- মেয়াদের ৭৮ শতাংশ শেষ, অগ্রগতি এক-চতুর্থাংশেরও কম
- চার বছরে যা হয়নি, এক বছরেই তা করার চাপ
- ৮২ সেতুর প্রকল্পে ৪৭ মাসে কাজ মাত্র ২২ শতাংশ
দুই দফায় দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজে কোনো ধরনের ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি। পুরনো ধাচেই চলছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। বরং আগের চেয়েও গতিতে আরো ঝিমুনি এসেছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২২ সালে নেয়া হয়েছিল ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (২য় পর্যায়)’ প্রকল্প। সময় ছুটছে, কিন্তু ঝিমুনিতে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। পাঁচ বছরের প্রকল্প মেয়াদের প্রায় ৭৮ শতাংশ সময় পার হলেও বাস্তবায়ন অগ্রগতি এক-চতুর্থাংশেরও কম। প্রকল্পের ৮২টি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি সংযোগ সড়ক ও নদীশাসনের কাজে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৩ বছর ১১ মাসে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। মাত্র ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরামর্শক প্রতিষ্টান রুরাল অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (রাউডো) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। রাউডো বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চার হাজার কোটি টাকার
প্রকল্প, অগ্রগতি প্রশ্নবিদ্ধ
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর বা এলজিইডি বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে নেয়া হয়। প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় চার হাজার ৫০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে এক জুলাই ২০২২ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত। ২০২২ সালে এই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয় একনেক সভা থেকে। দেশের ৮টি বিভাগের ৩৫টি জেলার ৬৮টি উপজেলায় প্রকল্পের আওতায় মোট ৮২টি সেতু নির্মাণের কথা রয়েছে। এসব সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১৭ হাজার ৬৬৭ মিটার। এর সাথে রয়েছে ৩৮ হাজার ৮০০ মিটার সংযোগ সড়ক এবং নদীশাসনের কাজ।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করা। এর ফলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, এমন প্রত্যাশা ছিল সরকারের। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতিতে সেই প্রত্যাশাই এখন প্রশ্নের মুখে।
বরাদ্দের ঘাটতিই বড় বাধা
আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম প্রধান কারণ বলা হয়েছে অর্থসঙ্কট। প্রকল্পের প্রথম চার বছরে প্রকল্প দলিল অনুযায়ী আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন ছিল তিন হাজার ৭৮ কোটি ২০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কিন্তু সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও আরএডিপির মাধ্যমে এ সময়ে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৬১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ২০ দশমিক ০১ শতাংশ। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজের গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পের শেষ বছরে বিপুল পরিমাণ কাজ একসাথে শেষ করার চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
শেষ বছরে করতে হবে
প্রায় ৭৮ শতাংশ কাজ
রাউডোর তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পের ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ বাকি রয়েছে ৭৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। একইভাবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে অবশিষ্ট ১২ মাসে ব্যয় করতে হবে মোট বাজেটের ৮৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ অর্থ। বর্তমান বাস্তবায়ন গতিতে এত বিপুল কাজ ও অর্থব্যয় এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন। এ জন্য দ্রুত টাইমবাউন্ড অ্যাকশন প্লান গ্রহণ না করলে নির্ধারিত মেয়াদে প্রকল্প শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
নকশা ও অনুমোদনেও দীর্ঘসূত্রতা
অর্থসঙ্কটের পাশাপাশি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সেতুর নকশা ও প্রাক্কলন চূড়ান্ত না হওয়াও বাস্তবায়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩টি অসমাপ্ত সেতুর ডিজাইন ও প্রাক্কলন এখনো হয়নি। আরো চারটি সেতুর নকশা ও প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্প শুরুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটিয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণে আটকে আছে কাজ
মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে আরেকটি বড় সমস্যা ভূমি অধিগ্রহণ। অধিকাংশ জেলায় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক প্রশাসনিক পর্যায়ে আটকে থাকার তথ্য দিয়েছে আইএমইডি। ফলে ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় সাইট বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্মাণকাজে। এ সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাথে সমন্বয়ের জন্য বিশেষ লিয়াজোঁ টিম গঠনের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
