নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান ও নিরাপদে ফিরে পেতে স্বজনদের আর্তি

Printed Edition
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নিখোঁজ শিশুদের অভিভাবকরা সংবাদ সম্মেলন করেন : নয়া দিগন্ত
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নিখোঁজ শিশুদের অভিভাবকরা সংবাদ সম্মেলন করেন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের সদস্যরা।

গতকাল রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘আমার সন্তান কোথায়?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের উদ্যোগে এবং জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এ দিকে পুলিশ সদর দফতরের জানুয়ারি-জুলাই ২০২৬-এর যাচাইকৃত তথ্যে দেখা যায়, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ২৪৩ জন শিশু-কিশোর নিখোঁজ হওয়ার জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হলেও এক হাজার ৯৭০ জন তখনো নিখোঁজ ছিল। একই সময়ে ০-৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪৭৪টি জিডির বিপরীতে ৪০৬ জন উদ্ধার এবং ৬৮ জনের সন্ধান মেলেনি। সব বয়স মিলিয়ে ১৫ হাজার ৭১৭ জন নিখোঁজের মধ্যে দুই হাজার ৩৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি- অর্থাৎ প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তখনো অমীমাংসিত অবস্থায় ছিল।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ বলছে, অনলাইন জিডি ব্যবস্থা চালুর পর নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ সংখ্যাবৃদ্ধির একটি অংশ বাস্তবে নিখোঁজের ঘটনা বাড়ার কারণে হলেও, অন্য একটি অংশ হতে পারে রিপোর্টিং সহজ হওয়ার ফল। ফলে শুধু জিডির সংখ্যা দিয়ে শিশু নিখোঁজের প্রবণতা বিচার না করে- কতজন উদ্ধার হলো, কতজন দীর্ঘমেয়াদি নিখোঁজ রইল, কতটি ঘটনায় অপহরণ বা পাচারের প্রমাণ মিলল- এসব সূচকও বিবেচনায় নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মো: সাদাত রহমানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। তাদের অনেকের সন্তান মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যরা সন্তান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিবারগুলো এক দিকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, অন্য দিকে অনেক নিখোঁজের ঘটনা অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে সিলেটে শিশু মুনতাহা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের পর নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে অ্যাম্বার অ্যালার্ট ব্যবস্থা চালুর দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের সহযোগিতায় ‘মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন’ বা ‘মুন অ্যালার্ট’ এবং টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯-এর কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে এটি দেশব্যাপী শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও উদ্ধারে সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।

সংবাদ সম্মেলনে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ হাজার ৫০০টিতে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি দায়ের হয়েছে বলেও জানানো হয়। বর্তমানে দুই হাজার ৩৮ জন শিশু নিখোঁজ বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

বক্তারা বলেন, এসব তথ্য শুধু সাম্প্রতিক কয়েক বছরের চিত্র। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশু নিখোঁজ, অপহরণ ও পাচারের ঘটনা ঘটছে। এর অনেক ঘটনাই এখনো অমীমাংসিত। তাই নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

নিখোঁজ মানেই শুধু অপহরণ নয়

শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির প্রকৃত চিত্র আড়াল হতে পারে। পুলিশের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সাথে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে হারিয়ে যাওয়া, নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা অথবা বাড়ি ফেরার পথে অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। অন্য দিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে থাকার আকাক্সক্ষা, অর্থের প্রয়োজন কিংবা কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর ভয় থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো কারণও রয়েছে।

এই বয়সভিত্তিক পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ছোট শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর যে ধরনের তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান প্রয়োজন, কিশোর-কিশোরীর ক্ষেত্রে তার সাথে যুক্ত করতে হয় পরিবার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বন্ধুমহল ও অনলাইন যোগাযোগের তদন্ত।

কেস স্টাডি-১ : মুনতাহা- ‘গোল্ডেন টাইম’ হারানোর ভয়াবহ পরিণতি

সিলেটের কানাইঘাটের শিশু মুনতাহা আক্তার জারিনের ঘটনা নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টার গুরুত্ব সবচেয়ে নির্মমভাবে সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর বিকেলে প্রতিবেশী শিশুদের সাথে খেলতে বের হওয়ার পর পাঁচ/ছয় বছর বয়সী মুনতাহার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবার ও স্থানীয়রা ব্যাপকভাবে খোঁজাখুঁজি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে।

পরে সাত দিন পর বাড়ির কাছাকাছি একটি জলাশয় থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছিল এবং লাশ গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে আটক/গ্রেফতার করা হয়।

মুনতাহার ঘটনাপরবর্তী সময়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে- কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার সাথে সাথে যদি তার ছবি, পোশাক, শেষ অবস্থান ও সম্ভাব্য গতিপথ দ্রুত পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া যেত, তাহলে কি পরিণতি বদলানো সম্ভব ছিল?

