দেশে পারিবারিক কলহ উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন ভয়ানক হয়ে উঠছে। যৌথ পরিবারে ভাঙনের সাথে একক পরিবারেও বিচ্ছেদ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লোকলজ্জা আর সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অনেক কলহের খবর চার দেয়ালের বাইরে না এলেও ভেতরে ভেতরে তা পরিবারগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে দেশে একক পরিবারে বিচ্ছেদের প্রবণতা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি তালাকের ঘটনা ঘটছে। আর একক শহর হিসেবে ঢাকার চিত্র উদ্বেগজনক। রাজধানীতে গড়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে সংসার ভাঙছে। এতে এগিয়ে আছেন নারীরা।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কর্মসংস্থান এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে দেশে ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এক সময় যৌথ পরিবারের সংখ্যা বেশি থাকলেও নগরায়ণ, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণে এখন একক পরিবার বাড়ছে। ভাঙনে এগিয়ে ঢাকা। আর পরিবারের বন্ধন দৃঢ় বেশি সিলেটে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ কারণে বিচ্ছেদের মাত্রা ভয়ানক আকারে বেড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে নারীর স্বাবলম্বী হওয়া এবং শিক্ষা, সহনশীলতা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতার অভাব, যৌথ পরিবারের অবসান, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে আসক্তি, পরকীয়া সংক্রান্ত সন্দেহ বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বিগত এক দশকে দেশে পারিবারিক কলহ ভয়ানক আকারে বেড়েছে। দেশের গড় পারিবারিক আকার বা খানার আকার ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছে। ৮১ সালে প্রতি পরিবারে গড় সদস্য সংখ্যা ছিল ৫.৭৫ জন। ১১ সালে সদস্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪.৪৬ জনে। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে গড় খানার আকার মাত্র ৪.২৬ জন। এতে স্পষ্ট যে, সমাজে এখন মূলত বাবা-মা ও দুই সন্তানভিত্তিক একক পরিবারেরই পূর্ণ আধিপত্য, যেখানে যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।
সাম্প্রতিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাতে এগিয়ে আছেন নারীরা। অন্য দিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে তালাকের আবেদনগুলোর প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, শহরের তুলনায় বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে তালাকের হার বেশি। গ্রামে প্রতি হাজারে ১.১ জন এবং শহরে ০.৯ জন তালাকের শিকার। অপর দিকে ঢাকার পরিস্থিতি উদ্বেগ জনক। একক শহর হিসেবে রাজধানীতে বিচ্ছেদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ঢাকায় গড়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একটি তালাকের আবেদন জমা পড়ছে।
অন্য দিকে একক পরিবারের বিষয়ে ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এক দশকের সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২২ সাল থেকে তালাকের হার এক লাফে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। ২০১৫ থেকে ২০২১ পর্যন্ত তালাকের হার গড়ে প্রতি হাজারে ০.৬ থেকে ০.৭ জনের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়ে বিবাহবিচ্ছেদের হার এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে প্রতি হাজারে ১.৪ জনে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে সামান্য কমে এই হার দাঁড়ায় প্রতি হাজারে ১.১ জনে। ২০২৪ থেকে চলতি বছরের বর্তমানে এই হার ১.১ থেকে ১.৪-এর মধ্যে ওঠানামা করছে।
বিচ্ছেদের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, তালাক বৃদ্ধি আর পরিবারে কলহের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এর পেছনে রয়েছে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক উপাদান। যেমন নারীর স্বাবলম্বী হওয়া ও শিক্ষা। শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাধীন নারীরা এখন আর পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক বা মানসিক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করছেন না। সহনশীলতা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতার অভাব। এতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, ধৈর্য এবং আপস করার মানসিকতা দিন দিন কমছে। এ ছাড়া যৌথ পরিবারের অবসান। একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যেকোনো বিরোধে বড়দের মধ্যস্থতা বা বোঝানোর সুযোগ কমে গেছে। রয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও পরকীয়া। এতে করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে এবং বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের (পরকীয়া) হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সর্বশেষ রয়েছে মাদকাসক্তি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট। এর মাধ্যমে স্বামীর মাদকাসক্তি এবং সংসারের খরচ চালানো নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধেও অনেক বিচ্ছেদ হচ্ছে।
এ বিষয়ে সন্তানদের মধ্যে এর ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরে মনোবিজ্ঞানী ডা: নারসিস রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিশুরা। বাবা-মায়ের টানাপোড়েনে তারা একাকীত্ব, বিষণœতা ও তীব্র মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তিতে ফাটল ধরায় সমাজে অপরাধপ্রবণতা, একাকীত্ব এবং নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে।
এ থেকে উত্তোরণের বিষয়ে তিনি বলেন, এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে পারিবারিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন জরুরি। বিয়ের আগে বর-কনের মানসিক প্রস্তুতি, কাউন্সেলিং এবং যেকোনো সঙ্কটে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আগে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিষয়টি সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। একই সাথে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন।



