বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার আগে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ

সোনালী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক

নিদের্শনায় বলা হয়েছে- ঋণ দেয়ার আগে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ব্যবসার কার্যকারিতা, খাত নির্বাচন, একই গ্রুপে মোট ঋণ এবং প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু জামানতের ওপর নির্ভর না করে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। কারণ দুর্বল যাচাই ও নজরদারির মাধ্যমে দেয়া ঋণই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়ে ব্যাংকের মূলধন ও মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে সর্ববৃহৎ ব্যাংক সোনালী ব্যাংককে বড় অঙ্কের ঋণ দেয়ার আগে যাচাই-বাছাই আরো কঠোর করার নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। নিদের্শনায় বলা হয়েছে- ঋণ দেয়ার আগে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ব্যবসার কার্যকারিতা, খাত নির্বাচন, একই গ্রুপে মোট ঋণ এবং প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে হবে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে শুধু জামানতের ওপর নির্ভর না করে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। কারণ দুর্বল যাচাই ও নজরদারির মাধ্যমে দেয়া ঋণই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়ে ব্যাংকের মূলধন ও মুনাফায় চাপ সৃষ্টি করে।

সোনালী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের সাথে গত সপ্তাহে এক বৈঠকের আয়োজন করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এই বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এসব বিষয়ে নিদের্শনা দেন বলে জানা গেছে। রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সাথে ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথমটি হয়েছে সোনালী ব্যাংককে নিয়ে। ব্যাংকের আর্থিক ও পরিচালন অবস্থা, সাম্প্রতিক অগ্রগতি, সমস্যা, ঝুঁকি, সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা নিয়ে সরকার, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে মতবিনিময় হয়।

আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসে খেলাপি ও হিসাব থেকে বাদ দেয়া ঋণ থেকে নগদ আদায় বাড়ানো, অগ্রিম-আমানত অনুপাত যৌক্তিকপর্যায়ে নেয়া, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয় দক্ষতা ও সুশাসন শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণ লক্ষ্য নির্ধারণের বদলে পরিমাপযোগ্য মাইলফলক ঠিক করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব সমস্যা সমাধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা অন্য সরকারি সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন, সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, আলোচনায় প্রথমেই ওঠে আসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বিষয়টি। এখানে বলা হয়, কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হয়। কিন্তু নগদ আদায়ে জোর দেয়া হয় না। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। রাষ্ট্র-মালিকানাধীন অন্য ব্যাংকের তুলনায় এ হার কম হলেও সুস্থ ও দক্ষ ব্যাংকের মানদণ্ডে তা এখনো বেশি। তাই নতুন খেলাপি ঋণ ঠেকানোর পাশাপাশি পুরনো ও বড় খেলাপি ঋণ এবং হিসাব থেকে বাদ দেয়া ঋণ থেকে বাস্তবে কত টাকা আদায় হচ্ছে, সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা যেন ঋণ দীর্ঘায়িত বা এভারগ্রিনিংয়ের আরেকটি পথ না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অন্য রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকের তুলনায় কম হলেও বৈঠকে শুধু এই তুলনায় সন্তুষ্ট না হওয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, উচিত খেলাপি ঋণকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনা। এ জন্য নতুন খেলাপি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুরনো খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায়, বড় খেলাপিদের জন্য ঋণগ্রহীতাভিত্তিক আদায় কৌশল এবং ঋণ হিসাব থেকে বাদ দেয়া ঋণ থেকে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বলা হয়,পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, ‘এক্সিট’ সুবিধা কিংবা ঋণ হিসাব থেকে বাদ দেয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাবের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু ঋণের টাকা বাস্তবে ফেরত না এলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ে না। এ কারণেই হিসাবের খাতায় খেলাপি কমানোর বদলে নগদ আদায়কে মূল সূচক হিসেবে দেখতে বলা হয়েছে।

শ্রেণিকৃত ঋণ আদায় ও সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ সুবিধার আওতায় সোনালী ব্যাংকের কতসংখ্যক ও কী ধরনের ঋণ আসতে পারে, কত আবেদন পাওয়া গেছে এবং কতগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে এসব তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আইনগত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং সুবিধাটি আরো কার্যকর করার বিষয়ে ব্যাংকের প্রস্তাবও চাওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য, কোনোভাবেই অযৌক্তিক ছাড় দিয়ে ঋণকে দীর্ঘায়িত না করে প্রকৃত নিষ্পত্তি ও নগদ আদায় নিশ্চিত করা।

সূত্র জানায়, বৈঠকে সোনালী ব্যাংকে আমানত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, এই ব্যাংকের আমানত বাড়ছে ঋণের তুলনায় দ্রুত। ফলে রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংকটির অগ্রিম-আমানত অনুপাত সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এতে তারল্য সক্ষমতা শক্তিশালী থাকলেও বিপুল স্বল্পব্যয়ের আমানত কতটা দক্ষতার সাথে উৎপাদনশীল সম্পদে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে প্রশ্ন রয়েছে। সিএএসএ আমানতকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদ, লাভজনক ও উৎপাদনশীল খাতে যৌক্তিক ঋণ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে লক্ষ্য বেশি ঋণ নয়, মানসম্পন্ন ঋণ।

উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও কুটির শিল্প, কৃষি, নারী ও নতুন উদ্যোক্তা এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে সোনালী ব্যাংকের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর গড়ের তুলনায় কম। ব্যাংকের বড় শাখা নেটওয়ার্ক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে এই ঘাটতি পূরণের তাগিদ দেয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সোনালী ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও শুধু মুনাফার অঙ্ক দিয়ে ব্যাংকের শক্তি বিচার না করে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে আয়, সংস্থান রাখার পর বিনিয়োগের আয় এবং সম্পদ ও শাখা নেটওয়ার্কের তুলনায় দক্ষতা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। একই সাথে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে লেনদেন ব্যয় কমানো ও গ্রাহকসেবা উন্নত করার সুযোগ কাজে লাগাতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের পাশাপাশি কার্যপ্রক্রিয়া, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন ব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।