এই প্রশ্ন থেকেই ‘মুন অ্যালার্ট’-এর ধারণাটি শক্তিশালী হয়।

কেস স্টাডি-২ : ২৩ ঘণ্টায় মুসকানকে উদ্ধার

মুন অ্যালার্টের কার্যকারিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি হলো মুসকান নামের এক শিশুকে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুন অ্যালার্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশুটিকে ২৩ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়। এই ঘটনা দেখিয়েছে, নিখোঁজ শিশুর ছবি ও পরিচয় দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছালে সাধারণ নাগরিকরাও অনুসন্ধানের অংশ হয়ে উঠতে পারেন।

এখানে মূল শিক্ষা হলো- নিখোঁজ শিশুকে খোঁজার কাজ কেবল থানার তদন্ত কর্মকর্তা বা পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভর করলে সময় নষ্ট হতে পারে; বরং পুলিশ+গণমাধ্যম+সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম+স্থানীয় মানুষ+প্রযুক্তি- এই পাঁচটি স্তর একসাথে কাজ করলে উদ্ধার তৎপরতার পরিধি বহু গুণ বাড়ে।

কেস স্টাডি-৩ : ঢাকার আবদুল্লাহ- একটি ফেসবুক নোটিফিকেশনই বদলে দিলো পরিণতি

২০২৬ সালের মে মাসে মুন অ্যালার্ট ও মেটার অংশীদারত্বের পর ঢাকায় এক শিশুকে উদ্ধারের ঘটনা প্রযুক্তিনির্ভর অ্যালার্ট ব্যবস্থার সম্ভাবনা স্পষ্ট করেছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ৯ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আল সাদিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার ছবি ও তথ্য মুন অ্যালার্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। মেটার লোকেশনভিত্তিক নোটিফিকেশন ব্যবস্থা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামে ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়। মিরপুরের একটি ফার্মেসির কর্মী নোটিফিকেশনে শিশুটির ছবি দেখে তাকে চিনতে পারেন। পরে পুলিশকে খবর দেয়া হলে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাটির তাৎপর্য আরো বেশি, কারণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- শিশুটির পরিবার প্রথমে পুলিশের কাছে গেলে জিডি গ্রহণ ও অনুসন্ধান নিয়ে জটিলতার মুখে পড়ে। পরে শিশুটির একজন শিক্ষক মুন অ্যালার্টে যোগাযোগ করেন। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে নাগরিক-প্রযুক্তি সমন্বিত একটি প্ল্যাটফর্মও কার্যকর উদ্ধার-চ্যানেল হয়ে উঠতে পারে।

কেস স্টাডি-৪ : আয়েশা- আড়াই মাস পর উদ্ধার

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১১ বছর বয়সী আয়েশা আক্তার রামিসার। সে ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট ঢাকার মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং এলাকা থেকে স্কুলে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয়। প্রায় আড়াই মাস পর নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং তদন্তে অপহরণের পরিকল্পনার তথ্য সামনে আসে।

এই ঘটনা দেখায়, নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু ২৪ ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরও উদ্ধার না হলে অনুসন্ধান যেন থেমে না যায়; বরং মামলাটি আলাদা করে ট্র্যাক করার প্রয়োজন রয়েছে।

কেস স্টাডি-৫ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফাঁদ

শিশু নিখোঁজের আরেকটি নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালে এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করে, যেখানে ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের পর নিখোঁজ হয় এবং পরে দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।

অর্থাৎ এখন শিশুর নিখোঁজ হওয়া শুধু রাস্তা, বাজার, স্কুল কিংবা বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক নয়। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও সম্ভাব্য ঝুঁকির ক্ষেত্র।