বিশেষ সংবাদদাতা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ, মিরপুরের সাবেক শিক্ষক লে. কর্নেল (অব:) দিদারের মতে, ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে এবং তালপট্টিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকার দাবি হারায়। তার অভিযোগ, তৎকালীন সরকার বিষয়টি যথেষ্ট জাতীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও সংসদীয় পর্যালোচনা ছাড়াই আন্তর্জাতিক সালিসিতে নেয়। তিনি ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, তালপট্টি ও সমুদ্রসীমা নিয়ে ১৯৭১ সাল থেকেই বিরোধ ছিল এবং আগের সরকারগুলো তা আলোচনার মাধ্যমে সামলেছে। এখন তার পরামর্শ- ২০১৪ সালের রায় ও প্রক্রিয়া নতুন করে আইনগতভাবে পর্যালোচনা, গণমাধ্যমে আলোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত ও সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় জনমত গড়ে তোলা।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে কর্নেল (অব:) দিদার এ কথা বলেন। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি হয় ২০১৪ সালের ৭ জুলাই। জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনের (আনক্লজ) আওতায় গঠিত সালিসি ট্রাইব্যুনাল ওই রায়ে দুই দেশের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ ২০০৯ সালে এ সালিসি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে রায়টিকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্য দিকে সামরিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো প্রক্রিয়া এবং এর ফলাফল নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। বিশেষ করে তালপট্টি, হরিয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা, সমুদ্রসীমার সূচনাবিন্দু এবং সালিসি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কর্নেল (অব:) দিদার।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছে- কেন এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় বিষয়ে আরো ব্যাপক বিশেষজ্ঞ মতামত, সংসদীয় আলোচনা ও জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা হয়নি; আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী ছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কৌশলগত বিষয়ে রাষ্ট্রের করণীয় কী হওয়া উচিত।
নিচে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
প্রশ্ন : ২০১৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধের রায়কে আপনি কিভাবে দেখেন?
কর্নেল (অব:) দিদার : আমার মূল্যায়ন হলো, ২০১৪ সালের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পুরো বিষয়টি বাংলাদেশে যতটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। আমার মতে, এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকা ও তালপট্টির ওপর দাবি হারিয়েছে। আমি মনে করি, বিষয়টি শুধু একটি আইনি বিরোধ হিসেবে দেখা হয়েছিল; কিন্তু এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ, ভূরাজনীতি ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত স্বার্থ জড়িত ছিল।
তাই আমার প্রশ্ন- এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিলাম? দেশের বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক আইনবিদ, সামরিক ও কূটনৈতিক মহল এবং সংসদকে কি যথেষ্টভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল?
প্রশ্ন : তবে আন্তর্জাতিক নথিতে তো দেখা যায়, ২০১৪ সালের রায়ে বাংলাদেশ বিরোধপূর্ণ সমুদ্র এলাকার একটি বড় অংশ পেয়েছিল। তাহলে আপনি কেন এটিকে বাংলাদেশের পরাজয় হিসেবে দেখছেন?
কর্নেল (অব:) দিদার : এখানে শুধু কত বর্গকিলোমিটার পাওয়া গেল, সেটি দিয়ে বিষয়টি বিচার করলে হবে না। একটি সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোন পয়েন্ট থেকে রেখা শুরু হলো, রেখাটি কোন দিকে গেল, কোন দ্বীপ বা ভূখণ্ডের প্রভাব কিভাবে বিবেচিত হলো- এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের দাবির সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পরিসর কত ছিল এবং শেষ পর্যন্ত আমরা কী পেলাম- এই তুলনাটি করা হয়নি। আমি মনে করি, তালপট্টি ও এর আশপাশের সামুদ্রিক এলাকার বিষয়টিও এ আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
তবে আমি এটাও বলব, আন্তর্জাতিক সালিসি রায়কে আবেগ দিয়ে নয়, নথি, মানচিত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও কৌশলগত স্বার্থের আলোকে আবার পরীক্ষা করতে হবে।
প্রশ্ন : তালপট্টি নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
কর্নেল (অব:) দিদার : তালপট্টি বা ঝড়ঁঃয ঞধষঢ়ধঃঃর/ঘবি গড়ড়ৎব নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। দ্বীপটি স্থায়ী ভূখণ্ড হিসেবে টিকে থাকেনি; এটি পরে সমুদ্রের পানিতে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীপটির অবস্থান ও এর আশপাশের সমুদ্রসীমা নিয়ে দুই দেশের দাবি ছিল।
আমার বক্তব্য হলো, তালপট্টির প্রশ্নকে কখনোই বিচ্ছিন্ন একটি ছোট দ্বীপের প্রশ্ন হিসেবে দেখা উচিত ছিল না। এর সাথে সংশ্লিষ্ট সমুদ্রসীমা ও সামুদ্রিক সম্পদের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তালপট্টির ঐতিহাসিক অবস্থান, হরিয়াভাঙ্গা নদীর প্রবাহ, তৎকালীন মানচিত্র, সীমান্তের ইতিহাস এবং সামুদ্রিক অধিকারের মধ্যে সম্পর্ক কতটা শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা হয়েছিল- এটি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : ১৯৪৭ সালের সীমান্ত নির্ধারণের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়?
