অনেক জটিল রোগী বিপাকে আদ্-দ্বীন বন্ধ না করার আবেদন

এক সময়ে রোগী ও স্বজনদের হাসি-আনন্দ ও কান্নায় মুখরিত থাকলেও এখন কেবলই নীরবতা মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি আদেশ পাওয়ার পর অনেকেই রোগী নিয়ে চলে গেছেন অন্যত্র। তবে এখনো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), নিউনেটাল আইসিইউ (এনআইসিইউ) ও হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউতে) কিছু রোগী আছে। তাদের স্বজনরা বলছেন, এখান থেকে যে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। অল্প খরচের একটি হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বললে তারা যেতেই চাচ্ছেন না। এমনিতেই চিকিৎসার বাড়তি খরচ নানা কিছু বিক্রি করে মেটাতে হচ্ছে, তার ওপর নতুন কোনো বেসরকারি হাসপাতালে গেলে আরো কত কিছু যে বিক্রি করতে হবে সেই কষ্টে অবশিষ্ট রোগীদের স্বজনদের দুশ্চিন্তা।

হামিম উল কবির
Printed Edition

এক সময়ে রোগী ও স্বজনদের হাসি-আনন্দ ও কান্নায় মুখরিত থাকলেও এখন কেবলই নীরবতা মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি আদেশ পাওয়ার পর অনেকেই রোগী নিয়ে চলে গেছেন অন্যত্র। তবে এখনো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), নিউনেটাল আইসিইউ (এনআইসিইউ) ও হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউতে) কিছু রোগী আছে। তাদের স্বজনরা বলছেন, এখান থেকে যে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। অল্প খরচের একটি হাসপাতাল ছেড়ে যেতে বললে তারা যেতেই চাচ্ছেন না। এমনিতেই চিকিৎসার বাড়তি খরচ নানা কিছু বিক্রি করে মেটাতে হচ্ছে, তার ওপর নতুন কোনো বেসরকারি হাসপাতালে গেলে আরো কত কিছু যে বিক্রি করতে হবে সেই কষ্টে অবশিষ্ট রোগীদের স্বজনদের দুশ্চিন্তা।

ঢাকা শহরের সরকারি যে ছয় হাসপাতালে রোগী সরানোর কথা সরকার থেকে বলা হচ্ছে, সেটাতে কোনো সিট নেই, তা ছাড়া দালাল ধরা ছাড়া কোনো সিট সেখানে পাওয়া যায় না। আমরা এখানে রোগী ভর্তি করার আগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চেষ্টা করে বিফল হয়েই এখানে এসেছি। কোনো বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই বলছিলেন এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন শেফালী (৬৩) বেগমের মেয়ে নীলিমা। তারা শরীয়তপুর থেকে এখানে এসেছেন। নীলিমা বলছিলেন, আদ্-দ্বীনও বেসরকারি হাসপাতাল; কিন্তু এটা গরিবের হাসপাতাল। আমরা এখানে খুবই কম টাকায় চিকিৎসা করাতে পারছি। নীলিমার মা শেফালী বেগমের পাকস্থলীর নালী বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্রুততার সাথে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। তিনি বলেন, এখানে খুব অল্প খরচে এবং খুবই ভালো পরিবেশে আমার মায়ের চিকিৎসা হচ্ছে। এখন সমস্যা হচ্ছে সরকারি নির্দেশ অনুসারে আমরা এখানে আর থাকতে পারব না; কিন্তু এত স্বল্প খরচে আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসা করাবে এমন হাসপাতাল আমরা কোথায় পাবো। আমার মায়ের যা অবস্থা এখান থেকে নিয়ে যেতে হলে এইচডিইউ সুবিধা আছে এমন একটি অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে গেলে আমার মা পথেই মারা যাবেন। আমরা এখান থেকে যেতে চাই না, এখানে থেকে মাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরতে চাই। নীলিমা সরকারের উদ্দেশে বলেন, যাদের অবহেলায় ছয় নবজাতক মারা গেছে তাদের শাস্তি দিন, তাদের ফাঁসি দিন; কিন্তু গরিবের জন্য ভালো এই হাসপাতালটি বন্ধ করবেন না।

