। উপজেলাগুলোতে নজর দেন। ইন্ডাস্ট্রি করেন। টানেল অলরেডি হোয়াইট এলিফ্যান্ট হয়ে গেছে।