কর্নেল (অব:) দিদার : ১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ কমিশনের মাধ্যমে ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্থলসীমা নির্ধারিত হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে সেই সীমারেখা হরিয়াভাঙ্গা নদীর মোহনার কাছাকাছি গিয়ে শেষ হয়। সমুদ্রের দিকে এই সীমারেখা কিভাবে সম্প্রসারিত হবে, সেটিই পরবর্তী সময়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ও ভারত এই সূচনাবিন্দু ও সেখান থেকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল। আমার মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তৎকালীন সীমান্তের ইতিহাস এবং সমুদ্রের দিকে তার যৌক্তিক সম্প্রসারণ- এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার ছিল।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাথে ভারতের মূল মতপার্থক্য কোথায় ছিল?
কর্নেল (অব:) দিদার : একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল সমুদ্রসীমার স্থলসীমা-সমাপ্তি বিন্দু বা ষধহফ নড়ঁহফধৎু ঃবৎসরহঁং কোথায় হবে। সেখান থেকেই পরবর্তী সামুদ্রিক সীমানার রেখা নির্ধারণের প্রশ্ন আসে। বাংলাদেশ মনে করেছিল, হরিয়াভাঙ্গা নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় সূচনাবিন্দু আরো পূর্ব দিকে হওয়া উচিত। ভারত ভিন্ন অবস্থান নেয়।
এখানে একটি ছোট ভৌগোলিক বিন্দু পরবর্তী বিশাল সামুদ্রিক এলাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিন্দুটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ কেন শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সালিসিতে গেল?
কর্নেল (অব:) দিদার : এটিই আমার অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। ১৯৭০-এর দশক থেকেই দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিয়ে আলোচনা চলছিল। দীর্ঘদিন আলোচনায় সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থায় যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাওয়ার আগে রাষ্ট্রের উচিত ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের জাতীয় প্রস্তুতি নেয়া।
আমার মতে, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স করা যেত। আন্তর্জাতিক আইনবিদ, সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, নৌবাহিনীর কর্মকর্তা, কূটনীতিক, ইতিহাসবিদ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নেয়া যেত।
প্রশ্ন : আপনার অভিযোগ, সরকার বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যথেষ্ট আলোচনা করেনি। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
কর্নেল (অব:) দিদার : কারণ এটি কোনো সাধারণ দ্বিপক্ষীয় বিষয় ছিল না। এটি দেশের সমুদ্রসীমা, সম্পদ ও নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি সরকার হয়তো একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা, সংসদে আলোচনা করা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া প্রয়োজন।
আমার প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের মানুষ কি জানত, আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার আগে আমাদের প্রধান দাবি কী ছিল? ভারতের দাবি কী ছিল? কোন মানচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে? কোন আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করা হবে? আমাদের আইনজীবীরা কী যুক্তি উপস্থাপন করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানা উচিত ছিল।
প্রশ্ন : আপনি আন্তর্জাতিক সালিসি ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আপনার আপত্তি কী?
