আগামী নির্বাচনে বিতর্কিতদের প্রার্থী করবে না বিএনপি। দলটি ইতোমধ্যে প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একটি টিম আসনভিত্তিক সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়নের কাজ করছে। কোনো প্রার্থীর কী কারণে বিজয়ের কিংবা পরাজয়ের সম্ভাবনা বেশি তা খোঁজ নেয়া হচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাস প্রার্থিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেয়া হবে। নির্বাচনে গুরুত্ব পাবে ক্লিন ইমেজধারীরা। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে ১০০ আসনে দলটির প্রার্থিতায় নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। গত বছরের ৫ আগস্ট বিপ্লবোত্তর ‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ ও ‘জনগণের পালস’ বিবেচনা করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবে বিএনপি।
চূড়ান্ত রোডম্যাপ এখনো ঘোষিত না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারণা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতিটি দলই এখন নির্বাচনমুখী তৎপরতায় সম্পৃক্ত হয়েছে। বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো আসনভিত্তিক কাজ শুরু করেছে। দুই-একটি দল ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা করেছে এবং সে অনুযায়ী নির্বাচনের মাঠে কাজও শুরু করেছে। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তৎপরতা শুরু না করলেও গত ফেব্রুয়ারিতে দলের বর্ধিত সভা থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল নেতাদের নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
জানা গেছে, নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করবে দলটি। তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে গ্রিন সিগন্যাল না দিলেও দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বসে নেই। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই নির্বাচনী এলাকায় যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, গণসংযোগের মধ্যে রয়েছেন তারা। দলের যেসব নির্দেশনা রয়েছে তা মেনে মাঠে কাজ করছেন। শোডাউনের রাজনীতি না করলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে রমজানজুড়ে এলাকায় ইফতার মাহফিল করেছেন, ঈদুল ফিতরও উদযাপন করেছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দলের হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যস্ত আছেন।
২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে তখনকার বাস্তবতা বিবেচনায় বিএনপি প্রতিটি আসনে প্রাথমিকভাবে তিন-চারজনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। কারণ বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে দাঁড়াতে দেয়া হবে কি হবে না, দল তখন এমন একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিল। তাই প্রথম প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলে দ্বিতীয়জন নির্বাচন করবেন; দ্বিতীয়জনের প্রার্থিতা বাতিল হলে, পরেরজন নির্বাচন করবেন- এমন চিন্তাভাবনা থেকে দলীয় কৌশলের অংশ হিসেবে তখন এমনটা করা হয়েছিল। দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এমন কিছু ঘটবে না। দলীয়ভাবে একজনকেই মনোনয়ন দেয়া হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তার একটি টিম কাজ করছে। দলটি আসনভিত্তিক জরিপও চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আসনভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্ভাবনা কতটুকু, দলীয় অবস্থান কেমন এসব বিষয় জরিপে তুলে আনা হবে। বিএনপির দায়িত্বশীল একজন নেতা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আগামী নির্বাচনে স্বচ্ছ ইমেজধারী প্রার্থীদের গুরুত্ব দেবেন। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তিনি এমন চিন্তা করছেন। ওই নেতা জানান, আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে ১০০ আসনে নতুন তরুণ মুখ দেখা যেতে পারে।
জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে দল কোনো ধরনের গ্রুপিং বরদাশত করবে না। একইসাথে যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলদারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও মনোনয়ন দেবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ইতোমধ্যে দলের এমন কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। এতে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বিএনপি মনে করছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন খুব সহজ হবে না। নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার, প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির। নেতারা বলছেন, বিএনপির জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের ঘায়েল করার জন্যই এটা করা হচ্ছে। তাদের আশা, গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির যে ত্যাগ, দেশের মানুষ সেটা ভুলে যায়নি। আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা যে হামলা-মামলা, গুম-খুনের শিকার হয়েছে- তাদের এই সংগ্রাম, ত্যাগের কথা বিবেচনা করে গণতন্ত্রে উত্তোরণের পথে জনগণ বিএনপিকেই বেছে নিবে। ফলে দলটি আশাবাদী, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারা আগামীতে সরকার গঠন করবে। যদিও বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাপর দলগুলোকেও সমীহ করছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে আন্দোলনের শরিকদের সাথে নেয়ার পাশাপাশি জোটে নতুন একাধিক রাজনৈতিক দলও যুক্ত হতে পারে। নির্বাচনের এক দুই মাস আগে সেই তৎপরতা শুরু হতে পারে। এক্ষেত্রে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রদের নেতৃত্বে সদ্য আত্মপ্রকাশকৃত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আরো একাধিক ইসলামী দলকে নির্বাচনী জোটে আনতে পারে দলটি। নির্বাচনী সমঝোতা হলে নতুন এই দলগুলোকে কিছু আসনে ছাড় দেয়ার চিন্তাভাবনাও রয়েছে বিএনপির। এর কারণ হিসেবে দলটির সিনিয়র এক নেতা বলেন, বিএনপি আগামীতে একটি প্রাণবন্ত, কার্যকর ও শক্তিশালী সংসদ চায়। বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, নির্বাচনে বিজয়ী হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করবে। সেই জাতীয় সরকার বাংলাদেশে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। অতীতে জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে এই দলটি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। সুতরাং নির্বাচনের জন্য বিএনপির সব সময় প্রস্তুতি থাকে। সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হবে।