২৭ সেতুর নেভিগেশন ছাড়পত্রে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
প্রকল্পে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও রয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ২৭টি সেতুর নেভিগেশনাল ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। এর ফলে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক দিক সামগ্রিক বাস্তবায়নের ধীরগতিকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
কারিগরি কাজেও মিলেছে ত্রুটি
আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে প্রকল্পের কিছু অবকাঠামোগত কাজে কারিগরি ত্রুটিও ধরা পড়েছে বলে রাউডো বলছে। পরিদর্শনের সময় সাব-বেইজে নিম্নমানের মাটি দিয়ে ব্যাকফিলিং, অনিয়মিত ভলিউমেট্রিক বেটিং এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মতো বিষয় শনাক্ত হয়েছে। এসব ত্রুটি যথাযথভাবে সংশোধন না হলে ভবিষ্যতে সেতু ও সংযোগ সড়কের স্থায়িত্ব এবং নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে। আর এ কারণে দরপত্রের নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং এবং অনিয়মকারী ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পিপিআর না মানায় ধরা পড়েছে একাধিক অনিয়ম
প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনায় সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণে একাধিক অসংগতি পেয়েছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে প্যাকেজ নম্বরায়নে ধারাবাহিকতার ঘাটতি, পূর্ব প্যাকেজে আউটসোর্সিং জনবল অন্তর্ভুক্ত করা এবং মূল্যায়ন কমিটি গঠনে বিধিবহির্ভূত কার্যক্রমের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ঈওই২-ইৎধ-ড-১৫, ঈওই২-ঔধস-ড-৪৪, ঈওই২-ঔধস-ড-৩৭, ঈওই২-গধহ-ড-০৮ ও ঈওই২-ঘধৎ-ড-২৪সহ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন সব প্যাকেজের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
২ কোটি ২৩ লাখ টাকার অডিট আপত্তি
প্রাপ্ততথ্য বলছে, উত্থাপিত ৬টি অডিট আপত্তিতে প্রায় দুই কোটি ২৩ লাখ টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে জালিয়াতি, অতিরিক্ত পেমেন্ট এবং কাল্পনিক প্রাক্কলনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মতো অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। এসব অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
নিয়মিত সভাও হয়নি
প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসি এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি বা পিএসসির নিয়মিত সভা করার কথা থাকলেও সেটিও যথাযথভাবে হয়নি। প্রতিবেদন তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে পিআইসি ও পিএসসি সভায় অংশগ্রহণের হার ছিল মাত্র ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় দুর্বল হওয়ার পেছনে নিয়মিত সভা না হওয়াও একটি কারণ।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ঘাটতিতে বাড়ছে ব্যয়
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায়। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নদীর প্রয়োজনীয় তথ্য এবং বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার ছাড়পত্র যথাযথভাবে সংগ্রহ করে ডিপিপির সাথে সংযুক্ত করা হয়নি। ফলে পরবর্তীতে ডিজাইন প্রণয়নের সময় পরিবর্তন ও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হয়েছে। এ ছাড়া মাটি পরীক্ষার তথ্য যথাযথভাবে ব্যবহার না করে অপ্রয়োজনীয় পুনঃপরীক্ষার প্রবণতাও রয়েছে।
প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সমাপ্ত হওয়া অনিশ্চিত : আইএমইডির
প্রকল্পের ব্যাপারে আইএমইডির সংশ্লিষ্টরা এবং রাউডো বলছে, ভবিষ্যতে সাইটের ভৌত বা কাঠামোগত অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হলে এবং নকশাকারীর সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন না থাকলে নতুন করে মাটি পরীক্ষা করা উচিত নয়। প্রকল্পের শক্তির জায়গা হিসেবে এলজিইডির দীর্ঘদিনের কারিগরি অভিজ্ঞতা এবং গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার কথা বলা হয়েছে। এডিপি বরাদ্দ ও প্রকৃত অর্থায়ন চাহিদার বিশাল ব্যবধান। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা এবং ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইনি জটিলতাকেও প্রকল্পটির জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইএমইডির সুপারিশ অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালককে ঠিকাদারদের কাছ থেকে জনশক্তি নিয়োগ পরিকল্পনা এবং মালামাল ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা করতে হবে। পিআইসি, পিএসসি ও এডিপি পর্যালোচনা সভার মাধ্যমে অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সাথে ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ, অসম্পূর্ণ সেতুগুলোর নকশা ও প্রাক্কলন অনুমোদন, ক্রয়প্রক্রিয়ায় পিপিআর অনুসরণ এবং নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।