কর্নেল (অব:) দিদার : আমার বক্তব্য হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মানের হওয়া উচিত ছিল। কোনো রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ যখন প্রশ্নের মুখে, তখন আইনগত প্রতিনিধিত্বে কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। আমি মনে করি, শুধু আইনজীবী নিয়োগ করলেই হবে না। তাদের সাথে বাংলাদেশের সামরিক, কূটনৈতিক, ভূতাত্ত্বিক ও সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় থাকতে হবে।
আমাদের দেখতে হবে- মামলার প্রস্তুতির সময় কী ধরনের দলিল ব্যবহার করা হয়েছিল, কোন যুক্তি অগ্রাধিকার পেয়েছিল এবং কোন যুক্তি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
প্রশ্ন : আপনি ট্রাইব্যুনালের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত বলবেন?
কর্নেল (অব:) দিদার : আমার কাছে প্রশ্ন হলো, ট্রাইব্যুনালের গঠন এবং সেখানে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি আমরা কতটা কৌশলগতভাবে বিবেচনা করেছিলাম। আমি দাবি করছি না যে কোনো বিচারক কোনো দেশের পক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত দেন। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিচারকদের নিরপেক্ষ থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন এমন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় যায়, তখন তাকে পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি দিক সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন হতে হয়।
তাই ট্রাইব্যুনালের গঠন, বিচারকদের ভূমিকা, আইনগত প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের কৌশল- সব কিছুই এখন গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : তাহলে কি আপনি মনে করেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তই ভুল করেছিল?
কর্নেল (অব:) দিদার : আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাওয়ার বিষয়টি ভুল- এ কথা বলছি না। প্রশ্ন হলো, কখন, কী প্রস্তুতি নিয়ে এবং কী কৌশলে যাওয়া হয়েছিল। যদি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সালিসিতে যাওয়া প্রয়োজন হয়, তাহলে অবশ্যই যেতে হবে। কিন্তু তার আগে জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
একটি রাষ্ট্রকে শুধু মামলা জিততে হয় না; তাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থও নিশ্চিত করতে হয়।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছিল?
কর্নেল (অব:) দিদার : এটি আমার রাজনৈতিক মূল্যায়ন। আমার মনে হয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। শেখ হাসিনার ‘আমি ভারতকে এত কিছু দিয়েছি’- এই বহুল আলোচিত বক্তব্যের সাথে আমি বৃহত্তর নীতিগত প্রবণতার একটি সম্পর্ক দেখি।
তবে কোনো সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। তাই আমি চাই, এ বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয় নথি, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক যোগাযোগ, আইনগত প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ ও গবেষণা করা হোক। তাহলেই জনগণ প্রকৃত চিত্র জানতে পারবে।
প্রশ্ন : তাহলে আপনার মতে, ২০১৪ সালের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন করে তদন্ত হওয়া উচিত?
কর্নেল (অব:) দিদার : অন্তত একটি স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক পর্যালোচনা হওয়া উচিত। তদন্ত শব্দটি রাজনৈতিক অর্থে না নিয়ে আমি বলব- একটি জাতীয় রিভিউ কমিশন করা যেতে পারে। সেখানে আন্তর্জাতিক আইনবিদ, অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক, নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, মানচিত্র বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের রাখা যেতে পারে।
কমিশন দেখবে- বাংলাদেশ কী দাবি করেছিল, কী প্রমাণ দিয়েছিল, কোন যুক্তি দিয়েছিল এবং ট্রাইব্যুনাল কোন যুক্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে অন্তত ভবিষ্যতের জন্য আমরা শিক্ষা নিতে পারব।
প্রশ্ন : এখন কি ২০১৪ সালের রায় বাতিল বা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ আছে?
কর্নেল (অব:) দিদার : বিষয়টি আইনগতভাবে অত্যন্ত জটিল। একটি আন্তর্জাতিক সালিসি রায়কে সাধারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না। তাই প্রথম কাজ হলো আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ আইনগত পর্যালোচনা করা।
রায়ের মধ্যে কোনো পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, নতুন কোনো তথ্য বা আইনগত ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে কি না- এসব বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা করতে হবে।
আমার বক্তব্য হলো, বিষয়টি চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার আগে অন্তত আমাদের জানা দরকার, আইনগতভাবে আর কোনো পথ খোলা আছে কি না।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সমুদ্রনীতি কেমন হওয়া উচিত?
