সীমান্তে কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে না এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে- ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া এমন প্রতিশ্রুতি বারবার ভঙ্গ করছে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সম্প্রতি সীমান্তে এক দিকে বন্দুকের মুখে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের মরিয়া চেষ্টা, অন্য দিকে নিরীহ বাংলাদেশীদের গুলি করে হত্যার ঘটনায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের একতরফা আগ্রাসনের কারণে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে পড়া নারী ও শিশুদের নিয়ে সেখানে চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, আইন অমান্য করে এই ধরনের পুশইন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও জেনেভা কনভেনশনের চরম লঙ্ঘন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, পুশইন ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ ও ভারতের মানবাধিকার কর্মীরা কী করছে? তারা মনে হয় পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর পুশইনের সংখ্যা হঠাৎ বাড়ার কারণ হচ্ছে ওই দেশের ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা। তাদের সমস্যা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যাদের পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে তারা ভারতের হোক বা বাংলাদেশের, সবার আগে তারা মানুষ। রাতের অন্ধকারে ভারত থেকে গহিন জঙ্গল, নদী-নালা বা বিচ্ছিন্ন এলাকা দিয়ে জোরপূর্বক এ দেশে ঠেলে দিচ্ছে, আবার গুলি করেও হত্যা করছে। তাহলে সরকার ও মানবাধিকার কর্মীরা কোথায়? ভারতের মানবাধিকার কর্মীদের সাথে সরাসরি না হলেও অনলাইনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে সমাধান করতে পারে; কিন্তু তারা করবে না। কারণ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যতক্ষণ না তাদের নির্দেশনা দেবে ততক্ষণ তারা পুতুল।
ড. ইমতিয়াজ বলেন, এখানে মূল সমস্যা হলো ট্র্যাকের। আমি বারবার বলছি- প্রথম থেকে তৃতীয় ট্র্যাক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। কারণ চোরাকারবারিরা ভারতের নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে বাংলাদেশের চোরাচালানিদের মাধ্যমে কাজ করে। এটাকি বিএসএফ দেখে না? বিএসএফ জেনেশুনেই গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। আরেকটা হলো বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, মানবাধিকারকর্মী ও মিডিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত পুশইন ও সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জোরালোভাবে প্রচার করা। যাতে ভারতের সব নাগরিক দেখেন তাদের দেশের সীমান্তরক্ষীরা কিভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং অবৈধপথে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে তারা এই অমানবিক কার্যক্রম লঙ্ঘন করছে। তাদের আইনেও কোথাও বলা নেই জোরপূর্বক ঠেলে দিয়ে আরেক দেশে পাঠিয়ে দেবে।
আলোচনার পরই নৃশংস হত্যাকাণ্ড : সবচেয়ে নির্মম ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম সীমান্তে। স্থানীয় সূত্র এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৪৬ ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় অংশে বিএসএফের লাঠিয়াপুরা ক্যাম্পের টহল দল হঠাৎ করেই সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই, আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মজিব আলী (২০) নামের এক বাংলাদেশী যুবককে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালায় বিএসএফ। গুলিবিদ্ধ হয়ে মজিব ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এরপর বিএসএফ তার লাশ ভারতীয় অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর পুরো কুলাউড়া সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আলোচনার টেবিলের পরক্ষণেই এই ধরনের হত্যাকাণ্ড বিএসএফের চরম অনমনীয় এবং আগ্রাসী মনোভাবকেই স্পষ্ট করে।
এ দিকে সীমান্তে সহিংস আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং মানবাধিকার বিশ্লেষক ড. সি আর আবরার বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে অন্য দেশের সীমান্তে ঠেলে দেয়া বা গুলি করে হত্যা করা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। কাউকে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ হলে তার বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে; কিন্তু বিএসএফ এখানে বিচারকের ভূমিকা পালন করছে, যা একধরনের রাষ্ট্রীয় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। শিশুদের বন্দুকের মুখে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে রাখা চরম অমানবিকতা।
চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় আট মাসে দুই হাজার ৪৭৯ জন মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করেছে ভারত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুশইন করা তালিকার মধ্যে ১২০ জনেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক এবং বেশ কিছু মিয়ানমারের নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর থেকে প্রমাণিত হয়, কোনো রকম সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল মুসলিম বা বাঙালি সন্দেহে এই অমানবিক বিতাড়ন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বিএসএফ।
গত বৃহস্পতিবার নয়া দিল্লি থেকে ঢাকায় আসেন বিজিবি মহাপরিচালকসহ ১৪ দলের একটি দল। বৈঠকে বিএসএফ প্রতিনিধি দলের সাথে বিজিবির প্রতিনিধি দলের সাথে পুশইন-সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় আনার জন্য সম্মত হলেও বিএফএফ সেই কথা রাখেনি। গত শুক্রবার বিএসএফ এক যুবককে গুলি করে হত্যা ও দুই জেলা দিয়ে পুশইনের চেষ্টার ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বিএসএফ কথা দিয়ে কথা রাখেনি।
গোমস্তাপুরে ১৫ জনকে পুশইন প্রতিহত বিজিবির
গোমস্তাপুর ( চাঁপাই নবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের রোকনপুর লেধা বাড়ি কেল কুচ সীমান্ত দিয়ে ১৫ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে সীমান্ত পিলার ২২০/এমপি এলাকায় বিএসএফ ১৫ জনকে (২ পুরুষ, ৮ নারী ও ৫ শিশু) নৌকায় বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। বিজিবির কঠোর অবস্থানের মুখে রাত ২টা ৪০ মিনিটে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম।
কুষ্টিয়ায় ১২ নারী-শিশুকে পুশইন চেষ্টা
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১২ জনকে বাংলাদেশে অবৈধভাবে ঠেলে দেয়ার (পুশইন) চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় প্রাগপুরের বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস সাব-পিলারসংলগ্ন শূন্যরেখায় কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বিজিবি অবৈধ পুশইন চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত ১২ জন নারী ও শিশুকে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানায়। জবাবে বিএসএফ জানায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। যাচাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করবে।
এ দিকে দিনের তীব্র গরমের পর পুরো রাত খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হওয়ায় তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো সুরাহা না হওয়ায় আটকে পড়া এই মানুষগুলো মনে চরম আতঙ্ক ও ভীতি কাজ করছে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, পতাকা বৈঠকে বিএসএফ জানিয়েছে, পুশইনের চেষ্টাকৃতদের পরিচয় যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে বিজিবি কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ মেনে নেবে না।
বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশীর লাশ পুলিশ
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত বাংলাদেশী যুবকের লাশ ২৪ ঘণ্টা পর ফেরত দিয়েছে ভারত। শুক্রবার রাত ৭টার দিকে কুলাউড়ার চাতলাপুর ল্যান্ড কাস্টমস দিয়ে দুদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি লাশ হস্তান্তর করাহয়। এর আগে গতকাল দুপুরে কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে দু’দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পতাকা বৈঠকে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী নিহতের জন্য বিজিবি তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং লাশ দ্রুত হস্তান্তরের দাবি জানায়। বাংলাদেশের পক্ষে লাশ গ্রহণ করেন কুলাউড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমান। ভারতের পক্ষে ছিলেন সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ।
মো: মুজিব আলীর (২০) বাবার নাম মো: অজিব আলী, গ্রাম-দত্তগ্রাম, ডাকঘর-নিশ্চিন্তপুর, উপজেলা-কুলাউড়া, জেলা-মৌলভীবাজার।



