আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলেও বিশেষ সুবিধা নিয়ে চাকরি করেছেন নিজের সুবিধামতো পদ ও জায়গায়। আর দীর্ঘ দিনে কর্মস্থল থেকেই হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন এখন আবার রাজনৈতিক ভোল পাল্টিয়ে উত্তরবঙ্গের একটি জেলার নাম ভাঙিয়ে সেজেছেন বিএনপির সমর্থক। অথচ দুর্নীতির হাজারো প্রমাণ জনসম্মুখে প্রকাশ হওয়ার পরও নিজেকে সংশোধন না করে বরং এখন পুরো কারিগরি শিক্ষাবোর্ডকেই ডুবানোর আয়োজন করেছেন। এই অনিয়ম দুর্নীতিতে সহযোগিতা করছেন তারই অনুগত বোর্ডের সচিব মো: আল মাসুদ করিম। সম্প্রতি এসব অনিয়ম দুর্নীতির বেশ কিছু তথ্য প্রমাণও এসেছে নয়া দিগন্তের হাতে।
গত কয়েক দিনে রাজধানীর সেখানে আগারগাঁওস্থ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি অর্থের অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ। আর এসব অভিযোগে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন ও সচিব মো: আল মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট দেয়া ওই অভিযোগপত্রে বোর্ডের প্রশাসন, পরিদর্শন, সভা-সেমিনার, নিয়োগ-বদলি, প্রকল্প এবং ক্রয় কার্যক্রমে নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারি গাড়ি ও ভ্রমণভাতা ব্যবহারে প্রশ্ন
দুদকে দেয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শন, সভা ও ‘মনিটরিং’-এর নামে সরকারি গাড়ি, জ্বালানি, টিএ/ডিএসহ সরকারি সুবিধা ব্যবহার করেছেন। অভিযোগ রয়েছে তিনি কখনো কখনো এসব সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কারো সাথে কোনো পরামর্শ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি নেন না। এমনকি ঢাকার বাইরে ব্যক্তিগত বা অন্যান্য কাজে যাওয়ার সময়ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে সরকারি অর্থে ভ্রমণ ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রে সফরের উদ্দেশ্য, অনুমোদন, গাড়ির লগবুক এবং টিএ/ডিএ বিল- সব কিছু যাচাইযোগ্য নথিতে থাকার কথা। ফলে এসব গুরুতর অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দুদকে দেয়া তথ্যাদি গুরুত্বসহকারে তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
সভা-সেমিনারের নামে আত্মসাৎ
অভিযোগপত্রের আরেকটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সভা ও সেমিনারের নামে অর্থ ব্যয়। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, ‘জুম মিটিং’ বা প্রশাসনিক বৈঠক দেখিয়ে বড় অঙ্কের বিল তৈরি ও অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো সভা বাস্তবে অনুষ্ঠিত না হলেও বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবের বিরুদ্ধে। আরো গুরুতর অভিযোগ হলো, সভায় প্রকৃত উপস্থিতির চেয়ে বেশি সদস্য দেখিয়ে খাবার ও অন্যান্য ব্যয়ের বিল দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এভাবে দিনের পর দিন ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাটের বিষয়টি এর আগেও একাধিকবার নিরীক্ষা আপত্তির পর্যায়েও এসেছে।
নিয়োগ-বদলিতে ক্ষমতার অপব্যবহার
সূত্রমতে বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান ও সচিবের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পছন্দের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা পদায়নের মাধ্যমে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। বিশেষ করে বোর্ডের এক কর্মকর্তার বদলি আদেশ হওয়ার পরও তাকে বোর্ডে বহাল রাখা হয়েছে। একই পদে একাধিক কর্মকর্তা থাকার পরিস্থিতি তৈরি হলেও একজনের বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও বোর্ডের পৃথক আদেশ পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, অনানুষ্ঠানিক সুবিধা দাবি এবং বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই অনুমোদন বা বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; কারিগরি শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
প্রচারণায় আড়াই কোটি টাকা লোপাট
কারিগরি শিক্ষার প্রচারণার নামে বিভাগীয় শহরে সভা ও সেমিনার আয়োজনের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগপত্রে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়েছে, কোনো কোনো অনুষ্ঠানে প্রকৃত উপস্থিতির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লোক দেখিয়ে খাবার ও অন্যান্য খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য অনুষ্ঠানভিত্তিক অনুমোদন, অংশগ্রহণকারীর তালিকা, বিল-ভাউচার, ছবি/ভিডিও, ঠিকাদারি বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং ব্যাংক লেনদেন পরীক্ষা করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
নিম্নমানের মালামাল ক্রয়
বোর্ডের সচিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাজে নিম্নমানের কাগজ, টোনারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে সচিব ও সংশ্লিষ্ট ক্রয় কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলে বোর্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এগুলো কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের অভিযোগ নয়; বরং বোর্ডের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, নিয়োগ ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ব্যবস্থার সামগ্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কারিগরি শিক্ষা দেশের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে এমন অভিযোগ ওঠায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিন্দুমাত্র পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতে গত ৩ সেপ্টেম্বর আগারগাঁও অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর গতকাল সোমবার ফের সেখানে গিয়ে চেয়ারম্যান সাথে দেখা করতে চাইলে তার অফিস থেকে জানানো হয় তিনি (চেয়ারম্যান) দেশের বাইরে আছেন। কবে দেশে ফিরবেন জানতে চাইলে বলা হয় এটা জানি না। পরে এসে কথা বলবেন। আর গতকাল সন্ধ্যায় বোর্ডের সচিব মো: আল মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, আমি বোর্ডের মুখপাত্র না, কাজেই আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না। পরে এই প্রতিবেদক বলেন, অভিযোগটি যেহেতু আপনাকে নিয়ে কাজেই অন্য কেউ তো আর এ বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। তখন সচিব বলেন, কোনো অভিযোগ যদি দুদকে যায় তাহলে তারা সেই বিষয়ে অনুসন্ধান করতেই পারে। কাজেই দুদক আসুক বা আমাকে ডাকুক তখন দেখা যাবে। কেউ অভিযোগ করলেই তো আর সব অভিযোগ সত্য হয়ে যায় না।