কর্নেল (অব:) দিদার : বাংলাদেশকে সমুদ্রকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করতে হবে। বঙ্গোপসাগর শুধু মাছ ধরার জায়গা নয়। এর সাথে জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, বন্দর, নৌ নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ, সামুদ্রিক পরিবহন এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা জড়িত।
আমাদের নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, সমুদ্রবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সামুদ্রিক আইন ও সমুদ্রসীমা বিষয়ে একটি স্থায়ী জাতীয় বিশেষজ্ঞ কাঠামো থাকা প্রয়োজন। কোনো সরকার পরিবর্তন হলে যাতে রাষ্ট্রীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা হারিয়ে না যায়।
প্রশ্ন : এ বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
কর্নেল (অব:) দিদার : গণমাধ্যমের বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু শুধু ‘বাংলাদেশ জিতেছে’ বা ‘বাংলাদেশ হেরেছে’- এ ধরনের শিরোনামে বিষয়টি শেষ করা যাবে না। মানচিত্র দেখাতে হবে। রায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাদেশের দাবি কী ছিল এবং ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত দিয়েছে- তা তুলনা করতে হবে।
এ নিয়ে অনুসন্ধানী সিরিজ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তা, আইনজীবী, কূটনীতিক, নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেয়া যেতে পারে। জনগণকে তথ্য জানানোই গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
প্রশ্ন : আপনার মতে, সংসদের কী ভূমিকা থাকা উচিত?
কর্নেল (অব:) দিদার : জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকার- দু’পক্ষকেই বিষয়টি নিয়ে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে।
সংসদীয় কমিটি চাইলে ২০১৪ সালের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষ শুনানি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে পারে। প্রয়োজন হলে রায়ের আইনগত বিশ্লেষণ সংসদে উপস্থাপন করা যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি রাষ্ট্রীয় অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন : আপনার বক্তব্যে গণভোটের কথাও এসেছে। কেন?
কর্নেল (অব:) দিদার : গণভোট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিষয়। আমি এটিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি না। প্রথমে তথ্য, আইন ও ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন। তবে কোনো পর্যায়ে যদি মনে হয়, অতীতের কোনো জাতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের সরাসরি মতামত প্রয়োজন, তখন সেই প্রশ্ন আলোচনায় আসতে পারে।
আমার মূল বক্তব্য হলো- বাংলাদেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে জাতীয় স্বার্থের বড় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত আপনি বাংলাদেশের জন্য কী করণীয় মনে করেন?
কর্নেল (অব:) দিদার : প্রথম কাজ- ২০১৪ সালের পুরো প্রক্রিয়ার একটি নিরপেক্ষ জাতীয় পর্যালোচনা। দ্বিতীয়ত; রায়ের আইনগত ভিত্তি নতুন করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করা। তৃতীয়ত; তালপট্টি, হরিয়াভাঙ্গা নদী, স্থলসীমার শেষ বিন্দু এবং সমুদ্রসীমার সূচনাবিন্দু নিয়ে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নথি আবার পরীক্ষা করা। চতুর্থত; সংসদে আলোচনা করা। পঞ্চমত; গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা। ষষ্ঠত; ভবিষ্যতে ভারতের সাথে যেকোনো কৌশলগত আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য নিশ্চিত করা।
আমি মনে করি, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুল আবারো হতে পারে।
প্রশ্ন : আপনার মতে, এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কী?
কর্নেল (অব:) দিদার : সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- ভূখণ্ড ও সমুদ্রসীমার প্রশ্নে কোনো সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটি রাষ্ট্রের বিষয়, সরকারের নয়। সরকার আসবে-যাবে। কিন্তু দেশের সমুদ্র, নদী, সীমান্ত ও প্রাকৃতিক সম্পদ থাকবে। তাই এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রাখতে হবে।
আমরা যদি ২০১৪ সালের বিষয়টি নিয়ে সত্যিই শিক্ষা নিতে চাই, তাহলে আবেগ বা দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে নথি ও আইনের ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করতে হবে। তালপট্টি নিয়ে আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো- বঙ্গোপসাগরের প্রতিটি ইঞ্চি সমুদ্রসীমা, প্রতিটি সামুদ্রিক সম্পদ এবং প্রতিটি কৌশলগত সুযোগ সম্পর্কে রাষ্ট্রকে প্রস্তুত রাখা।



