ময়মনসিংহ অফিস
সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সংসারের অভাব ঘোচাতে রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন ২৪ বছরের আল মামুন। দেশে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন তিনি। মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির আশ্বাসে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ ও দাদন করে তাকে বিদেশে পাঠায় পরিবার। স্বপ্ন ছিল ঋণ শোধ হবে, সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ গিয়ে ঠেকেছে যুদ্ধের ময়দানে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে মামুন। স্ত্রী মহিমা আক্তার, এক ছেলে ও পাঁচ মাসের এক মেয়েকে রেখে গত ৭ মে রাশিয়া যান তিনি।
পরিবারের ভাষ্য, জাবাল-এ নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে মামুনসহ ৩০ বাংলাদেশী রাশিয়ায় যান। সেখানে ১২ মে ব্যাংক কার্ড ও কাজের অনুমতির কথা বলে তাদের রুশ ভাষার একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। ভাষা না বোঝায় চুক্তির প্রকৃত বিষয়বস্তু তারা জানতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের চুক্তি- এমনটাই দাবি পরিবারের। এরপর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে স্বজনদের পাঠানো শেষ অডিও বার্তায় মামুন মাথার ওপর ড্রোন ঘোরার আতঙ্কের কথা জানিয়েছিলেন। সন্তানদের দেখে রাখার আকুতিও ছিল তার কণ্ঠে। গত ১৯ আগস্টের পর থেকে তার সাথে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
রাশিয়া থেকে আহত অবস্থায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরা সহযাত্রী ঝিনাইদহের রাজন হোসেনের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, একই ফ্লাইটে যাওয়া ৩০ বাংলাদেশীর মধ্যে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এক রুশভাষী সামরিক কমান্ডারের সূত্রের বরাত দিয়ে রাজন জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন মামুন। তবে তার মৃত্যুর বিষয়টি এখনো পরিবারের কাছে সরকারি নথিতে নিশ্চিত হয়নি। তাই স্বজনদের একটাই অপেক্ষা- মামুনের লাশ কবে ফিরবে?
কান্নাজড়িত মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেকে যে দালাল বেচে দিছে, তার বিচার চাই। অন্তত আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে ফেরত পাই।’ মামুনের মৃত্যুর খবরে স্ত্রী মহিমার সামনে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এক দিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্য দিকে বিদেশ পাঠাতে নেয়া ঋণের বোঝা।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, প্রশাসনের মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি জানা গেছে। পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত মামুনের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে। যে তরুণ পরিবারের সুখের জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন, তার ঘরে এখন সুখের অপেক্ষা নেই- আছে শুধু লাশ ফেরার অপেক্ষা।