এইচডিইউতে থাকা মিতুর (২২) ভাই মো: রাকিব মিয়া জানালেন, আমার বোনের বাচ্চাটি পেটে থাকতেই মারা গেছে জরায়ু ফেটে যাওয়ার কারণে। আমরা নরসিংদীর মনোহরদীর হাতিরদিয়া থেকে এখানে এসেছি। আমার বোনের সিজার ও জরায়ু অপারেশন একসাথে হয়েছে, অপারেশন ভালো হয়েছে, আমার বোন এখন স্স্থুতার পথে। মিতুর শাশুড়ি পারুল আক্তার জানালেন, আমার ছেলের বউ এখন অনেকটা সুস্থ। এখানকার ডাক্তার ও নার্সরা এত আন্তরিক যে, ওদের সেবা ও চিকিৎসায় মিতু দ্রুত সুস্থ হচ্ছে। আর দুই-তিনটা দিন এখানে থাকতে পারলে তাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরতে পারতাম। পারুল আক্তার বলেন, আমার এলাকার এমপি সাহেবই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আমার এই আবেদনটা যদি তিনি শুনতেন, অনেক খুশি হইতাম। আমরা মতো আরো অনেক রোগী ও রোগীর স্বজনরাও কত্ত যে খুশি হইতো হাসপাতালটা বন্ধ না করলে। আমরা এই মগবাজারের আশেপাশে কয়েকটি হাসপাতালে গেছিলাম মিতুরে এইচডিইউতে ভর্তি করতে; কিন্তু সেখানে ভর্তি করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। সেখানে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা চায় শুধুমাত্র এইচডিইউতে রাখতেই, আর আদ্-দ্বীনে দৈনিক সাড়ে তিন হাজার টাকায় এইচডিইউতে রাখতে পারছি। পারুল আক্তার বলেন, এত কম খরচে ভালো সেবা এইখানে ছাড়া আর কই পাবো জানি না। চোখে-মুখে আন্ধার দেখতাছি।

মিতুর ভাই রাকিব জানিয়েছেন, আদ্-দ্বীনে এইচডিইউতে দিনে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকায় চিকিৎসা নিতে পারছি, অবশ্য ওষুধ কিনে দিতে হচ্ছে। খেঁাঁজ নিয়ে দেখেছি, অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতালে এত কম দামে চিকিৎসা হয় না।

ভোলা থেকে মো: রফিকুল ইসলাম এসেছেন তার পিতাকে নিয়ে। তার পিতাও আদ্-দ্বীনের এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন। তারা দুই ভাই পালাক্রমে বাইরে থাকছেন ওষুধ ও অন্যান্য কিছু সরবরাহের জন্য। রফিকুল ইসলামের ভাই জানালেন, সরকারি সিদ্ধান্ত শোনার পর আজ সারা দিন (গতকাল রোববার) ছয়টা হাসপাতালেই গিয়ে জানতে চেষ্টা করেছি কাগজপত্র নিয়ে বাবাকে ভর্তি করাতে পারা যাবে কি না; কিন্তু কোথাও কারো সাথে কথাও বলতে পারেননি। কোনো ডাক্তার তার কথা শোনেননি, তিনি আদ্-দ্বীন থেকে কিছু কাগজ নিয়ে এসেছেন সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী। বললেও কেউ কথা শোনেননি। রফিকুল ইসলাম জানালেন, কোনো সরকারি হাসপাতালে হয়তো তাদের পিতাকে ভর্তি করাতে পারবেন না, সেই বেশি দামে বেসরকারি হাসপাতালেই যেতে হতে পারে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে কারা যে ভর্তি হতে পারে সেইটাই বুঝলাম না।

আদ্-দ্বীনের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল জানান, সব মিলিয়ে দুশো রোগী গতকাল পর্যন্ত ছিলেন হাসপাতালে। তবে ধীরে ধীরে রোগী কমছে, তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আইসিইউ, এইচডিইউ ও এনআইসিইউতে ৫০ জনের মতো রোগী ছিল গতকাল পর্যন্ত।