গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত বিএনপির সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে চলল। এই সময় একটি সরকারের সাফল্য ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয় বললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার কোন পথে হাঁটছে, কোন প্রতিশ্রুতি কার্যকর নীতিতে পরিণত হয়েছে এবং কোথায় পুরনো রাষ্ট্রচর্চা ফিরে আসছে, তা যাচাই করার জন্য যথেষ্ট। তারা বলছেন, চলমান পর্যবেক্ষণে চারটি অবস্থা ব্যবহার করা য়ায়, যেগুলো হলো অগ্রগতি, আংশিক, স্থবির এবং উল্টো পথে। এ ছাড়া সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সম্প্রতি দেয়া একটি বক্তব্যকেও সরকারের ছয় মাসের সফলতা ব্যর্থতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনায় আনা হচ্ছে। তিনি রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যম, জনসম্পৃক্ততা, নাগরিকবান্ধব চিন্তা, আন্তরিকতা, সততা ও অনেক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দুঃখজনকভাবে অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশিত দক্ষতা দেখাতে পারেননি। কারো অতিকথন, কারো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, কারো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বারবার সরকারের ভাবমর্যাদা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অথচ এসব ব্যর্থতার পরও দৃশ্যমান জবাবদিহি বা কার্যকর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তীতে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় যেসব বিষয় ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল গণভোটের রায় মেনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সরকার বলেছে, জুলাই জাতীয় সনদ ‘অক্ষরে ও চেতনায়’ বাস্তবায়ন করা হবে। অথচ ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় মানবাধিকার, বিচারিক নজরদারি, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা ও পুলিশ সংস্কারসংক্রান্ত অন্তত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে অথবা সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতির বর্তমান অবস্থা উল্টো পথে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদে বাজেট পেশ, অধ্যাদেশ পর্যালোচনা এবং নীতিগত বিতর্কের সাংবিধানিক মঞ্চ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারকে কতটা প্রশ্ন করা যাচ্ছে, কমিটির নেতৃত্বে বিরোধী দলের ভূমিকা কতটা এবং সরকারি দলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে- সেটিই আসল পরীক্ষা। জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বিরোধী দল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নিয়োগ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ছিল ক্ষমতার ভারসাম্যের উপায়। এগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংসদ নির্বাচিত হলেও তার জবাবদিহিমূলক শক্তি অসম্পূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ছয় মাসের সংসদকে সেভাবে কার্যকর করা যায়নি বলে মনে করছেন অনেকেই।
সূত্র মতে, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় ও বিকেন্দ্রীকরণের মতো পদক্ষেপ দীর্ঘ দিনের দাবি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি জুলাই সনদেও গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু বিচারিক নিয়োগ ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের পরিমাপযোগ্য পূর্ণ ফল এখনো প্রকাশ্য নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশার একটি ছিল পুলিশকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে নাগরিকমুখী ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী করা। কিন্তু পুলিশ কমিশনের কাঠামো নিয়ে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, সেখানে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাতন্ত্রের প্রভাব বহাল রাখার সুযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অভিযুক্ত বা বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও দেখিয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় ‘মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রধান মানদণ্ড করার ঘোষণা দেয়া হলেও বদলি-পদোন্নতির ক্ষেত্রে আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো দলীয় আনুগত্য নতুন করে ফিরে আসছে বলে অভিযোগ উঠছে।
এ ছাড়া সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে জরুরি সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলেছে। বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরে এসেছে বলা যাবে না। কর্মসংস্থান বাড়েনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গণমাধ্যমে পুরনো নিয়ন্ত্রণের ধারা ফিরে আসছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা হলো সরকার নিজের সমালোচনা কতটা সহ্য করে। অথচ গত ছয় মাসে সমালোচনা সহ্য করার মতো ইতিবাচক ভূমিকায় সরকারকে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন অনেকেই।
বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডকে আওয়ামী লীগের শাসনামলের সাথে তুলনা করছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত নেতাদের মতে, বিএনপি আওয়ামী লীগের স্টাইলে পুরনো ‘ফ্যাসিবাদী’ কায়দায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। দ্বিমত পোষণের অধিকার হরণে আওয়ামী লীগকে অনুসরণ করছে তারা। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু কুক্ষিগত করছে। নির্বাচন না দিয়ে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সবকিছু লুটেপুটে খাচ্ছে। খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমাবেশে জামায়াত আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, মনে হচ্ছে নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানাতে আরেকটা অনিবার্য বিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। সিলেটের সমাবেশে তিনি বলেন, হাসিনাকে তাড়িয়েছি, যদি ফ্যাসিবাদ আপনারা কায়েম করেন, জনগণ আপনাদেরও তাড়াবে। আপনাদেরকেও জনগণ ছেড়ে দিয়ে কথা বলবে না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি গণভোটের গণরায় অস্বীকার করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। তারা জনগণের যে প্রত্যাশা ও অধিকার তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। সব জায়গাতে দলীয়করণে ইতিহাসের সব রেকর্ড মøান করে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য দিন দিন অনেক বেড়ে গেছে। আইনের শাসনের কোনো উন্নতি নেই।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর মানুষের মধ্যে একটি আশার সঞ্চার হয়েছিল, জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রায় ছয় মাসের শাসনে জনমনে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। বিশেষ করে বিরোধী মত দমনে বর্তমান সরকারও বিগত ফ্যাসিবাদের পথ অনুসরণ করছে।
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, গত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) ব্যবহার করে মানুষের কথা বলার অধিকার হরণ করেছিল। বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটা শুরু করেছে। গণভোটে জন্ম নেয়া বিএনপি গণভোটকেই অস্বীকার করছে। এত কম সময়ে আর কোনো সরকার এত অজনপ্রিয় হয়নি।
এ দিকে ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। একই সাথে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাস্তবায়িত উদ্যোগ, নীতিগত সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার মূল্যায়নও তুলে ধরা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারি দল বলছে, বিরোধী দল সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম দেখছে না। তারা সমালোচনার জন্যই সমালোচনা করছে। একই সাথে তাদের আচরণকে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথেও তুলনা করছেন। তারা বলছেন, সরকার দায়িত্ব নিয়েই বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে- যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এরমধ্যে ভোটের কালি না শুকাতেই ১৯ দিনের মাথায় পরিবারের নারী প্রধানকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা ভাতার ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, দেশের বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্য ধর্মীয় প্রধানদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা হয়। এ ছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়। ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়। কৃষকদের সেচ সুবিধার জন্য ও জলাধার বাড়াতে দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হয় । তরুণদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে দেশব্যাপী নতুন কুঁড়ি কার্যক্রম আবার শুরু করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে স্কুল পর্যায়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট চালু করা হয়। এ ছাড়া সব শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিগত সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া কলকারখানা আবার চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম চালু করা হয়। প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মেট্রোরেল ও ট্রেন ভ্রমণে ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রাখতে পতিত শেখ হাসিনার বাসভবনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়। এ ছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২৫০টি পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
এ ছাড়া বেশ কিছু মেগাপ্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে- পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ মহাপ্রকল্প, রাজধানীর গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত দ্বিতীয় মেট্রোরেল প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সুফল পাবে জনগণ।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ বলেন, একটি সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য পাঁচ-ছয় মাস সময় যথেষ্ট নয়। তবে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে জোর দিচ্ছে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের সাজানো প্রশাসন নিয়ে কাজ করা যায় না। কারণ প্রশাসনে ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগপন্থী লোকজনই বেশি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে চাঁদাবাজি সেভাবে রোধ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আক্ষেপ করে বলেছেন, আমি সত্যিকার অর্থেই এবার যে পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম, এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে। প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। হতাশা ভর করলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন দেখছেন বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। নতুন সরকারের মেয়াদ ছয় মাস না যেতেই ব্যর্থ তকমা দেয়াকে রাজনৈতিক-সামাজিক অসহিষ্ণুতা হিসেবে মনে করছেন তিনি। অল্প সময়েই সরকারকে ব্যর্থ বলা, রাজপথে নেমে অস্থিরতা তৈরি করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, বিপুল সমর্থন ও প্রত্যাশা নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হলেও এই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা যতটা, প্রাপ্তি ততটা ঘটেনি। যদিও সরকার এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করে। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দায়ী করলেও বাস্তবতা হলো- সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল দল বদল দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় ব্যবস্থার পরিবর্তন।



